২০২৪ সালে ফুটবলের অপরূপ ফুলটা ফুটেনি ছেলেদের পায়ে। তবে মেয়েদের দ্বিতীয় সাফ শিরোপা জয় মুছে দিয়েছে ছেলেদের ব্যর্থতা। ঠিক এমনটাই ঘটেছিল ২০২২ সালেও। বছর জুড়ে ছেলেদের ব্যর্থতা ঢেকে গিয়েছিল সাবিনাদের প্রথম সাফ জয়ে। মাঠের এই সাফল্য-ব্যর্থতা এক পাশে রেখে ২০২৪ বিশেষ হয়ে আছে ১৬ বছরের শাসক কাজী সালাউদ্দিনের প্রস্থানে। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন চার মেয়াদ শাসন করে সালাউদ্দিন সরে গেছেন ফুটবলকে দেউলিয়াত্বের খুব কাছে পৌঁছে দিয়ে। তাবিথ আউয়াল হয়েছেন তার স্থলাভিষিক্ত। তার নেতৃত্বে ফুটবল প্রশাসনে এসেছে বদল। তবে দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের আঁচ পড়েছে ঘরোয়া ফুটবলে। ক্লাবগুলো ভুগছে চরম অর্থ সংকটে। এর মধ্যেই বছরের শেষভাগে মাঠে গড়িয়েছে ঘরোয়া মৌসুম। একেবারে শেষ সময়ে দেশের ফুটবল পেয়েছে দারুণ এক সুসংবাদ। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ তারকা হামজা দেওয়ান চৌধুরী পেয়েছেন বাংলাদেশের জার্সিতে খেলার ছাড়পত্র।
সৌদি আরবে দুটি অনানুষ্ঠানিক প্রস্তুতি ম্যাচ দিয়ে ২০২৪-এর যাত্রা শুরু হয়েছিল বাংলাদেশের পুরুষ জাতীয় দলের। সুদানের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচটি গোলশূন্য ড্রয়ের পর দ্বিতীয় ম্যাচে ৩-০ তে হার। বিশ্বকাপ বাছাইয়ের মঞ্চে এসে পথহারা বাংলাদেশ। টানা চার ম্যাচেই হারতে হয় হাভিয়ের কাবরেরার দলকে। এর মধ্যে দুটি ম্যাচ অবশ্য নিজেদের আঙিনায় খেলেছিল তারা। ফিলিস্তিন ও অস্ট্রেলিয়ার জয়ের কাজটা ভীষণ কঠিন করে তোলার মধ্যে আত্মতৃপ্তি খুঁজে নিতে পারেন জামাল ভূঁইয়ারা। বসুন্ধরা কিংস অ্যারেনায় ফিলিস্তিন জিতেছিল ১-০ ব্যবধানে। আর প্রবল প্রতিপক্ষ অস্ট্রেলিয়ার জয় ২-০ গোলে। এর আগে-পরে বাইরে গিয়ে দুই ম্যাচে তারা ফিলিস্তিন ও লেবাননের কাছে হারে বড় ব্যবধানে। মার্চ থেকে জুনে জয়হীন কাটানো বাংলাদেশ দল ভুটান উড়ে গিয়েছিল অধরা জয়ের সন্ধানে। জোড়া প্রীতি ম্যাচের প্রথমটি ১-০ গোলে জিতে সেই অপেক্ষার অবসান ঘটে। তবে পরের ম্যাচে সঙ্গী হয় হারের গ্লানি। এরপর ঘরের মাঠে নভেম্বরে তারা আতিথেয়তা জানায় মালদ্বীপকে। সিরিজের শুরুর ম্যাচে হেরে বসে কাবরেরার দল। দ্বিতীয় ম্যাচটা জিতে মানরক্ষা হলেও আসছে মার্চে শুরু হতে যাওয়া এশিয়ান কাপ বাছাইয়ের তৃতীয়পর্বের ড্রয়ে বাংলাদেশকে থাকতে হয় তলানিতে। বছর শেষে পরিসংখ্যানটা মোটেই আশা জাগানিয়া নয়। ফিফা স্বীকৃত আট ম্যাচের ছয়টিতেই হেরে র্যাংকিংয়ে হয়নি কোনো উন্নতি। তারা বছর শেষ করতে যাচ্ছে ১৮৫-তে।
এই বছর মেয়েরা দ্বিতীয়বারের মতো জিতে নিয়েছে সাফ শিরোপা। শিরোপার গল্পটা বলার আগে বলে রাখিÑ ২০২৪ সালে সাবিনা খাতুনরাও খেলেছে আটটি আন্তর্জাতিক ম্যাচ। যার পাঁচটিতে জয়, একটি ড্র ও দুটিতে হেরেছে বাংলাদেশ। ঠিক ছেলেদের উল্টো। ঘরের মাঠে মে-জুনে চীনা তাইপেকে উড়িয়ে এনে দুটি প্রীতি ম্যাচ খেলার মধ্য দিয়ে বছরের হালখাতা খুলেছিল বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল। র্যাংকিংয়ে পাক্কা ১০০ ধাপ এগিয়ে থাকা তাইপের কাছে দুই ম্যাচে হারতে হয়েছিল বাংলাদেশকে। এরপর জুলাইয়ে ভুটানে গিয়ে মেয়েরা হারের আক্ষেপ ঘোচায়। অক্টোবরে নেপালের কাঠমান্ডুতে শুরু হয় সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ। বাংলাদেশ শিরোপা ধরে রাখার