যুদ্ধ থামলেও সংগ্রাম থামছে না

গাজায় যুদ্ধবিরতি চুক্তি নিয়ে অনিশ্চয়তার মেঘ সরেছে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু চুক্তি অনুমোদনে মন্ত্রিসভার বৈঠক স্থগিত করলে নতুন করে সংকটের সৃষ্টি হয়েছিল। তবে শেষ মুহূর্তের জটিলতা কাটিয়ে চুক্তিটি অনুমোদনের ঘোষণা দিয়েছেন নেতানিয়াহু। গতকাল শুক্রবার তিনি জানান, জটিলতার অবসান ঘটায় তিনি তার নিরাপত্তা মন্ত্রিসভার বৈঠক ডাকছেন। এরপর দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ওই যুদ্ধবিরতি চুক্তির অনুমোদন দেবে সরকার। ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে এক যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়েছে, যেটি রবিবার থেকে কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে। তিন ধাপে এ যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে। প্রথম ধাপে, যুদ্ধবিরতি শুরুর ৪২ দিনের মধ্যে ৩৩ জন ইসরায়েলি জিম্মিকে মুক্তি দেবে হামাস। অন্যদিকে ইসরায়েল প্রায় এক হাজার ফিলিস্তিনিকে মুক্তি দেবে। যার মধ্যে দীর্ঘ কারাদণ্ড পাওয়া ব্যক্তিরাও থাকবেন। গাজার যুদ্ধবিরতি চুক্তির আওতায় প্রথম দফায় রবিবার জিম্মিদের মুক্তি দিতে পারে হামাস। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয় শুক্রবার এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

১৫ মাস ধরে চলা এ যুদ্ধে ৪৬ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত ও গাজা প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। যুদ্ধবিরতির ছয় সপ্তাহের প্রথম পর্বে গাজা ভূখণ্ড থেকে ধীরে ধীরে ইসরায়েলি সেনাদের প্রত্যাহার করা হবে। এ সময় ইসরায়েলের কারাগারগুলোতে বন্দি থাকা ফিলিস্তিনিদের মুক্তির বিনিময়ে গাজা থেকে জিম্মিদের মুক্তি দেবে হামাস। রয়টার্স জানিয়েছে, কোপার্নিকাস সেন্টিনেল-১ উপগ্রহের তথ্য অনুযায়ী দেড় বছর ধরে তীব্র বিমান হামলা ও ইসরায়েলি বাহিনীগুলোর স্থল অভিযানে গাজা ভূখণ্ডের প্রায় ৬০ শতাংশ ভবন ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে।

ফিলিস্তিনি ছিটমহলটি জুড়ে বিপুল ধ্বংসস্তূপ জমা হয়ে আছে। যুদ্ধবিরতি শুরু হলে এসব ধ্বংসস্তূপ নতুন প্রতিবন্ধকতা তৈরি করবে। অন্যান্য দূষণকারী পদার্থগুলোর পাশাপাশি ধ্বংসস্তূপগুলোতে অবিস্ফোরিত গোলাবারুদও ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকতে পারে। এ ধ্বংসাবশেষ ও আবর্জনার মধ্যে অগুনতি মানুষের লাশ আটকা পড়ে আছে, যা জটিলতায় আরেকটি স্পর্শকাতর মাত্রা যোগ করেছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে, ধ্বংস হয়ে যাওয়া ভবনগুলো থেকে অনেক ধুলো ছড়িয়ে পড়েছে। সেগুলো থেকে বের হওয়া বিপজ্জনক উপকরণ বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে অথবা সরবরাহ করা পানির সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। আর এসবের ফলে গাজার জনসাধারণ গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যার ঝুঁকিতে আছে।

সংস্থাটি বলেছে, আগামী পাঁচ থেকে সাত বছরে গাজার বিধ্বস্ত স্বাস্থ্য ব্যবস্থা পুনর্গঠনে কমপক্ষে ১০ বিলিয়ন ডলার বা আরও বেশি অর্থের প্রয়োজন হতে পারে। বৃহস্পতিবার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রাথমিক হিসেবে এমন তথ্য উঠে এসেছে। জাতিসংঘের স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধি রিক পিপারকর্ন বলেছেন, গাজার স্বাস্থ্য ব্যবস্থা পুনর্গঠন করতে অনেক বড় অঙ্কের অর্থের প্রয়োজন হতে পারে। ডব্লিওএইচও প্রধান তেদ্রোস আধানম গেব্রিয়াসাস এরই মধ্যে বলেছেন, গাজার ৯০ শতাংশ হাসপাতাল ধ্বংসযজ্ঞে পরিণত হয়েছে।

গাজা ভূখণ্ডের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ধ্বংসযজ্ঞের শিকার হয়েছে ছিটমহলটির উত্তরাঞ্চল। উপগ্রহের ছবিতে দেখা গেছে, সেখানকার ৭০ শতাংশ ভবন এবং গাজা সিটির ৭৪ শতাংশ ভবন ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। ভূখণ্ডটির দক্ষিণাঞ্চলের প্রধান শহর খান ইউনিসের ৫৫ শতাংশ অবকাঠামো ও মিসরের সীমান্তবর্তী শহর রাফার ৪৯ শতাংশ ভবন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। আর মধ্যাঞ্চলীয় শহর দিয়ের আল-বালাহর ৫০ শতাংশ ভবন আবর্জনায় পরিণত করে দেওয়া হয়েছে।

এদিকে যুদ্ধবিরতি চুক্তির ঘোষণা আসার পর থেকে গাজায় ইসরায়েলি হামলায় ১১৩ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। যার মধ্যে ২৮ শিশু ও ৩১ নারী রয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, আরও প্রায় ২০০ মানুষ গুরুতর আহত হয়েছে। যদিও কাতারসহ মধ্যস্থতাকারী দেশগুলো যুদ্ধবিরতির আগে দুপক্ষকেই সংযমের আহ্বান জানিয়েছিল। তবে সেটি তোয়াক্কা না করে গাজায় বর্বরতা চালিয়েই যাচ্ছে ইসরায়েল।