সাদা পতাকা ইলন মাস্কের হাতে!

শিগগিরই হোয়াইট হাউজে অভিষেক হতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের। তার এ মেয়াদে চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য সম্পর্ক কেমন হবে, তা নিয়ে রয়েছে সংশয়। তাই আগের মেয়াদের মতোই চীনের সঙ্গে নানা জটিলতায় জড়াবেন নাকি এবারের সম্পর্ক তুলনামূলক বন্ধুত্বপূর্ণ হবে, সে আলোচনা চলছে হরদম।

অবশ্য বিশ্লেষকদের কেউ কেউ বলছেন, ট্রাম্প প্রশাসনে এবার ইলন মাস্ক থাকায় পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন হতে পারে। চীনের সঙ্গে মাস্কের আছে বিপুল অঙ্কের ব্যবসায়িক সম্পর্ক আর মাস্কের মা, মায়ো মাস্কেরও আছে সাংস্কৃতিক-অর্থনৈতিক যোগাযোগ। তাই চীনকে চটাতে চাইবেন না মাস্ক। ট্রাম্পের ওপর মাস্কের যে প্রভাব তাতে সামগ্রিক বিষয়টি এ ধনকুবের হাতের মুঠোয় থাকবে বলেই ধরে নেওয়া যায়। তারপরও ট্রাম্পের নতুন বিএফএফ বা ‘বেস্ট ফ্রেন্ড ফরএভার’ ইলন মাস্কের সঙ্গে ও চীনা নেতৃত্বের সম্পর্কের ধরনটা কী হবে, সেদিকে চোখ সবার। বার্তা সংস্থা রয়টার্সও বলছে, বৈশ্বিক বাণিজ্য যুদ্ধে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করতে পারেন ইলন মাস্ক। প্রতি বছর প্রায় ১০ লাখ গাড়ি তৈরি করে মাস্কের প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি টেসলা এবং গোটা বিশ্বের অর্ধেকেরও বেশি বিদ্যুচ্চালিত বা ইভি গাড়ি তৈরি করে কোম্পানিটি। টেসলার সাফল্যের মূল চাবিকাঠি হচ্ছে চীনের বাণিজ্যিক রাজধানী সাংহাই। এজন্য মূলত ধন্যবাদ পেতে পারেন শহরটির কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক সেক্রেটারি লি কিয়াং। চীনের প্রধানমন্ত্রী তিনি। সাংহাইভিত্তিক ‘অটো মোবিলিটি লিমিটেড’-এর প্রধান নির্বাহী বিল রুসো বলেছেন, চীনের দুই নম্বর ব্যক্তি কিয়াং। তার সমর্থনই সাংহাইয়ে টেসলার জন্য সবকিছু সম্ভব করে তুলেছিল। ২০১৭ সালে চীন স্বচালিত শিল্পের জন্য নিজেদের নীতি নির্দেশিকাও সামঞ্জস্য করেছে, যাতে বিদেশি বিভিন্ন কোম্পানি চীনে তাদের কারখানার মালিকানা পেতে পারে।

তিনি জানান, ২০১৮ সালে সাংহাইতে কোম্পানি চালুর জন্য দেশটির সঙ্গে এক চুক্তিতে স্বাক্ষর করে টেসলা এবং ২০২০ সালে সেখানে মডেল ৩ গাড়ির উৎপাদন শুরু করে কোম্পানিটি। ব্রিটিশ গণমাধ্যম স্কাই নিউজ বলছে, খুব দ্রুত এমনকি রেকর্ড সময়ের মধ্যে টেসলা কারখানাটি চালু করে। গত বছর এপ্রিলে দেশটির রাজধানী বেইজিংয়ে কিয়াংয়ের সঙ্গে দেখা করেন মাস্ক। ওই সময় এক এক্স পোস্টে মাস্ক লিখেছিলেন, চীনের প্রধানমন্ত্রী কিয়াংয়ের সঙ্গে দেখা করতে পেরে আমি সম্মানিত বোধ করছি। আমরা একে অন্যকে বহু বছর ধরে চিনি, সাংহাইয়ের প্রথম দিন থেকে। সব দিক থেকেই বৃহস্পতি তুঙ্গে রয়েছে মাস্ক-চীনের সম্পর্ক। ২০২৩ সালের নভেম্বরে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং যুক্তরাষ্ট্র সফরে যান। সে সময় তিনি মাস্কের সঙ্গেও দেখা করেন।

তাইওয়ানের মর্যাদা নিয়েও বারবার বিতর্কে জড়িয়েছেন মাস্ক। দুই বছর আগে মাস্ক বলেছিলেন, তাইওয়ানের ওপর চীনকে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ দেওয়ার মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যকার উত্তেজনা প্রশমন করা যেতে পারে। আর এতেই খেপে উঠেছিলেন তাইওয়ানের নেতারা। একটি হিসাব পরিষ্কার, মাস্কের চীনকে প্রয়োজন ও আগামী মাসগুলোতে দেশটিরও প্রয়োজন হতে পারে মাস্কের। এতে করে সহজ সমাধান হচ্ছে, বাণিজ্যযুদ্ধের মুখে চীনা কমিউনিস্ট পার্টি ও ট্রাম্পের মধ্যে এক মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করতে পারেন মাস্ক।

