জোড়া সাফ জয়ের পরও ভাগ্য ফেরেনি নারী ফুটবল দলের। অহর্নিশ তাদের সঙ্গী অনিশ্চয়তা-অবহেলা-বঞ্চনা। ৩০ অক্টোবর কাঠমান্ডুর দশরথ রঙ্গশালার হাজারো নেপালি সমর্থকদের স্তব্ধ করে বাংলাদেশ ফাইনালটা জিতে নিয়েছিল ২-১ ব্যবধানে। সাফল্যে খুশি হয়ে অনেকেই অর্থ বোনাস ঘোষণা করে। প্রতিশ্রুতি মতো প্রায় সবাই বোনার্সের অর্থ বুঝিয়ে দিয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার সেরাদের হাতে। দেয়নি শুধু বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন। দেড় কোটি টাকা বোনাসের ঘোষণাটা দেখেনি আলোর মুখ। কেবল বোনাসের অর্থ নয়, শেষ আট ম্যাচের ম্যাচ ফিও জোটেনি মেয়েদের কপালে। গেল অক্টোবরে কেন্দ্রীয় চুক্তি শেষ হয়ে যাওয়ায় শেষ দুই মাস মেলেনি বেতন। সব মিলিয়ে মেয়েদের আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রেখেছে অসংখ্য ‘নেই’।
সাফ জয়ের পরপরই মেয়েদের পুরস্কৃত করেছে সরকার। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীসহ বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান অর্থ পুরস্কার দিয়েছে। এসব দেখে ভীষণ আগ্রহে বাফুফের নতুন কমিটি দেড় কোটি টাকা বোনাস দেওয়ার ঘোষণা দেয়। সিদ্ধান্ত নেয় নির্বাহী কমিটির সবাই মিলে এই পুরস্কারের অর্থ জোগান দেবেন। শুরুতে এটা নিয়ে প্রতিক্রিয়া না দেখালেও সময় যত গড়িয়েছে নির্বাহী কমিটির অনেকেই নিজের পকেট থেকে টাকা দিতে নারাজ। ফলে মেয়েদের মিলছে না কাক্সিক্ষত বোনাস। বেতনের বিষয়টিও ঝুলিয়ে রেখেছে নতুন কমিটি। অক্টোবরে শেষ হয়েছে মেয়েদের সঙ্গে বাফুফের কেন্দ্রীয় চুক্তি। যার অধীনে জাতীয় দলের মেয়েরা কয়েক ক্যাটাগরিতে পেতেন মাসিক বেতন। চুক্তি নবায়ন না হওয়ায় আড়াই মাস ধরে কোনো বেতন পাচ্ছেন না তারা। এ নিয়ে অনুরোধ করার পরও সুরাহা হয়নি।
এর মধ্যেই জানা গেল, গত বছর মে মাসে ঘরের মাঠে চীনা তাইপের বিপক্ষে খেলা ২ ম্যাচ প্রীতি সিরিজ থেকে ম্যাচ ফিও পাচ্ছেন না ফুটবলাররা। এর মধ্যে বাংলাদেশ খেলেছে আটটি আন্তর্জাতিক ম্যাচ। অতীতের নিয়ম অনুযায়ী মূল একাদশ ও বদলি হিসেবে খেলা প্রতি ফুটবলার ফি হিসেবে ম্যাচের জন্য পাবেন ৮০ হাজার টাকা করে। সেই হিসেবে আট ম্যাচ খেলা একজনের প্রাপ্য ৮০ হাজার টাকা। বেতন-বোনাসের পর এই ম্যাচ ফি না পাওয়ায় মেয়েদের মধ্যে বিরাজ করছে চাপা ক্ষোভ। একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘বোনাস ঘোষণার পরও দেয়নি। চুক্তি না হওয়ায় দুই মাস বেতনও পাইনি। ম্যাচ ফির টাকাটাও বকেয়া। তাহলে আমাদের বলে দিক দেশের জন্য খেলার বিনিময়ে কিছুই মিলবে না। আগেভাগে ঘোষণা দেওয়ার কী দরকার?’
বেতন নেই, বোনাস, নেই, ম্যাচ ফি নেইয়ের মতো মাঠের খেলার সুযোগ নেই মেয়েদের। তারা নিজ নিজ বাসায় অলস সময় কাটাতে দেখেন সাফে ব্যর্থ হওয়ার পরও বসে নেই প্রতিবেশী দেশগুলো। ভারত সম্প্রতি প্রীতি ম্যাচ খেলেছে মালদ্বীপের সঙ্গে। এ মাসে নেপাল ঘরের মাঠে খেলছে চারজাতি টুর্নামেন্ট। অথচ বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন সাফজয়ীদের জন্য প্রতিপক্ষই খুঁজে পাচ্ছে না! একবার তারা জানিয়েছিল মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দলের সঙ্গে প্রীতি ম্যাচ আয়োজনের কথা। সেটার সম্ভাবনা শেষ হওয়ায় ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কোনো ম্যাচ খেলার সম্ভাবনা নেই। বাফুফের নারী কমিটির প্রধান মাহফুজা আক্তার মার্চে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়ার মতো দেশগুলোকে খেলার প্রস্তাব দেওয়ার কথা জানিয়েছেন। সেটাও এখনো নিশ্চিত নয়।
এদিকে যেই ব্রিটিশ কোচকে নিয়ে অভিযোগের অন্ত নেই নারী ফুটবলারদের, সেই পিটার জেমস বাটলারকেই চুক্তি বাড়িয়ে রেখে দেওয়ার পাঁয়তারা করছে বাফুফে। সাফ চলাকালে বাটলারের সঙ্গে দলের সিনিয়র ফুটবলারদের সংঘাত প্রকাশ পেয়েছিল বাজেভাবে। বাটলার সিনিয়রদের বাতিলের খাতায় দিয়ে চেয়েছিলেন সাফল্য ছুঁতে। তিনি যে ভুল সেটা প্রমাণ করতেই প্রতিবাদী হয়ে ওঠেন সিনিয়ররা। প্রবল দাবির কাছে নতিস্বীকার করে কোচ সিনিয়রদের নিয়ে গড়েন একাদশ। তাতে ফলও মিলেছে হাতেনাতে। সিনিয়ররাই সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে দেশকে দ্বিতীয়বারের মতো এনে দিয়েছেন মর্যাদার শিরোপা। সে সময় অনেকেই অপ্রকাশ্যে বাটলারের অধীনে না খেলার কথা বলেছিলেন। অথচ সেই কোচকেই বাফুফে চাচ্ছে ধরে রাখতে। এ নিয়ে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে মেয়েদের মধ্যে। শোনা যাচ্ছে, বাফুফে বাটলারকে রেখে দেওয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিলেই বেশ কয়েকজন সিনিয়র ফুটবলার একযোগে প্রতিবাদ জানাবেন। অনেকে তো নাম প্রকাশ না করার শর্তে খেলা ছাড়ার হুমকিও দিয়ে রেখেছেন।
এত নেই-এর মধ্যে বাস করেও এই মেয়েরা মাঠের দায়িত্বটা পালন করেন ঠিকঠাক। খেলেন ভয়ডরহীন ফুটবল। বঞ্চনা-গঞ্জনা সয়ে তারা এনে দেন সাফল্য। কিন্তু এভাবে চলতে থাকলে আর কতদিন। ধৈর্যের বাঁধ তো ভাঙল বলে।