ব্যাটসম্যান হিসেবে তামিম ইকবালের প্রথম ইনিংসের পারফরম্যান্সের সঙ্গে দ্বিতীয় ইনিংসের পারফরম্যান্সের পার্থক্য খুব বেশি নয়। ৭০ টেস্ট খেলা তামিম দলের দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করেছেন ৬৫ বার, প্রথম ইনিংসে রান ২৭৬৮ আর দ্বিতীয় ইনিংসে ২৩৬৬। ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ, অর্থাৎ একমাত্র ডাবল সেঞ্চুরি করেছেন দ্বিতীয় ইনিংসেই। ছক্কার সংখ্যাও প্রথম ইনিংসের চেয়ে দ্বিতীয় ইনিংসে বেশি। তাই জীবনের মাঠেও তামিমের প্রথম ইনিংসের চেয়ে দ্বিতীয় ইনিংসটা আরও ভালো হবে, এমন প্রত্যাশা করাটা বাড়াবাড়ি হবে না।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ছেড়ে দেওয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা তামিম দিয়েছেন শুক্রবারে। তবে তার আগে লম্বা সময় ধরেই তামিম জাতীয় দলের সঙ্গে নেই। নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিলেন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের কেন্দ্রীয় চুক্তি থেকেও। বয়স, ক্যারিয়ারের ব্যাপ্তি, চোট, ফর্ম এবং শেষ সময়ে সাকিব আল হাসান এবং কোচ চন্ডিকা হাথুরুসিংহের সঙ্গে শীতল সম্পর্ক, ২০২৩ সালের জুলাইতে আফগানিস্তান সিরিজের প্রথম ম্যাচের পর অবসরের ঘোষণা দেওয়া এবং সে সময়কার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপে অবসরের সিদ্ধান্ত বদলে মাঠে ফিরেছিলেন তামিম। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে দেশের মাটিতে খেলেছিলেন দুটো ওয়ানডে। কিন্তু বিশ্বকাপের দলে তাকে রাখা না রাখা নিয়ে নানান নাটকীয়তা, পাল্টাপাল্টি ভিডিওবার্তা এবং সাক্ষাৎকার; সব মিলিয়ে ওয়ানডে বিশ্বকাপের আগে তাকে ঘিরে যে অস্থিরতার সৃষ্টি হয়েছিল সেটা বড় কোনো আসরের আগে মোটেও আদর্শ কিছু নয়। এরপর নানান সময়েই তামিমকে তার ভবিষ্যৎ ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন করা হয়েছে, তিনি নিজেও সাংবাদিকদের তার বাসার সামনে ডেকেছেন। কিন্তু কখনোই খোলাসা করে কিছু বলেননি, জিইয়ে রেখেছিলেন সম্ভাবনাটা। সাবেক ক্রীড়ামন্ত্রী এবং বিসিবির অপসারিত সভাপতি নাজমুল হাসান পাপনের সঙ্গে বহুল প্রতীক্ষিত আলাপটা হতে হতেও হয়নি, তার আগেই পাপনের গণেশ উলটে গেছে। নতুন সরকারের ক্রীড়া উপদেষ্টার সুদৃষ্টি আছে তামিমের ওপর, আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথমবারের মতো শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে পা রাখার দিনে তামিমকে দেখা গেছে ‘ট্যুর গাইড’-এর ভূমিকায়।
