খুব সৎভাবে বলছি, মুসলমানদের মধ্যে বিভক্তি নিয়ে অভিযোগ শুনতে শুনতে আমি ক্লান্ত। এটা নিয়ে আমার সম্প্রদায়ের এত অধিকসংখ্যক মানুষকে হতাশা ও নিরাশার মধ্যে ডুবে থাকতে দেখে ভীষণভাবে ব্যথিত। তারা ভুলভাবে বিশ্বাস করে যে, মুসলিম উম্মাহ বিভক্ত, তাই আমরা সবাই পরাজিত। এমন নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি আসে মূলত আমাদের চোখের সামনে ঘটে যাওয়া সহিংসতা ও অন্যায় ঘটনাগুলোর কারণে। বিভিন্ন ভূরাজনৈতিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোয় আমাদের ভাই-বোনদের ওপর যে অবিচার করা হচ্ছে এবং তা অব্যাহতভাবে চলছে, সেটাই এ ধারণার মূল উৎস। মুসলমান হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হলো, হতাশ না হওয়া। ধর্ম আমাদের আত্মবিশ্লেষণের নির্দেশ দেয়। তাই হতাশ না হয়ে বর্তমান অবস্থার গভীর বিশ্লেষণ করা জরুরি।
১০০ বছর আগে অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের মাধ্যমে খেলাফতের অবসান হয়। এরপর মুসলমানদের একটি বড় অংশ তাদের সমস্ত শক্তি দিয়ে মুসলিম উম্মাহকে আবার ঐক্যবদ্ধ করার উপায় খুঁজে বের করার প্রতি মনোযোগী হয়। যারা উম্মাহর ঐক্য হারানোর চিন্তায় ব্যথিত হয়ে পড়েছিলেন, তারা হয়তো ভুলে গিয়েছিলেন যে, আমাদের এমন কিছু বিষয় আছে, যা এখনো আমাদের ঐক্যবদ্ধ করে রাখে, যা আমাদের সমাজকে সম্মিলিতভাবে ন্যায়, শান্তি ও সমৃদ্ধি অর্জনে সহায়তা করে। সত্যিকারের ঐক্য কোনো রাজনৈতিক বা সাংস্কৃতিক অভিন্নতার মাধ্যমে পাওয়া সম্ভব নয়। বরং তা আগে থেকেই বিদ্যমান ইসলামের মৌলিক নীতিতে আমাদের সম্মিলিত আনুগত্যের মধ্যে। যেমন পবিত্র কোরআনকে কেন্দ্র করে যে একতা, যা ইসলামি সমাজে অনন্যভাবে গ্রহণযোগ্য, যাযাবর গোত্র থেকে শুরু করে উন্নত সভ্যতা পর্যন্ত। এই গ্রহণযোগ্যতাই এমন একটি ঐক্য সৃষ্টি করেছে, যা ভাঙা অত্যন্ত কঠিন।
আজ বিশ্বব্যাপী মুসলমানরা যতটা ঐক্যবদ্ধ, তা আমরা কখনোই যথেষ্টভাবে স্বীকৃতি দিই না। আমরা আমাদের নীতি, প্রথা, মূল্যবোধে ঐক্যবদ্ধ। আমাদের মুসলমানদের জন্য এই ঐক্যকে স্বীকার করা এবং এর শক্তিকে কাজে লাগানো আবশ্যক। একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই ঐক্যকে আলিঙ্গন করা, এর মূল্যায়ন করা এবং বিভ্রান্তিকর ধারণায় বিভ্রান্ত না হওয়া। এটি উপনিবেশবাদ ও সাম্রাজ্যবাদী শাসনের স্থায়ী উত্তরাধিকারের বিরুদ্ধে একটি রাজনৈতিক প্রতিরোধ। কারণ আমাদের উপলব্ধ বিভক্তি নিয়ে চলমান অন্তঃকলহ ও হতাশা পুরোপুরি নিজেদের সৃষ্টি নয়। বিভক্তির এই মিথ্যা ধারণাটি আমাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে বহিরাগত শক্তি দ্বারা, যারা বহু শতাব্দী ধরে দমন করার জন্য কাজ করে যাচ্ছে। তারা চায় আমরা বিশ্বাস করি, যেহেতু কোনো সর্বজনীন ইসলামি রাজনৈতিক ঐক্য নেই, তাই আমরা কোনো কিছুর মধ্যেই ঐক্যবদ্ধ নই। তারা চায় আমরা হতাশায় ডুবে যাই এবং সত্যিকার অর্থেই বিভক্ত হয়ে পড়ি, যাতে তারা আমাদের ওপর তাদের আধিপত্য বজায় রাখতে পারে।
