মানুষ আল্লাহর সৃষ্টির সেরা জীব। মানুষের এই শ্রেষ্ঠত্ব জ্ঞানের মাধ্যমে অর্জিত হয়েছে। মানুষের জ্ঞান ও বিবেক তাকে অন্যান্য সৃষ্টি থেকে পৃথক করেছে। মহান আল্লাহ পৃথিবীতে নানা উপাদান-উপকরণের সমাহার ঘটিয়েছেন। সেগুলো ব্যবহার করে কল্যাণমুখী জীবনযাপনের দায়িত্ব মানুষকে দিয়েছেন। এই দায়িত্ব পালনে শারীরিক সুস্থতা খুবই জরুরি। ইসলাম মানবজীবনের সব ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়েছে। এর মধ্যে স্বাস্থ্য রক্ষা করা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ইসলামের মৌলিক উদ্দেশ্যাবলির মধ্যে রয়েছে জীবন, জ্ঞান, সম্পদ, বংশ ও ধর্ম রক্ষা। এ পাঁচটি উদ্দেশ্য অর্জনে স্বাস্থ্যসচেতনতা অপরিহার্য। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমার শরীরেরও তোমার ওপর অধিকার রয়েছে।’ (তিরমিজি) শরীরের প্রতি দায়িত্ব পালন মানে হলো স্বাস্থ্য রক্ষা করা। ইসলাম স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা, পরিচ্ছন্ন থাকা এবং সুস্থতার প্রতি যত্নশীল থাকার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। তাই প্রত্যেক মুমিনের কর্তব্য হলো, সর্বদা শরীর ও স্বাস্থ্যের বিষয়ে সচেতন ও সতর্ক থাকা। একজন মুমিন প্রথমত খেয়াল রাখবেন, তিনি যেন শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে না পড়েন এবং কখনো অসুস্থ হলে দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণ করবেন। এ বিষয়ে কোনো অলসতা বা শৈথিল্য প্রদর্শন করা যাবে না। নবী করিম (সা.) সাহাবিদের দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণে উৎসাহিত করেছেন এবং তিনি নিজে অসুস্থ হলে তাৎক্ষণিক চিকিৎসা গ্রহণ করেছেন।
ইসলামে পবিত্রতাকে ইবাদতের পূর্বশর্ত হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। নামাজের জন্য পবিত্রতা যেমন আবশ্যক, তেমনি দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেও তা গুরুত্বপূর্ণ। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিয়মিত অজু করার মাধ্যমে স্বাস্থ্য ও পবিত্রতার গুরুত্ব বোঝাতেন। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায়ের জন্য প্রতিদিন পাঁচবার অজু করার অভ্যাস আমাদের শরীর ও মনকে পরিচ্ছন্ন রাখে। এ ছাড়া খাওয়ার আগে-পরে হাত ধোয়া, ঘুমানোর আগে অজু করা এবং ঘরদোর পরিষ্কার রাখার প্রতি উৎসাহিত করেছেন নবীজি (সা.)। মসজিদকে পরিচ্ছন্ন রাখার পাশাপাশি ঘর ও আশপাশের পরিবেশকেও দূষণমুক্ত রাখা ইসলামের শিক্ষা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘পবিত্রতা ইমানের অর্ধেক।’ (সহিহ মুসলিম) স্বাস্থ্য রক্ষার এ নিয়মগুলো আমাদের দৈনন্দিন জীবনে অভ্যাসে পরিণত করা জরুরি।
শারীরিক সুস্থতা মানুষের জন্য আল্লাহর অমূল্য দান। ইসলাম সুস্থতার প্রতি যত্নশীল থাকার তাগিদ দিয়েছে। অসুস্থতার সময় দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণ করতে বলা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘হে আল্লাহর বান্দাগণ, তোমরা চিকিৎসা গ্রহণ করো। আল্লাহ এমন কোনো রোগ দেননি, যার প্রতিষেধক সৃষ্টি করেননি। তবে বার্ধক্য ছাড়া।’ (আবু দাউদ) এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, চিকিৎসা গ্রহণ করা শুধু ব্যক্তিগত প্রয়োজন নয়; বরং এটি আল্লাহর প্রতি আমাদের দায়িত্ব। আর নবী করিম (সা.) চিকিৎসাশাস্ত্রের চর্চাকে উৎসাহিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘প্রতিটি রোগেরই প্রতিষেধক রয়েছে। সুতরাং যথাযথ চিকিৎসা গ্রহণ করলে মহান আল্লাহর ইচ্ছায় তা নিরাময় হয়।’ (সহিহ মুসলিম) চিকিৎসাবিজ্ঞান ও গবেষণার প্রতি ইসলাম বিশেষ গুরুত্ব দেয়। এর মাধ্যমে মানবজাতি আল্লাহ প্রদত্ত জ্ঞানকে কাজে লাগাতে পারে।
