২০২৪ সালে বাংলাদেশ পেয়েছে সম্ভাবনাময় যাদের

গতির ঝড় তোলা ক্রিকেটারের যে স্বপ্ন এতদিন দেশের ক্রিকেটে বোনা ছিল তা পূরণ হয়েছে এবারের পাকিস্তান সফরে। বাংলাদেশ পেয়েছে দারুণ এক গতিতারকা, যিনি ঘণ্টায় ১৫০ কিলোমিটারের বেশি গতিতে বল করতে পারেন। তিনি নাহিদ রানা। সাধারণত তরুণ গতি তারকাদের আইডল হিসেবে থাকেন শোয়েব আখতার কিংবা ব্রেট লির মতো কিংবদন্তিরা। তারা তাদের মতো হতে চান। কিন্তু নাহিদ রানা উল্টো। তিনি হতে চান নিজের মতোই। পাড়ার ক্রিকেটে টেনিস, টেপ টেনিসে খেলা নাহিদ ক্রিকেট দীক্ষা নেওয়া শুরু করেন একটু বেশি বয়সে। ১৮ বছর বয়সে রাজশাহীতে ক্লেমন ক্রিকেট একাডেমিতে ভর্তি হন তিনি। এখন তার বয়স ২১, এই তিন বছরেই ডানহাতি পেসার নিজেকে নিয়ে গেছেন পরের ধাপে, জাতীয় দল নামের ঠিকানায়। ৬ টেস্টে ফাইফারসহ নিয়েছেন ২০ উইকেট।

আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শুরুর দিনগুলো কেটেছিল দুঃস্বপ্নের মতো। সিলেটে অভিষেক টি-টোয়েন্টিতে খেলেন ৩৪ বলে ৬৮ রানের বিস্ফোরক ইনিংস। কিন্তু এরপর থেকেই যেন হারিয়ে ফেলেন নিজেকে। পরবর্তী ১৫টি ইনিংসে ফিফটি তো দূরের কথা, ৮ ইনিংসে দুই অঙ্কেই যেতে পারেননি। ২৬ বছর বয়সী জাকেরের ফেরার গল্প বাকি ছিল তখনো। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজে ৪ ইনিংসে ৪৪ গড়ে সর্বোচ্চ ১৭৬ রান। এর মাঝে শেষ টেস্টে ৯১ রানের ইনিংসটি এনে দেয় বাংলাদেশের ঐতিহাসিক জয়। ওয়ানডেতে ৫৬.৫০ গড়ে ১১৩ রান করে দলের তৃতীয় সর্বোচ্চ রান তার। টি-টোয়েন্টি সিরিজের শেষ ম্যাচে যেন পরিণত জাকেরের পুনর্জন্ম হলো। প্রথম দুই ম্যাচে ২৭ বলে ২৭, ২০ বলে ২১ করার পর শেষ ম্যাচে ৪১ বলে ৩ চার এবং ৬ ছক্কায় অপরাজিত ৭২ রানের ইনিংস। এমন জাকেরে সম্ভাবনার বীজ বোনাই যায়।

বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চল রাঙ্গামাটির ঘাগড়ার মঘাছড়ি নামের ছোট্ট এক গ্রামে ২০০৩ সালে জন্ম ও বেড়ে ওঠা। জেঠিমা নিলোবানু চাকমা বাংলা সিনেমা দেখতে খুব পছন্দ করতেন। ভারতের নায়িকা ঋতুপর্ণা সেনগুপ্তার অন্ধভক্ত তিনি। ওই তারার নামেই ভাইয়ের মেয়েটির নাম রাখা হলো। তবে অভিনয় নয় ঋতুর ছোটবেলা থেকেই ফুটবলকে ঘিরে আগ্রহ তৈরি হয়। সেই সময় গ্রামের মাঠে ছেলেদের সঙ্গে খেলতে খেলতেই ফুটবলের প্রতি ভালোবাসার জন্ম। স্কুল ফুটবলে নৈপুণ্য দেখিয়ে ২০১৭ সালে অনূর্ধ্ব-১৫ জাতীয় দলে ডাক পান। এরপর খেলেন প্রতিটি বয়সভিত্তিক দলে। ২০২১ সালে ঘটে সিনিয়র জাতীয় নারী দলে অভিষেক। ২০২২ সালে সাফ শিরোপা জেতা দলে ছিলেন অনুজ খেলোয়াড়। আর এ বছরের সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ আরও বেশি দায়িত্বশীল, পরিপক্ব। ফাইনালে বাংলাদেশের জয়সূচক গোলটি এবার এসেছে তার পা থেকেই।

