আমাদের দেশে দীর্ঘদিন অনুপস্থিত ছিল গণতন্ত্র। ফলে একে একে ভেঙে পড়ে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা। একমুখী চিন্তা এবং দুর্বৃত্তায়নের ফলে ভেঙে পড়ে অর্থনীতি। সরকারি ছত্রছায়ায় রাজনৈতিকভাবে শুরু হয় লুটপাট। কিন্তু গত বছর প্রবল গণআন্দোলনে ৫ আগস্ট পতন হয় আওয়ামী লীগ সরকারের। তিন দিন পর দেশের হাল ধরে অন্তর্র্বর্তী সরকার। এরপর গণআন্দোলনের দাবি পূরণে সরকার বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের উদ্যোগ নিয়ে দুই ধাপে গঠন করে ১১টি সংস্কার কমিশন। বুধবার সকালে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে নির্বাচনব্যবস্থা, পুলিশ, সংবিধান এবং দুদক সংস্কার কমিশন প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। বিচার বিভাগ ও জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সময় ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, ‘সব দলের সঙ্গে আলোচনা করে গণঅভ্যুত্থানের চার্টার (গণঅভ্যুত্থানের সনদ) তৈরি করা হবে, যার ভিত্তিতে হবে পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এটা আমাদের জাতীয় কমিটমেন্ট। আমরা চাচ্ছি সব দল এই চার্টারে সাইন অন করবে।’ কী রয়েছে সেই প্রতিবেদনে? প্রতিবেদনে সংবিধান, সংসদ, পুলিশ ও নির্বাচনব্যবস্থায় পরিবর্তনের মাধ্যমে সংস্কারকে এগিয়ে নেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। প্রথম ধাপে জমা পড়া প্রতিবেদনগুলোর মধ্যে সংবিধান সংস্কারে দেওয়া প্রস্তাবগুলো এসেছে আলোচনার মূলে। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় লাগাম দেওয়া, মেয়াদে সীমা টানার মতো নানা পদক্ষেপ, বয়স কমিয়ে তরুণদের সংসদে আসার সুযোগ দেওয়াসহ বড় পরিসরে সংস্কার প্র্রস্তাব এসেছে। একই সঙ্গে বিদ্যমান সংবিধানের মূল স্তম্ভের নানা জায়গাতেও রদবদলের সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি রাষ্ট্র পরিচালনা, জাতীয় সংসদ, নির্বাচনসহ বহু মৌলিক জায়গায় পরিবর্তনের সুপারিশ এসেছে।
বিএনপি ও সমমনা রাজনৈতিক দলগুলো যেখানে সংস্কারের চেয়ে দ্রুত নির্বাচন আয়োজনে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে, তখন সবকিছু আমূল পাল্টে দেওয়া এসব সংস্কার কতটা বাস্তবায়িত হবে তা নিয়ে সন্দিহান বিশ্লেষকরা। সংবিধান সংস্কারে কমিশন যে প্রতিবেদন দিয়েছে, সেখানে রাষ্ট্র পরিচালনার চার মূলনীতির মধ্যে জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ বাদ দিয়ে গণতন্ত্রের সঙ্গে নতুন চারটি মূলনীতি অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে। সুপারিশকৃত মূলনীতিগুলো হলো সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক সুবিচার, বহুত্ববাদ এবং গণতন্ত্র। দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভার প্রস্তাব করেছে সংবিধান সংস্কার কমিশন। একজন ব্যক্তি রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী পদে দুবারের বেশি প্রার্থী হতে পারবেন না। প্রধানমন্ত্রী থাকা অবস্থায় কোনো রাজনৈতিক দলের প্রধান এবং সংসদ নেতা হতে পারবেন না। এ ছাড়া সংসদীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ন্যূনতম বয়স কমিয়ে ২১ বছর করার সুপারিশ করা হয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশের সাংবিধানিক নাম ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ’ পরিবর্তন করে ‘জনগণতন্ত্রী বাংলাদেশ’ সুপারিশ প্রতিবেদন করার কথা তুলে ধরেন সংস্কার কমিশনের প্রধান।
জুলাই-আগস্টে হতাহতের জন্য দায়ী পুলিশ কর্মকর্তাদের শাস্তির সুপারিশ এবং পুলিশ যেন রাজনৈতিক দলের বাহিনীতে পরিণত না হয় ও বলপ্রয়োগ না করতে পারে, এমন সুপারিশ করেছে পুলিশ সংস্কার কমিশন। দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, প্রধানমন্ত্রী পদে কোনো ব্যক্তি দুবারের বেশি না থাকা, একই সঙ্গে দলীয় প্রধান ও সংসদ নেতা হওয়া এবং কোনো আসনে ভোটারের ৪০ শতাংশ ভোট না পড়লে পুনর্নির্বাচনসহ ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ১৫০টি সুপারিশ করেছে নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশন। ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে সংবিধানের অঙ্গীকার, দুর্নীতিবিরোধী কৌশলপত্র প্রণয়ন, ন্যায়পাল প্রতিষ্ঠা, ঘুষ লেনদেনকে অবৈধ ঘোষণা ও কালো টাকা সাদা করার সুযোগ স্থায়ীভাবে বাতিলের প্রস্তাবসহ ৪৭ দফা সুপারিশ করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সংস্কার কমিশন।
গণঅভ্যুত্থানের সনদের ভিত্তিতে নির্বাচন হোক এটা সবাই চায়। তবে কমিশনের প্রস্তাবগুলো কতটা গ্রহণযোগ্যতা পাবে, তা নির্ভর করছে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যের ওপর। দল-মতের পার্থক্য থাকবে, এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। নির্বাচনী গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন না উঠুক। অতীতের পুনরাবৃত্তি না হোক। আমরা যেন পিছিয়ে না পড়ি। নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে দেশ-বিদেশে প্রশ্ন না উঠুক। সম্মিলিত গণতান্ত্রিক শুভ রাজনৈতিক শক্তিতে জেগে থাক বাংলাদেশ।