চিকিৎসক ও রোগীর মধ্যে দায়িত্ব ও অধিকার নিয়ে স্পষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়েছে ইসলাম। একজন চিকিৎসকের প্রধান দায়িত্ব হলো রোগীর কল্যাণ সাধন করা। তিনি যেন সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করেন এবং রোগীর প্রতি সমানুভূতি দেখান। নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে কেউ প্রকৃত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে নিজের জন্য যা পছন্দ করে, তা অন্যের জন্যও পছন্দ করে।’ (সহিহ বুখারি) রোগীর প্রতি সম্মান দেখানো, তার কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং চিকিৎসা নিয়ে তাকে উৎসাহিত করাও চিকিৎসকের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। রোগীর গোপন তথ্য রক্ষা করার নির্দেশ দিয়েছে ইসলাম। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি মানুষের গোপন বিষয় গোপন রাখে, আল্লাহ তার দোষ আড়াল করবেন।’ (তিরমিজি)
রাসুলুল্লাহ (সা.) চিকিৎসার ক্ষেত্রে দক্ষ ব্যক্তিদের প্রাধান্য দিতেন। খন্দকের যুদ্ধে হজরত সাদ বিন মুয়াজ (রা.)-এর শরীরে তীর বিদ্ধ হলে নবীজি তার চিকিৎসার জন্য নারী সাহাবি রুফাইদা (রা.)-কে দায়িত্ব দেন। সেই যুগে চিকিৎসার ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ কম থাকলেও তার দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার কারণে নবীজি (সা.) এ সিদ্ধান্ত নেন। অন্যদিকে আরবের সাকিফ গোত্রের হারিস বিন কালাদা নামে একজন চিকিৎসক ছিলেন, যিনি ইসলাম গ্রহণ করেননি, তাকেও নবীজি (সা.) একজন সাহাবির চিকিৎসার জন্য পাঠিয়েছিলেন। এটি প্রমাণ করে, ইসলাম দক্ষতাকে ধর্ম-বর্ণের ঊর্ধ্বে স্থান দিয়েছে।
ইসলাম স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য তিনটি মৌলিক বিষয়কে গুরুত্ব দিয়েছে। পবিত্রতা, পরিচ্ছন্নতা এবং সময়মতো চিকিৎসা গ্রহণ করা। এ ছাড়াও পরিবেশকে দূষণমুক্ত রাখা, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা এবং পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই যুগে স্বাস্থ্যসচেতন থাকা আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অপ্রয়োজনীয় ওষুধ গ্রহণ, মানহীন চিকিৎসা এবং অযোগ্য চিকিৎসকদের চিকিৎসার কারণে রোগীরা অনেক সময় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এসব থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের চিকিৎসা পেশায় সততা ও পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করতে হবে।
সুস্থতাই সকল সুখের মূল। শরীর ও মনের যত্ন নেওয়া এবং শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার প্রতি লক্ষ রাখাকে ইসলাম মানুষের সুখ-শান্তির আবশ্যক উপাদান হিসেবে গণ্য করেছে। এ জন্য এ বিষয়ে আমাদের বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে হবে। এমন কোনো কাজে জড়ানো যাবে না, যাতে শারীরিক বা মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি হতে পারে। আর স্বাস্থ্য রক্ষা শুধু ব্যক্তি পর্যায়ে নয়, বরং সামাজিক এবং ধর্মীয় দায়িত্বও। ইসলামের শিক্ষা হলো, মানুষ যেন নিজের সুস্থতার প্রতি যত্নবান হয় এবং অসুস্থ হলে দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণ করে। পাশাপাশি চিকিৎসকদের সততা, দক্ষতা এবং রোগীর প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন করা জরুরি। খাবার-দাবার গ্রহণের ক্ষেত্রে একটি বিষয় খেয়াল রাখতে হবে যে, আমরা যেন আমাদের স্বাভাবিক চাহিদার অতিরিক্ত খাবার না খাই। কেননা শারীরিক যত রোগ সৃষ্টি হয়, তা অতিরিক্ত খাবার-দাবার গ্রহণ কিংবা আহারে অনিয়মের কারণেই হয়ে থাকে। আমরা যদি পরিমিত খাবার গ্রহণ করতে পারি, তাহলে আশা করা যায় শারীরিকভাবে সুস্থ থাকতে পারব। খাবার গ্রহণের ক্ষেত্রে ইসলামের পরামর্শ হলো, পেটকে তিন ভাগে ভাগ করে এক ভাগ খাবার, এক ভাগ পানি আর এক ভাগ খালি রাখা। তাহলে তা শরীর ও মনকে সুস্থ রাখতে সহায়ক হয়। আমরা ইসলামের এই নীতিটি গ্রহণ করে সুস্থ জীবনযাপন করতে পারি।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে সুস্থ রাখুন এবং সুস্থতা রক্ষার জন্য ইসলামি নির্দেশনা অনুসরণ করার তওফিক দিন।
লেখক : ইসলামবিষয়ক গবেষক
atikr2047@gmail.com