থার্ড টার্মিনাল নির্মাণে দুর্নীতি

সাবেক মন্ত্রী উবায়দুলের সিন্ডিকেটই আত্মসাৎ করে ৪ হাজার কোটি টাকা

শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল নির্মাণে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও লুটপাটের অভিযোগ পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এই প্রকল্প থেকে ৪ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।

সাবেক মন্ত্রী ও বেবিচক সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির চেয়ারম্যান র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী ও প্রকল্প পরিচালক এ কে এম মাকসুদুল ইসলামের সমন্বয়ে গঠিত একটি সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে এসব অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে।

কমিশন গতকাল রবিবার এসব অভিযোগ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) মো. আকতারুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

দুদকের কাছে থাকা অভিযোগে বলা হয়েছে, বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতির মাধ্যমে ৭ হাজার কোটি টাকার তৃতীয় টার্মিনাল প্রকল্পের ব্যয় বাড়িয়ে ২২ হাজার কোটি টাকা করা হয়েছে। প্রকল্পের জন্য বিভিন্ন সরঞ্জামাদি স্থানীয়ভাবে ক্রয় করে বিদেশ থেকে আমদানি দেখানো, সয়েল টেস্টে অনিয়ম, নকশায় পরিবর্তন, কমিশন বাণিজ্যের মাধ্যমে ৪ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ হয়েছে। টার্মিনালটি বাইরে থেকে সুন্দর মনে হলেও সর্বস্তরে নিম্নমানের সামগ্রী ও যন্ত্রপাতি সংযোজন করা হয়েছে, যা দীর্ঘস্থায়ী হবে না।

প্রকল্পে সবচেয়ে বড় দুর্নীতি হয়েছে নকশা পরিবর্তনে। সাড়ে ৬ শতাংশ কাজ শেষ হওয়ার পর রহস্যজনকভাবে প্রকল্পের নকশায় পরিবর্তন আনা হয়। এতে প্রায় ৭১১ কোটি থেকে ৯০০ কোটি টাকা লুটপাটের অভিযোগ রয়েছে। ভয়াবহ তথ্য হচ্ছে, প্রকল্পের মূল নকশায় টার্মিনাল ভবনের পাইলিং করার কথা ছিল বিশ্বের সর্বাধুনিক প্রযুক্তির স্টিল স্ক্রুয়েড পাইল (এসএসপি)। কিন্তু নকশা পরিবর্তন করে মান্ধাতা আমলের বোরড পাইলিং করা হয়। শুধু অর্থ লোপাটই নয়, এই নকশা পরিবর্তনের মাধ্যমে পুরো প্রকল্পটি এখন বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

অভিযোগে আরও বলা হয়, নকশায় পরিবর্তন আনায় প্রকল্প ব্যয় সাশ্রয় হয় ৯০০ কোটি টাকার বেশি। এই টাকা দিয়ে একটি অত্যাধুনিক ভিভিআইপি টার্মিনাল ও প্রকল্পকে ইউ আকৃতির রূপ দেওয়ার জন্য দুটি পিয়ার যুক্ত করার কথা ছিল। কিন্তু এখন বলা হচ্ছে ফান্ডে কোনো টাকা নেই। প্রকল্পকে ইউ আকৃতির করার জন্য অতিরিক্ত ৩ হাজার কোটি টাকা লাগবে। প্রশ্ন উঠেছে তাহলে ৯০০ কোটি টাকা কোথায় গেল।

অভিযোগে বলা হয়, প্রকল্পের জন্য সিলেট থেকে পাথর কেনা হয়েছে। অথচ ইতালি থেকে পাথর ক্রয়ের কথা বলে প্রকল্পের একাধিক কর্মকর্তা ইতালি ভ্রমণ করেন। এছাড়া ১৮শ স্কয়ার ফুট টাইলসের মান দেখতেও বিদেশ ভ্রমণের অভিযোগ রয়েছে প্রকল্প পরিচালকসহ ৩ জনের বিরুদ্ধে। 