মিশনের শুরুতেই বড়সড় ধাক্কা খায় পাকিস্তানের সঙ্গে ১-১ ড্র করে। সেই ম্যাচেই দলের ভেতরের বিভাজনটা বের হয়ে আসে। ইংলিশ কোচ পিটার বাটলারের সঙ্গে দলের সিনিয়রদের দূরত্বটা সংবাদ মাধ্যমে চলে আসে। সিনিয়রদের বাদ দিয়ে বাটলার চেয়েছিলেন সাফ খেলতে। প্রথম ম্যাচে পরীক্ষিত কয়েকজনকে একাদশের বাইরে রাখেন তিনি। ফলে বাংলাদেশ তার স্বাভাবিক ছন্দ হারায় পাকিস্তানের বিপক্ষে। এ নিয়ে ম্যাচের পরের দিন মুখ খুলেন মনিকা চাকমা। কোচও মেয়েদের নিবেদন নিয়ে, নিয়ম-শৃঙ্খলা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। শেষ পর্যন্ত অবশ্য মেয়েদের দাবির কাছে নতিস্বীকার করে গ্রুপের শেষ ম্যাচে শক্তিশালী ভারতের বিপক্ষে বাটলার নামান সিনিয়র-নির্ভর একাদশ। ডু-অর-ডাই ম্যাচে ভারতকে ৩-১ গোলে হারিয়ে গ্রুপ সেরা হয় বাংলাদেশ। সেমিফাইনালে ভুটানকে ৭-১ গোলে উড়িয়ে দেওয়ার পর ফাইনালে স্বাগতিক নেপালকে বাংলাদেশ হারায় ২-১ ব্যবধানে। আরেকবার দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলের সম্রাজ্ঞী হয়ে বীরের বেশে দেশে ফেরা নারী ফুটবলারদের ছাদখোলা বাসে চড়িয়ে শহর প্রদক্ষিণ করানো হয়, ঠিক ২০২২-এর মতো। এরপর থেকে বসেছে মেয়েদের সংবর্ধনা ও পুরস্কারের পসরা। তবে ২০২২-এর মতো এবারও তারা পরের আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলা নিয়ে আছেন অনিশ্চয়তায়। সাবিনাদের সাফ জয়ের চার দিন আগে দেশের ফুটবলে ঘটে সালাউদ্দিন যুগের অবসান। ২০০৮ সালে প্রতিকূলতা জয় করে বাফুফের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন কিংবদন্তি ফুটবলার কাজী সালাউদ্দিন। টানা চার মেয়াদে হয়েছেন সভাপতি। তবে দেশের ফুটবলকে কাক্সিক্ষত জায়গায় পৌঁছে দিতে পারেননি। তার সময়ে বাফুফে বারবার কলঙ্কিত হয়েছে অনিয়ম, দুর্নীতি, জালিয়াতির দায়ে ফিফার একের পর এক শাস্তিতে। তারপরও সালাউদ্দিনের বাসনা ছিল পঞ্চমবারের মতো সভাপতি হওয়ার। তবে দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ফলে আর নির্বাচনের ময়দানে থাকেননি।
বাফুফের সাবেক সহ-সভাপতি তাবিথ আউয়াল বাঁক বদলের সুযোগে বাফুফের সভাপতি বনে গেছেন ২৬ অক্টোবর একপেশে নির্বাচনে জিতে। তাবিথ আউয়াল সিনিয়র সহ-সভাপতি হিসেবে পেয়েছেন বসুন্ধরা কিংসের সভাপতি ইমরুল হাসানকে। সব মিলিয়ে ফুটবলের নেতৃত্বে এসেছে পরিবর্তন। নভেম্বরে মাঠে গড়ায় ঘরোয়া ফুটবল। নতুন সংযোজন চ্যালেঞ্জ কাপ জিতে নেয় আগের মৌসুমের ট্রেবলজয়ী বসুন্ধরা কিংস। তবে ফেডারেশন কাপ ও লিগে ধুকছে বসুন্ধরা কিংস। রাজনৈতিক বাঁক বদলে অন্য ক্লাবগুলোর অবস্থাও অথৈবচ। নেতৃত্ব ও পৃষ্ঠপোষকশূন্য হয়ে পড়ায় এবার প্রিমিয়ার লিগ থেকে সরে যেতে বাধ্য হয়েছে দুই বড় ক্লাব শেখ জামাল ও শেখ রাসেল। ঢাকা আবাহনীও পারেনি প্রত্যাশা অনুযায়ী দল গড়তে। চট্টগ্রাম আবাহনী, ফকিরেরপুল, ওয়ান্ডারার্স, বাংলাদেশ পুলিশ কোনোমতে দল গড়ে খেলছে। সব মিলিয়ে এ বছরটা দেশের ক্লাব ফুটবলের জন্য মোটেই সুখকর নয়।
সব কিছুই যখন দায়সারাভাবে চলছে তখনই বাংলাদেশ পেয়েছে অনেক বড় সুসংবাদ। যুক্তরাজ্য প্রবাসী হামজা চৌধুরীকে বাংলাদেশের জার্সিতে খেলার ছাড়পত্র দিয়েছে ফিফা। তার মতো পেশাদার ফুটবলারকে খেলাতে বাফুফেকেও হাঁটতে হবে শতভাগ পেশাদার পথে। এটাই এখন বড় দুশ্চিন্তা। বাফুফে কর্তা-কর্মীদের অনেকেই যে পেশাদারিত্বের সংজ্ঞাটাই জানেন না!