মুসলিম সমাজে আজ বিদ্যমান বিভক্তির বর্ণনাটি পশ্চিমা উপনিবেশবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের প্রভাব থেকে আলাদা করা যায় না। দুই শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে মুসলিম বিশ্ব পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক দমন-পীড়নের শিকার হয়েছে। ঔপনিবেশিক প্রশাসকরা যে কৃত্রিম সীমানাগুলো টেনে দিয়েছিল, সেগুলো মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোকে বিভক্ত করার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছিল, যাতে জনগণের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হয়।
আজও এই আরোপিত সীমানাগুলো সংঘাত ও অস্থিরতা উসকে দিয়ে চলেছে। তবুও মুসলিম উম্মাহর ঐক্য এমনভাবে টিকে আছে, যা এই দখলদাররা মুছে ফেলতে পারেনি। ইসলাম চর্চার ধারাবাহিকতা, নামাজ থেকে শুরু করে হজ পর্যন্ত চৌদ্দশ বছরেরও বেশি সময় ধরে একটি অবিচ্ছিন্ন আধ্যাত্মিক বন্ধনের সাক্ষ্য দেয়। এই বিশ্বাসভিত্তিক ঐক্য অসংখ্য সাম্রাজ্য ও শাসনব্যবস্থাকে অতিক্রম করে টিকে আছে। প্রথম চার খলিফার শাসন ও রাজনৈতিক পন্থার মধ্যে পার্থক্য ঐক্যকে ক্ষুণœ করেনি; বরং এটি ইসলামি নীতিমালার নমনীয়তা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্রকে তুলে ধরেছিল। একইভাবে আব্বাসীয় থেকে অটোমান সাম্রাজ্য পর্যন্ত বিভিন্ন মহাদেশে ইসলামি রাজনীতির বিবর্তন প্রমাণ করে যে, রাজনৈতিক ভিন্নতা মানেই বিভক্তি নয়। আমাদের জনগণ নিপীড়ন, সহিংসতা ও অন্যায়ের শিকার হয় অথবা কোনো বহিরাগত শক্তির বিরুদ্ধে পরাজয়ের সম্মুখীন হয়, যেমনটি আমরা সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দুঃখজনকভাবে বহু দেখেছি, তখন বিভক্তির অভিযোগ করে হতাশায় ডুবে যাওয়া উচিত নয়, বরং দৃঢ়তা প্রদর্শন করা এবং আমাদের ঐক্যের ভিত্তি যা কিছু আছে, সেগুলোর ওপর মনোনিবেশ করা জরুরি।
১৮৫৭ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে ভারতীয় বিদ্রোহ এ রকমই দৃঢ়তার এক শক্তিশালী উদাহরণ। ব্যর্থ এই বিদ্রোহের পর হাজার হাজার ভারতীয় আলেম শহীদ হয়েছিলেন। আলেমরা হতাশার কাছে মাথা নত করেননি। তারা বিপর্যয়কর এই ক্ষতির মানসিক অভিঘাত স্বীকার করেছিলেন, নিজেদের ব্যর্থতাকে মেনে নিয়েছিলেন এবং অবিলম্বে নিজেদের ধ্বংসস্তূপ থেকে পুনর্গঠনের কাজ শুরু করেছিলেন। তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন ব্রিটিশ ভারতের মধ্যে ইসলামি জ্ঞান সংরক্ষণ করার মাধ্যমে সামনে এগিয়ে যাওয়ার। এর ফলে দারুল উলুম দেওবন্দের মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত হয়, যার অবদান শুধু উপমহাদেশের মুসলিমদের নয়, বরং সমগ্র বিশ্বের মুসলিমদের সেবা ও শক্তি জুগিয়েছে। এমন এক নেতৃত্বের প্রকৃত শিক্ষা আজকের মুসলিমদের আকাক্সক্ষা করা উচিত। (সংক্ষেপিত)
লেখক : ফাউন্ডার ও ডিরেক্টর
দারুল কাসিম কলেজ, শিকাগো
আলজাজিরা থেকে ভাষান্তর আতিকুর রহমান