থার্ড টার্মিনাল প্রকল্পের তিনটি বড় কাজ নির্ধারিত ঠিকাদারের পরিবর্তে অন্য প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ আছে প্রকল্প পরিচালকের বিরুদ্ধে। কাজগুলো থার্ড টার্মিনালের অংশ হলেও মাকসুদুর রহমান সেগুলো বাস্তবায়নের জন্য গোপনে চুক্তি বহির্ভূত অন্য ঠিকাদারকে কার্যাদেশ দেয়। এতে মোটা অঙ্কের টাকা ‘কমিশন বাণিজ্য’ হয়। পাশাপাশি সরকারকে গচ্চা দিতে হয় কমপক্ষে ১০ কোটি টাকা। কারণ যেহেতু কাজটি থার্ড টার্মিনালের অংশ সেহেতু সংশ্লিষ্ট বিদেশি ঠিকাদার কাজ না করলেও তাদের এ জন্য মোটা অঙ্কের টাকার লাভ (ইনডাইরেক্ট কস্ট) দিতে হবে।

প্রকল্প পরিচালকের অদক্ষতা, দুর্নীতি আর লুটপাটের কারণে থার্ড টার্মিনালে স্থাপিত অনেক যন্ত্রপাতির ওয়ারেন্টি শেষ হয়ে গেছে। মেয়াদ শেষ হওয়ার পথে রয়েছে আরও অনেক যন্ত্রপাতি। ফলে এসব যন্ত্রপাতির কার্যক্ষমতা নষ্ট হয়ে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। নতুন করে ওয়ারেন্টি (রক্ষণাবেক্ষণ) মেয়াদ বাড়ানোর জন্য চুক্তি করতে হবে বেবিচককে। এতে গচ্চা যাবে বাড়তি অর্থ।

অভিযোগে আরও বলা হয়, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী ওবায়দুল মুকতাদির চৌধুরী এবং সংরক্ষিত আসনের সাবেক মহিলা একজন এমপির নেতৃত্বে পুরো থার্ড টার্মিনাল প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। সংরক্ষিত মহিলা আসনের সাবেক এমপিকে থার্ড টার্মিনাল ভবনের সিলিংয়ের কাজ দেওয়া হয়েছে। মূল প্রকল্পে এ ধরনের সিলিং ছিল না। বিদেশ থেকে আমদানি করা কারুকাজখচিত সিলিং লাগানোর এই কাজটি দেওয়া হয় মোটা অঙ্কের টাকায়। কারুকাজখচিত এই সিলিংটি দেখতে প্রথম প্রথম দৃষ্টিনন্দন মনে হলেও আস্তে আস্তে এটি প্রকল্পের বোঝা হয়ে দেখা দেবে বলে জানান বিশেষজ্ঞরা।

সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে খুশি করার জন্য প্রকল্প পরিচালক মাকসুদুল ইসলাম জাপানি ঠিকাদার এডিসিকে পাশ কাটিয়ে তার পছন্দের কয়েকজন ঠিকাদার দিয়ে বেশ কিছু অতিরিক্ত কাজ করান টার্মিনালে। এর মধ্যে ভিভিআইপি সড়ক থেকে থার্ড টার্মিনালে প্রবেশের জন্য একটি সাধারণ ব্রিজ ছিল নকশায়। এই ব্রিজ তৈরির জন্য ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫৪ লাখ টাকা। কিন্তু প্রকল্প পরিচালক তার পছন্দের ঠিকাদারকে দিয়ে ওই ব্রিজটির কাজ করান। তাতে খরচ হয় ১২ কোটি টাকার বেশি অর্থ।

জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে মেগা প্রকল্প থার্ড টার্মিনালের কাজ শেষ হওয়ার আগেই ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর তড়িঘড়ি করে উদ্বোধন করেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ওই সময় সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল থার্ড টার্মিনালের কাজ ৯০ শতাংশ শেষ হয়েছে। ২০২৪ সালের অক্টোবরে তৃতীয় টার্মিনাল থেকে ফ্লাইট পরিচালনা করা যাবে। কিন্তু বাস্তব চিত্র পুরোটাই ভিন্ন। এখন বলা হচ্ছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের আগে টার্মিনালটি চালু করা সম্ভব নয়। এখনো টার্মিনাল পরিচালনার মাস্টারপ্ল্যান (রূপরেখা) তৈরি হয়নি।