সুন্দরবনে দস্যু আতঙ্কে দিশেহারা জেলেরা

বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ সুন্দরবনে দীর্ঘদিন পর আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে দস্যুরা। অহরহ ঘটছে জেলেদের জিম্মি ও অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়ের ঘটনা। অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে কেড়ে নেওয়া হচ্ছে সবকিছুই। ফলে ভয় আর আতঙ্কে অনেকেই এখন বনেই যেতে চাচ্ছে না। বিষয়টি নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় জেল ও তাদের পরিবার। তবে অভিযোগ উঠেছে, বনের নিরাপত্তায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা কমে আসায় এ ধরনের অপরাধ কর্মকান্ড বাড়ছে।

বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, প্রাকৃতিক অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি সুন্দরবনে একসময়ে ত্রাস সৃষ্টি করে রেখেছিল জলদস্যুরা। অপহরণ, দস্যুতাসহ নানা অপরাধের অভয়ারণ্য ছিল এই ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল। জেলে, বাওয়ালি থেকে শুরু করে পর্যটকরাও সবসময় থাকতেন ভয়ে। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় ২০১৬ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত সুন্দরবনের ৩২টি বাহিনীর প্রধানসহ ৩২৮ জন দস্যু ৪৬২টি অস্ত্র ও ২২ হাজার ৫০৪টি গোলাবারুদসহ আত্মসমর্পণ করেছিলেন। বনদস্যুদের আত্মসমর্পণের মধ্যদিয়ে ২০১৮ সালের নভেম্বরে সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত ঘোষণা করা হয়।

তবে অনুসন্ধানে বিভিন্ন সূত্র জানায়, গতবছর ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর অনেকে জেল থেকে পলাতক দাগী আসামিরা সুন্দরবনে বনে আশ্রয় নিয়েছে। এছাড়া ফের দস্যুতায় ফিরেছে আত্মসমর্পণকারীদের মধ্যে অনেক বাহিনীই। গেল ৪ মাসে সাতক্ষীরা রেঞ্জের শ্যামনগর এলাকা, বাগেরহাটের মোংলা, শরণখোলা, ঢাংমারি ও রামপাল এলাকা, খুলনার দাকোপ ও কয়রা এলাকার কয়েকটি পয়েন্টে উল্লেখ্যযোগ্য দস্যুতার ঘটনা ঘটেছে। বিশেষ করে পশ্চিম সুন্দরবনের খুলনা ও সাতক্ষীরা রেঞ্জে (কয়রা, দাকোপ ও সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলা সংলগ্ন) মজনু বাহিনী, আসাবুর বাহিনী, দয়াল বাহিনী ও আলিম-মিলন পাটোয়ারী-রবিউল বাহিনীর তৎপরতা বেড়েছে। তাদের সদস্যরা বাটলু, আন্ধারমানিক, আড়পাঙ্গাসে, ঝাঁলে, পাটকোস্টা, ভ্রমরখালী, আড়োশিবসা, দুধমুখ, মান্ধারবাড়ি, আলকিরমধ্যে, জাবা ও হংসরাজ নামক খাল ও নদীতে প্রতিনিয়ত অহরহ দস্যুতা সংঘটিত করছে।

সদ্য সুন্দরবন থেকে ফিরে আসা কয়েকজন জেলে দেশ রূপান্তরকে জানান, প্রায় জেলে অপহরণ ও জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায় করছে দস্যুরা। সর্বশেষ গেল ৩০ ডিসেম্বরও মজনু বাহিনী বাটলুর খাল থেকে ৯ জন জেলের কাছ থেকে মাথাপিছু ১০ হাজার টাকা করে ৯০ হাজার টাকা, কাঠকাটার আন্ধারমানিকের গোরা থেকে জেলে তাজবিরুলকে জিম্মি ১০ হাজার টাকা মুক্তিপণ আদায় করে। এরআগে কয়রার ৬নং ও ৪নং কয়রা গ্রামের সুশান্ত রপ্তান, তপন মল্লিক, ছলেমান মোল্লা, নজরুল গাজী, জিয়ারুল, আজিজুল ইসলাম, মোংলা গাইন, গণেশ, মফিজুল গাজি দস্যু দলের কবলে পড়েন। নৌকা প্রতি ২০ হাজার টাকা করে মুক্তিপণ দিয়ে তারা ফেরত আসেন। এছাড়া দক্ষিণ বেদকাশী, জোড়শিং, মহেশ্বরীপুর এলাকায় বেশকিছু জেলেকে আটকে টাকা আদায় করে দস্যুরা।

