বিদায়ী ২০২৪ সাল ছিল বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে পরিবর্তনের বছর। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের হাত ধরে পরিবর্তন আসে ক্রিকেট, ফুটবলসহ দেশের বেশিরভাগ খেলার প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ে। পটপরিবর্তনের পর ক্রিকেট এবং ফুটবল মাঠে থাকলেও বেশিরভাগ ক্রীড়া ফেডারেশনগুলোতেই বিরাজ করেছে স্থবিরতা। চব্বিশের এই পরিবর্তনগুলোর কতটা কার্যকরী হলো, ২০২৫ নেবে সেই পরীক্ষাই।
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডে শেষ হয়েছে নাজমুল হাসান পাপন অধ্যায়। সাবেক ক্রীড়ামন্ত্রী ও সাবেক বিসিবি প্রধান জুলাই আন্দোলনের মধ্যেই গোপনে দেশত্যাগ করেছেন, সেই সঙ্গে তার অনুচররা যারা বিসিবিকে কুক্ষিগত করে রেখেছিল তারাও অনুপস্থিত। বিসিবির ২৫টি পরিচালক পদের মধ্যে ১৫টি পদই শূন্য। ২০২৫ এর অক্টোবরে বিসিবির নির্বাচন। পরবর্তী নির্বাচনের আগ পর্যন্ত জোড়াতালি দিয়েই চলবে বিসিবির সাংগঠনিক কার্যক্রম। ফারুক আহমেদ বিসিবি সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এখনো পর্যন্ত স্ট্যান্ডিং কমিটিগুলোই গঠন করে উঠতে পারেননি। ক্রিকেট পরিচালনা বিভাগ, গেম ডেভেলপমেন্ট বিভাগসহ অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ বিভাগেই নেই কোনো দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিচালক। ২০২৫ সালে বিসিবি নির্বাচনের মাধ্যমে শূন্য পদগুলো পূরণ হলে তবেই হয়তো পূর্ণাঙ্গরূপে কাজ করতে পারবে বিসিবি।
বিদায়ী বছরের শেষভাগে মাঠে গড়ানো বিপিএল চলবে ফেব্রুয়ারির ৭ পর্যন্ত। এরপরই আছে আইসিসি চ্যাম্পিয়নস ট্রফি। পাকিস্তানের মাটিতে এই আসরে খেলতে শেষ পর্যন্ত গররাজি ভারত, তাই বাংলাদেশ-ভারত ম্যাচ হবে দুবাইতে। নিউজিল্যান্ড ও পাকিস্তানের বিপক্ষে বাংলাদেশ খেলবে রাওয়ালপিন্ডিতে। ২০২৫ সালে বাংলাদেশে খেলতে আসবে জিম্বাবুয়ে, ভারত, ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও আয়ারল্যান্ড। বাংলাদেশ যাবে পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা সফরে। এছাড়াও এই বছরে আছে এশিয়া কাপ যা হবে টি-টোয়েন্টি সংস্করণে।
বাংলাদেশ দলের বর্তমান কোচ ফিল সিমন্সের মেয়াদ চ্যাম্পিয়নস ট্রফি পর্যন্ত। তার সঙ্গে মেয়াদ বাড়বে কি না নির্ভর করবে এই ক্যারিবিয়ানের পারফরম্যান্সের ওপর, তবে জোরালো সম্ভাবনা আছে মেয়াদ বৃদ্ধির। চ্যাম্পিয়নস ট্রফির পর হয়তো বাংলাদেশ ক্রিকেট থেকে একটা প্রজন্ম বিদায় নেবে, ‘পঞ্চপা-ব’ নামে যারা পরিচিত ছিলেন তাদের হয়তো আর দেখা যাবে না লাল-সবুজের জার্সিতে। তবে নাহিদ রানা, জাকের আলি অনিক, রিশাদ হোসেনরা জানান দিয়েছেন, দায়িত্ব নিতে তৈরি তারাও।
২০২৫ সালে বাংলাদেশ দলের নেতৃত্বেও আসতে পারে পরিবর্তন। নাজমুল হোসেন শান্ত জানিয়েছিলেন নেতৃত্ব ছাড়ার ইচ্ছা। ঘটনাচক্রে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে টেস্টে নেতৃত্ব পেয়ে যাওয়া মেহেদী হাসান মিরাজের হাত ধরে জ্যামাইকা টেস্টে জয় আর লিটন দাসের হাত ধরে টি-টোয়েন্টি সিরিজ জয় বদলে দিতে পারে নেতৃত্বের মানচিত্র।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে ঢাকা প্রিমিয়ার লিগের অনেক দলই হয়তো আগের শক্তিতে দল গোছাতে সমস্যায় পড়বে। বেক্সিমকো, গাজী গ্রুপের মালিকানাধীন ক্লাবগুলোকে ঘিরে কিছু অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে, অন্যদিকে অতীতের আবাহনীর মতো এবার ফুটবলেও গত হয়েছে সালাউদ্দিন আমল। এসেছেন তাবিথ আউয়াল। ফুটবলে তিনিও শুনিয়েছেন অনেক প্রতিশ্রুতি। তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ ঢাকায় ফুটবল ফেরানো। সংস্কার কাজের জন্য দীর্ঘদিন খেলা হচ্ছে না দেশের প্রধান স্টেডিয়াম বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে। খরুচে এবং দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের পর এই মাঠে খেলা ফিরিয়ে আনাটাই তার কাছে প্রধান প্রত্যাশা। নারী ফুটবল দল সাফ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর আর মাঠেই নামতে পারেনি। উন্নতির স্বার্থে তাদের পর্যাপ্ত ম্যাচ খেলার সুযোগ করে দেওয়া প্রয়োজন। পুরুষদের সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ হওয়ার কথা এই বছর, তবে ভেন্যু এখনো চূড়ান্ত নয়। আছে এশিয়ান কাপের বাছাই। এই বছরই বাংলাদেশের জার্সি গায়ে দেখা যেতে পারে লেস্টারসিটি তারকা হামজা চৌধুরীকে। হকির জন্যও এ বছরটা বিশেষ। চব্বিশের শেষভাগে যুব হকি দল পঁচিশের ডিসেম্বরে ভারতে হতে যাওয়া যুব হকি বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছে। পুরো বছরটাই তাই যুবাদের প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ। এখন দেখার হকি ফেডারেশনের দায়িত্ব নেওয়া নতুন নেতৃত্ব কতটা ভালো প্রস্তুতির ব্যবস্থা করতে পারে যুবাদের জন্য।
এদিকে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে অনেক ফেডারেশনের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকরা ছিলেন পলাতক। ক্রীড়াঙ্গনের গঠিত সার্চ কমিটি বেশ কিছু ফেডারেশনে নতুন সংগঠকদের বসিয়েছে, কোথাও থেকে গেছে শূন্যতা। তবে ৫ আগস্ট পরবর্তী সময় থেকে প্রায় থমকে থাকা অন্যান্য খেলাধুলায় গতি সঞ্চার করাটাই হবে ২০২৫-এর বড় চ্যালেঞ্জ।
২০২৪ ছিল অলিম্পিক, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা, ইউরো সব মিলিয়ে ঠাসবুনোট। এই বছর বড় কোনো বৈশ্বিক আয়োজন নেই, কেবল মেয়েদের ওয়ানডে বিশ্বকাপ আছে যেটায় বাংলাদেশের খেলা এখনো অনিশ্চিত। ২০২৫-কে তাই বলা যায় প্রস্তুতির বছর, চক্রপূরণের পর নতুন পথের প্রথম ধাপ।