‘তামিম বোর্ডে এলে আমি অনেক খুশি হব’ কথাটা শোনা গেছে বিসিবির বর্তমান সভাপতি ফারুক আহমেদের কণ্ঠে। দুজনের ভেতর দূর সম্পর্কের আত্মীয়তার সম্পর্ক থাকলেও ফারুক এই মন্তব্য স্বজনপ্রীতি থেকে করেননি নিঃসন্দেহে। বরং চেয়েছেন তামিমের অভিজ্ঞতাটা কাজে লাগাতে। ২০১২ সালে ক্রিকেট থেকে সরে দাঁড়ানো অ্যান্ড্রু স্ট্রাউসকে ২০১৫ সালে ‘ডিরেক্টর অফ ক্রিকেট’ পদে নিয়োগ দিয়েছিল ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস ক্রিকেট বোর্ড। তার হাত ধরেই বদলে গেছে ইংল্যান্ডের ক্রিকেট। সীমিত ওভারের ক্রিকেটে তারা হয়ে উঠেছে ভয়ংকর এক দল, ৪ বছরের মাথায় জিতেছে বিশ্বকাপ। টেস্টেও এখন ইংল্যান্ডের যে ‘বাজবল’ সংস্কৃতি তার বীজ কিন্তু বুনে দিয়েছেন স্ট্রাউসই। চলতি বছরের অক্টোবরে মেয়াদ ফুরাবে বিসিবির বর্তমান পরিচালকদের। পরের নির্বাচনে চট্টগ্রাম বিভাগ, ঢাকার কোনো ক্লাব কিংবা সাবেক অধিনায়ক; কোনো একপথে তামিমের নির্বাচিত হয়ে বিসিবি পরিচালক হিসেবে আসার পথটা খুলে গেল অবসর নেওয়ার মাধ্যমে।
মাইক্রোফোন হাতে তামিমের বেশ খানিকটা অভিজ্ঞতা হয়ে গেছে এর মধ্যেই। ভারতে বাংলাদেশের টেস্ট সিরিজ ও টি-টোয়েন্টি সিরিজে ধারাভাষ্যকার হিসেবে কাজ করেছেন তামিম। এর আগে বিপিএলেও তাকে অতিথি ধারাভাষ্যকার হিসেবে দেখা গেছে। আতাহার আলী খানের পর তামিম হয়ে উঠতে পারেন বাংলাদেশের ক্রিকেটের কণ্ঠস্বর। আতাহার আন্তর্জাতিক ক্রিকেট যখন খেলেছেন আর এখনকার সময়ের মধ্যে বিপুল ফারাক। তামিম হয়ে উঠতে পারেন দীনেশ কার্তিকের মতো চমৎকার একজন ধারাভাষ্যকার, যার কণ্ঠে এই সময়ের খেলোয়াড়দের মনোজগৎটা জানতে পারবেন দর্শক ও শ্রোতা। প্রথম সিরিজেই ধারাভাষ্যকার হিসেবে তামিম অনেক অভিজ্ঞদের সঙ্গে পাল্লা দিয়েছেন সমানতালে। মাইক্রোফোন হাতে আরেকটু অভিজ্ঞতা, কমেন্ট্রি বক্সে আরেকটু সময় আর খানিকটা অনুশীলন তামিমকে করে তুলতে পারে ধারাভাষ্য জগতের একজন চাহিদাসম্পন্ন তারকা হিসেবে, যেমনটা হয়েছেন রবি শাস্ত্রী, রিকি পন্টিং, কুমার সাঙ্গাকারারা।
এসবের বাইরেও তামিম বেছে নিতে পারেন অতিথি বক্তার ভূমিকা। সৌরভ গাঙ্গুলি, স্টিভ ওয়াহ-এর মতো অনেক সফল ক্রিকেটারই পরে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, সংগঠনের কর্মীদের প্রণোদনা দেওয়ার জন্য অতিথি বক্তা হিসেবে হাজির হয়েছেন। এর বিনিময়ে পেয়েছেন বড় অঙ্কের সম্মানীও। তামিম ভাগাভাগি করতে পারেন তার জীবনের নানান অভিজ্ঞতা, একটা দলকে কীভাবে নেতৃত্ব দিয়ে সফল করা যায়, কীভাবে কঠিন সময় পার করে জীবনে এগিয়ে যেতে হয় এমন বিষয় নিয়ে দিকনির্দেশনা দিতে পারেন খেলোয়াড়ি জীবনের ছোট ছোট সব ঘটনা থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতার বয়ানে।
একটা সময় ক্রিকেটাররা সাবেক হলে জড়িয়ে যেতেন কোচিংয়ের সঙ্গে। তারপর আবারও সেই যাযাবর জীবন। স্রেফ খেলাটাই থাকত না, বাকি সব খেলোয়াড়ি জীবনের মতোই। দীর্ঘ সময় পরিবারকে ছেড়ে থাকা, দৌড়ঝাঁপ এসব থেকেই যেত জীবনে। অনেক ক্রিকেটারই এখন আর কোচিংয়ে আগ্রহ দেখান না। সাঙ্গাকারা, পন্টিং, অ্যাডাম গিলক্রিস্টরা মাইক্রোফোনের পেছনেই ব্যস্ত। তামিম হয়তো হাঁটবেন তাদের পথেই। খেলোয়াড়ি জীবনেও একটা সময় আরামপ্রিয় তামিম নিশ্চয়ই খেলা ছাড়ার পরেও আর সাত সকালে উঠতে চাইবেন না!