কয়রা উপজেলার জেলে মো. জাহিদ জানান, জেলেদের কাছ থেকে মাছ, টাকা, মোবাইল ফোনসহ সবকিছু কেড়ে নিচ্ছে দস্যুরা। টাকা দিতে না পারলে আটকে রেখে নির্যাতনও করা হচ্ছে। ফলে জীবিকার তাগিদে ঝুঁকি মাথায় নিয়ে বনে যেতে হচ্ছে জেলেদের। যা নিয়ে উদ্বিগ্ন জেলে-বনজীবী ও তাদের পরিবার।

এ বিষয়ে সুন্দরবন সংলগ্ন খুলনার দাকোপ উপজেলার সুতারখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাসুম আলী ফকির দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমার ইউনিয়নের অধিকাংশ মানুষের সুন্দরবনের নদীতে মাছ ধরে জীবীকা চলে। কিন্তু সম্প্রতি ৪ থেকে ৫টি দস্যু বাহিনী বনে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। তাদের হাতে আমার ইউনিয়নের অনেক জেলে অপহৃত হয়। পরে দস্যুদের দেওয়া বিকাশ নাম্বারে নৌকা প্রতি খরচসহ ২০ হাজার ৪০০ টাকা দিয়ে মুক্তি মিলেছে। এখন ভয়ে ও অতঙ্কে কেউ বনে যেতে চাচ্ছে না।

বিষয়টি নিয়ে সুন্দরবন বন বিভাগের বন সংরক্ষক মিহির কুমার দো বলেন, সম্প্রতি জেলে অপহরণ বা জিম্মিদের ফের মুক্তিপণ আদায়ের ঘটনা ঘটছে। গত ৩ নভেম্বর সাতক্ষীরা রেঞ্জের চুনকুড়ি এলাকা থেকে অপহৃত ১০ জেলেকে উদ্ধার করে বন বিভাগ। এসব জেলেদেরকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে লাখ টাকার চাঁদা দাবি করে দস্যুরা। গতমাসেও সাতক্ষীরা অঞ্চলে অভিযান পরিচালনা করে দুটি জব্দ ও আস্তানা ভেঙে দেওয়া হয়েছে। তবে সুন্দরবনে ডাকাত বা দস্যুরা যেন মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে সেজন্য আইনশৃঙ্খলার বিভিন্ন বাহিনীর সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছি।

এ ব্যাপারে খুলনা রেঞ্জ ডিআইজি মো. রেজাউল হক বলেন, সুন্দরবনে অপরাধ দমনে নিয়মিত টহল অব্যাহত রয়েছে। তবে অপরাধ দমনে পরিকল্পনামাফিক অভিযান পরিচালনা করা হবে।

এ প্রসঙ্গে বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির শেখ আশরাফ উজ-জামান সভাপতি দেশ রূপান্তরকে বলেন, শীতকাল মাছ ধরার মৌসুম। জেলেরা এই সময় বেশি সুন্দরবনে যায়, সেকারণে দস্যুতাও বাড়ে। এছাড়া নজরদারির অভাবে দস্যুদের উৎপাত বেড়েছে। তাই দ্রুত সময়ের মধ্যে দস্যুতায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিয়ে জেলেদের সুন্দরবনে যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে হবে। কারণ জেলেরা গরীব, তাদের উপার্জন জড়িত। দস্যুরা এখনো ছোট ছোট দলে আছে। ওরা বড় হওয়ার আগেই ব্যবস্থা নেয়া দরকার। এছাড়া সুন্দরবনে এভাবে দস্যুতা চলতে থাকলে বনজীবীদের জীবিকা, পর্যটন ও রাজস্ব আদায় হুমকির মুখে পড়বে।