ফ্যাক্টচেকিং নিয়ে দ্বন্দ্বে মেটা-ইইউ

ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামের মূল প্রতিষ্ঠান মেটার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মার্ক জাকারবার্গ বলেছেন, তারা মেটা’র ফ্যাক্টচেকিং প্রোগ্রাম বন্ধ করবেন এবং পরিবর্তে ইলন মাস্কের এক্স-এর মতো একটি কমিউনিটি নোটস সিস্টেম চালু করবেন। এই পরিবর্তনগুলো মেটার প্ল্যাটফর্ম ফেসবুক এবং ইনস্টাগ্রাম এবং থ্রেডস-এ প্রভাব ফেলবে।  জাকারবার্গ গত মঙ্গলবার এক ভিডিও পোস্টে এ ঘোষণা দেন। এতে তিনি লিখেন, ‘মুক্ত মতপ্রকাশ ঘিরে আমাদের শেকড়ে ফেরার সময় এখন। আমরা ফ্যাক্ট চেকারগুলোর পরিবর্তে এখন কমিউনিটি নোট ব্যবহার করব। আমাদের নীতিগুলোকে আরও সরলীকরণ করছি। ভুল কমানোর বিষয়ে গুরুত্ব দিচ্ছি।’

জাকারবার্গ মূলত ফেসবুকের যেসব তৃতীয় পক্ষ বা যেসব ফ্যাক্টচেকার ছিল, সেগুলোর ব্যবহার কমিয়ে এনে কমিউনিটি নোটস ব্যবহারের কথা বলেছেন; অর্থাৎ এখন থেকে এ ক্ষেত্রে ব্যবহারকারীর মতামতকে বেশি গুরুত্ব দেবে মেটা। জাকারবার্গের এই ঘোষণা নিয়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সমালোচনা হচ্ছে। ইইউ কমিশন মেটাকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে ফ্যাক্টচেকিং প্রোগ্রাম বন্ধের মতো পদক্ষেপের বিষয়ে সতর্ক করেছে।

বিবিসি বলছে, মেটার নতুন এই কমিউনিটি নোটস মডেলে ব্যবহারকারীরা ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম এবং থ্রেডসের পোস্টে ভুল তথ্য বা ভুল বোঝার সম্ভাবনা থাকলে তা চিহ্নিত করতে পারবেন এবং প্রাসঙ্গিক ব্যাখ্যা সংযুক্ত করার সুযোগ পাবেন। ফলে স্বাধীন ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠান এবং বিশেষজ্ঞদের ওপর নির্ভরশীল হওয়ার প্রয়োজনীয়তা আর থাকবে না।

মেটা ২০১৬ সালে ফ্যাক্টচেকিং প্রোগ্রাম চালু করেছিল ভুল তথ্যের বিরুদ্ধে লড়াই করার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে। ২০১৬ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ফেসবুকের মাধ্যমে ভুয়া তথ্য ছড়ানোর সমালোচনার পর এই উদ্যোগটি চালু হয়েছিল। ২০২৩ সালে মেটার একটি বিবৃতিতে বলা হয়েছিল যে ফ্যাক্টচেকিং প্রোগ্রামটি ‘৬০টিরও বেশি ভাষায় কাজ করা প্রায় ১০০টি সংস্থাকে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য প্রসারিত হয়েছে।’ গত মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে মেটা বলেছে, বিশেষজ্ঞদেরও নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি এবং পক্ষপাত থাকে। এটি প্রমাণিত হয়েছে যে, কোন বিষয়টি ফ্যাক্টচেক করা হবে এবং কীভাবে তা নির্ধারণে তাদের ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি প্রভাব ফেলে সেটি। এমন একটি প্রোগ্রাম, যা তথ্য প্রদানে সহায়ক হওয়ার কথা। মেটা আরও উল্লেখ করেছে, তাদের কনটেন্ট ব্যবস্থাপনার প্রচেষ্টা এতটাই বৃদ্ধি পেয়েছে যে, এতে ব্যবহারকারীরা হতাশ হচ্ছেন এবং এটি প্রায়ই মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় বাধা সৃষ্টি করছে।

মেটার প্রধান বৈশ্বিক বিষয়ক কর্মকর্তা এবং ক্লেগের উত্তরসূরি জোয়েল কাপলান বলেছেন, মেটা পরিকল্পনা করেছে মাদক, সন্ত্রাসবাদ, শিশু নির্যাতন, প্রতারণা এবং কেলেঙ্কারির সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়বস্তু মডারেট করতে। মেটা বলেছে, তারা পরবর্তী দুই মাসের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে কমিউনিটি নোটস পদ্ধতি চালু করবে এবং বছরের বাকি সময়ে এটি উন্নত করতে থাকবে। ফ্যাক্টচেক করা কনটেন্টকে ডিমোশন দেওয়া বন্ধ করে মেটা পোস্টের সঙ্গে একটি লেবেল যুক্ত করবে, যা ব্যবহারকারীদের জানাবে পোস্টটির সঙ্গে অতিরিক্ত তথ্য রয়েছে। আগের মতো পূর্ণ স্ক্রিন সতর্কবার্তা দেখিয়ে পোস্টে প্রবেশের বাধা আর থাকবে না। এদিকে ইউরোপীয় কমিশনে প্রযুক্তিবিষয়ক মুখপাত্র থমাস রেগনিয়ার জার্মান রেডিও স্টেশন এমডিআরকে বলেছেন, যদি মেটা ইইউর ডিজিটাল পরিষেবা আইন মেনে চলতে ব্যর্থ হয়, তবে তারা প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানটিকে জরিমানা করতে পারেন। এসব বড় প্রতিষ্ঠান যেখানেই থাকুক না কেন, ইইউতে তাদের পরিষেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে নিয়ম মেনে চলতে হবে। জার্মানির প্রযুক্তিমন্ত্রী ভলকার ভিসিং বলেছেন, এ ব্যাপারে তিনি ইইউ কমিশনের ওপর আস্থা রাখছেন। কমিশন মেটার কর্মকাণ্ড ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করবে। নিবিড়ভাবে পরীক্ষা করবে। প্রয়োজনে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেবে।

জার্মানির সামাজিক গণতান্ত্রিক দলের সাধারণ সম্পাদক ম্যাথিয়াস মিয়ার্স মেটার পরিকল্পনাকে ‘আশঙ্কাজনক’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, ভুয়া খবর ও বিভ্রান্তি বৃদ্ধির সময় ফ্যাক্টচেকারগুলোকে দূরে সরিয়ে দেওয়া অত্যন্ত বিপজ্জনক। কারণ, ভুয়া খবর স্বাধীন মতপ্রকাশের পথ নয়; বরং তা আমাদের গণতন্ত্রের ওপর আক্রমণ করে।’ জাকারবার্গ এখন ইলন মাস্ক বা ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতোই সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছেন বলে মন্তব্য করেন ম্যাথিয়াস মিয়ার্স। তিনি বলেন, ‘এ ধরনের ফ্যাক্টচেকিং প্রোগ্রাম বাতিল হলে তা আমাদের আইনের সঙ্গে কতটা সাংঘর্ষিক, বিষয়টি আমাদের পরীক্ষা করতে হবে।’ ম্যাথিয়াস মিয়ার্স আশা করেন, ইইউ কমিশন ফ্যাক্টচেকিং প্রোগ্রামের প্রযোজ্য নিয়মগুলো ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করবে।