২০০৬ সালে ঝালকাঠির সাধারণ পরিবারে জন্ম মিরাজের। এমন পরিবারের বাবা-মা চান সন্তান পড়ায় মন দিক। কিন্তু বাঁধনহারা মিরাজের চোখজুড়ে শুধু ফুটবলের স্বপ্ন। বকুনি এড়িয়ে ফুটবল খেলার পথে ২০১৭ সালে সুযোগ পান বিকেএসপিতে ভর্তির। সেই থেকে শুরু। ২০১৮ সালে ভারতের সুব্রত কাপে খেলতে গিয়ে করেন ৭ গোল। ২০২১ এ সুযোগ পান বাফুফে এলিট একাডেমিতে। ২০২২ সালে জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে দল গড়ে এলিট একাডেমি। আর এই দলের প্রথম গোলদাতা বনে ইতিহাস লেখেন মিরাজ। ওই বছরই মোহামেডান তাকে প্রিমিয়ার লিগের দলে ভেড়ায়। ওই বছরই ডাক পান অনূর্ধ্ব-১৭ ও অনূর্ধ্ব-২০ জাতীয় দলে। আগস্টে সাফ অনূর্ধ্ব-২০ চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশকে প্রথমবারের শিরোপা স্বাদ এনে দেন মিরাজ। ৪ গোল করে হন আসরের সেরা খেলোয়াড়। পুরস্কার হিসেবে সেপ্টেম্বরে জাতীয় দলের জার্সিও গায়ে তোলেন দেশের ফুটবলে গোলদাতার অভাব ঘোচাতে প্রত্যয়ী মিরাজুল।

বয়স মাত্র ১৪ বছর ৩ মাস। এ বয়সেই মনন গড়েন দেশের দাবা ইতিহাসে সবচেয়ে কম বয়সে আন্তর্জাতিক মাস্টার হওয়ার কীর্তি। এতদিন এই কীর্তি ছিল দেশের পাঁচ গ্র্যান্ডমাস্টারের একজন নিয়াজ মোর্শেদের দখলে। অক্টোবরে হাঙ্গেরির গ্র্যান্ডমাস্টার প্রতিযোগিতায় ৮ খেলায় ৬ পয়েন্ট পাওয়ার পর মননের তৃতীয় নর্ম নিশ্চিত হয়। তাতেই ফিদে মাস্টার থেকে তিনি বনে যান আন্তর্জাতিক মাস্টার। দেশের পঞ্চম আন্তর্জাতিক মাস্টার হন তিনি। এ বছর দেশের জাতীয় দাবা চ্যাম্পিয়নশিপ দিয়ে নিজেকে প্রমাণ করা শুরু হয় তার। বাঘা বাঘা দাবাড়–দের পেছনে ফেলে জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে অপরাজিত শিরোপা জয় করেন এ কিশোর। অর্জনের ডালা বছর জুড়েই সাজিয়েছেন। নিউ ইয়র্কের ওয়ার্ল্ড র‌্যাপিড দাবা চ্যাম্পিয়নশিপে চার গ্র্যান্ডমাস্টারকে হারিয়ে ১৮০ জনের মধ্যে ১৩৯তম হয়েছেন। আসছে বছরেও মননের মগজাস্ত্র সামলাতে হবে বৈশ্বিক দাবাড়–দের।