আগামীকাল নতুন বছর ২০২৫-এর প্রথম দিন। কিন্তু ২০২৪ সালের ফেলে আসা দিনগুলো কেমন কাটল? রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক পরিস্থিতি কোন পর্যায়ে আমাদের দাঁড় করিয়েছে? এই মুহূর্তে সাধারণ মানুষ কেমন আছেন? তাদের মূল চাওয়া কী? এর আগে কিছু বলা দরকার। এ বছরই আমরা পেয়েছি, অন্তর্বর্তী সরকার। বছরের সব ঘটনা মøান করে, অগ্রাধিকার পেয়েছে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে দীর্ঘ সময় সরকারে থাকা শেখ হাসিনা সরকারের বিদায় হয়েছে গত ৫ আগস্ট। তিনি দেশত্যাগ করেছেন। কিন্তু বছরের শুরু থেকে ধারাবাহিকভাবে ঘটনার উল্লেখ করলে দেখা যায় ৭ জানুয়ারি হয়েছে আমি-ডামি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন, বেইলি রোডে রেস্তোরাঁয় অগ্নিকাণ্ড, এমভি আব্দুল্লাহ ছিনতাই, ফোর্বস ‘৩০ অনূর্ধ্ব ৩০ এশিয়া’-তে ৯ বাংলাদেশি, এমপি আনোয়ারুল আজিম নিখোঁজ, ঘূর্ণিঝড় রেমাল, সাবেক পুলিশপ্রধান বেনজীরের পুকুরচুরি, মতিউর রহমানের ছাগলকাণ্ড, পাহাড়ধসে নিহত ৯ জন, কোটা সংস্কার আন্দোলন, শেখ হাসিনার পদত্যাগ, নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রধান করে অন্তর্র্বর্তী সরকার গঠন, তোফাজ্জল হোসেনকে গণপিটুনিতে হত্যা, কক্সবাজারের উখিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহার ধসে ৯ জন নিহত, বান্দরবানে কেএনএফ-এর ৫ সদস্য গ্রেপ্তার, ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ২০০’র বেশি মামলা, আনসারদের আন্দোলন, প্যাডেলচালিত রিকশা এবং ব্যাটারিচালিত রিকশাচালকদের আন্দোলন, চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ও ইসকন প্রসঙ্গ নিয়ে উত্তেজনা, এশিয়া কাপ শিরোপা জয়, ব্যাংকে ডাকাতদের হানা এবং সচিবালয়ে আগুন। আজ ৩১ ডিসেম্বর, বছরের শেষ দিনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে ‘জুলাই বিপ্লবের ঘোষণাপত্র’ দেওয়ার কথা থাকলেও রাতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় ঘোষণাপত্র পাঠের বদলে সমাবেশ কর্মসূচি পালন করবে তারা।
এর আগে রাত ১১টায় প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকেই সর্বদলীয় সম্মতির ভিত্তিতে জুলাই-গণঅভ্যুত্থানের ঘোষণাপত্র তৈরি
করবে সরকার।
এর বাইরে, সীমান্তবর্তী দেশের সঙ্গে সাময়িক উত্তেজনা ছিল উল্লেখযোগ্য বিষয়। বছরের বিভিন্ন সময় ভারতীয় পণ্য বর্জনের ডাক এসেছে। কিছুদিন পর তা স্বাভাবিকও হয়েছে। অন্যদিকে ২০২৪ সালে বাংলাদেশের অর্থনীতি সামগ্রিকভাবে মাঝারি মানে স্থিতিশীল থাকলেও বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ স্পষ্ট ছিল। এ সময় বৈশ্বিক মন্দা ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে ৫.৭৮ শতাংশে থাকার প্রবণতা দেখালেও পরে কমে এসেছে। মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পেয়ে বছরব্যাপী গড়ে ৯ শতাংশ চলমান থেকে বছরের শেষ সময়ে এসে দুই অঙ্কের ঘরে প্রবেশ করেছে, যা খাদ্য-জ্বালানি ও জীবনযাত্রার মানে গুরুতর প্রভাব ফেলেছে। বৈদেশিক রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয়ের ধারা অব্যাহত থাকায় অর্থনীতি কিছুটা স্থিতিশীল। অন্তর্র্বর্তী সরকারের রাজস্ব ও মুদ্রানীতি সংস্কার, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পগুলো অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় ভূমিকা রাখছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে উন্নয়ন খাত অগ্রাধিকারে ছিল, যার লক্ষ্য ছিল বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি। কিন্তু এ দুটি খাতের অবস্থা আরও করুণ হয়েছে। এ অবস্থায় বলা চলে, বাংলাদেশের অর্থনীতি ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা দেখালেও মূল্যস্ফীতি ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। অন্তর্র্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ব্যাংক খাতে বড় ধরনের সংস্কার শুরু হয়েছে। যেখানে খেলাপি ঋণ ও মার্কিন ডলারের সংকট মেটানো অন্যতম লক্ষ্য ছিল। ফলে এই খাতের ওপর আস্থা ফিরে আসার লক্ষণ দেখা গেছে, রিজার্ভের পতনও আটকানো গেছে। আমাদের অর্থনীতির আকার বড় হচ্ছে। দেশে কোটিপতির সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু সেই হারে কর আদায় বাড়ছে না। কর আদায়ের হার বাড়ানো নতুন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ। অন্যদিকে সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ব্যাংকিং খাত। অসংখ্য ব্যাংক দুর্বল অবস্থায় পৌঁছে গেছে। এসব ব্যাংককে সবল অবস্থায় ফিরিয়ে আনার জন্য অনেকগুলো পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। ২০২৪ সালে বাংলাদেশের অর্থনীতি নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে।
বছরের শেষ প্রান্তে এসে সরকারের শীর্ষপর্যায় থেকে আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফেরানোর কাজ চলছে, যা অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা নিয়ে আসার সম্ভাবনা প্রবল। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আমলা-রাজনীতিবিদ-ব্যবসায়ীদের দুর্বৃত্তপনার লাগাম টানতে পারলে, অর্থনীতির চেহারা দ্রুত পাল্টে যাবে। মানুষের জীবনযাত্রা সহজ হোক। ছাত্র-জনতার হাত ধরে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় গড়ে উঠুক সমৃদ্ধিশালী বাংলাদেশ। বিদায় ২০২৪, স্বাগত ২০২৫।