চীনে ইভি শিল্পের পথিকৃৎ ছিলেন মাস্ক। তবে এখন বিওয়াইডি ও নিওর মতো চীনের স্থানীয় গাড়ি নির্মাতার সঙ্গে রীতিমতো প্রতিযোগিতা করতে লড়াই করতে হচ্ছে তাকে।

মাস্ক ও ট্রাম্পের মধ্যে সম্পর্ক ভবিষ্যতে অস্থির হয়ে উঠলেও আপাতত মাস্কই লাভবান হবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। বেইজিংয়ের ‘তাইহে ইনস্টিটিউট’-এর চীনা ধারাভাষ্যকার আইনার টানজেন বলেছেন, বন্ধুদের জন্য আলাদা কিছু করতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের কখনো সমস্যা হয়নি। এটা তার ব্যক্তিত্বের সঙ্গে মানানসই। তিনি ক্ষমা করতে পারার পাশাপাশি তার পছন্দমতো মানুষ ও কোম্পানিকে সাহায্য করতে পারেন। চীনে একজন অগ্রদূত বা পথিকৃৎ হিসেবে সুপরিচিত মাস্ক। দেশটির বেশিরভাগ মানুষ তার সম্পর্কে ভালো কথা বলেন। মাস্ক পরিবারের প্রতিও আগ্রহ রয়েছে চীনে, যার আঁচ দেশটির অনলাইন কমিউনিটিতেও পাওয়া যায়। ইলনের মা মায়ে মাস্ক প্রায়ই চীনে ভ্রমণে যান। সিনিয়র বয়সের সেলিব্রেটি ফ্যাশন আইকন হিসেবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার অনেক চীনা অনুসারী রয়েছে। তিনি বেশ কয়েকটি চীনা পণ্যকেও সমর্থন করেছেন। মায়ে মাস্কের ‘এ উইম্যান মেকস এ প্ল্যান’ নামের বই চীনা ভাষায়ও অনুবাদ হয়েছে এবং দেশটিতে বইটি বেস্টসেলার হয়েছে। এদিকে, ট্রাম্পের অভিষেকের সময় যত ঘনিয়ে আসছে ততই তার উপদেষ্টা দলের ওপর আরও বেশি নজর সবার, যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ইলন মাস্ক। তার এ ভূমিকা চীনের জন্য কী অর্থ হতে পারে, তা দেখার জন্য অপেক্ষা করছে দেশটি। অবশ্য ট্রাম্পের ওপর মাস্কের যে প্রভাব তাতে বিষয়টি নিয়ে খুব বেশি সংশয় থাকার কথা নয়। নভেম্বরের নির্বাচনে মাস্ক খোলাখুলিভাবে ট্রাম্পকে সমর্থন করেছিলেন এবং তার পক্ষে প্রচার চালিয়েছিলেন। ট্রাম্পকে ১১ কোটি ৯০ লাখ ডলার অনুদানও দেন মাস্ক। ট্রাম্পও প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ের পর তার নতুন প্রশাসনে মাস্ককে জায়গা দিতে দেরি করেননি। ‘ডিপার্টমেন্ট অব গভর্নমেন্ট এফিসিয়েন্সি’ নামে নতুন একটি বিভাগ বানিয়ে মাস্ককে এর প্রধান পদে বসিয়ে দিয়েছেন ট্রাম্প। ডিপার্টমেন্ট অব গভর্নমেন্ট এফিসিয়েন্সি বিভাগ ঠিক কী কী কাজ করবে তা এখনো স্পষ্ট নয়। কিন্তু এটিকে সরকারের গতানুগতিক কাঠামোর বাইরের একটি প্রতিষ্ঠান বলেই ধারণা করা হচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, মাস্কের মনোযোগ থাকবে সরকারের কার্যকারিতার দিকে। এর মানে, ফেডারেল কর্মীদের নিয়োগ ও ছাঁটাই নিয়ে পরামর্শ দেওয়ার এমনকি বিভিন্ন সংস্থার কাঠামোকে খোলনলচে বদলে ফেলার ক্ষমতা পাবেন। তবে মাস্কের যে এর চেয়েও বড় প্রভাব থাকবে, তা প্রায় নিশ্চিত। অভিবাসন ও ট্রান্সজেন্ডারদের অধিকার, এমন অনেক বিষয়ে তিনি ট্রাম্পের সঙ্গে একমত। অবশ্য চীনে মাস্কের যে স্বার্থ, সেই ইভি নিয়েই ট্রাম্পের সঙ্গে তার মতের অমিল রয়েছে। তারপরও নানা কারণেই ট্রাম্পের ওপর মাস্কের প্রভাব বিস্তর।