গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার পশ্চিম গোপিনাথপুর গ্রামে স্কুল ঘেঁষে চলছে অবৈধ ইটভাটা। ইট পোড়ানোর মৌসুমে সর্তক থাকতে হয় কমলমতি শিক্ষার্থীদের। মাঝেমধ্যে বাতাসে ধেয়ে আসে ইট ভাটার ধুলা-ধোঁয়া। তখন শিশু শিক্ষার্থীরা চোখ বন্ধ করে নাক চেপে নিজেদের রক্ষা করে।
এমন ভোগান্তিতে ফেলেছে নুনিয়াগাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আঙিনাতে গড়ে ওঠা এই অবৈধ ইটভাটা। প্রকাশ্যে ভাটায় পোড়ানো হচ্ছে কাঠ। একাধিক দপ্তরে অভিযোগ দিলে জরিমানার মধ্যেই সীমাবন্ধ প্রশাসন। শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য ঝুঁকি নিয়ে দুঃচিন্তায় অভিভাবকগণ। বিদ্যালয়ে পাঠদান বন্ধের উপক্রম।
পলাশবাড়ী শহর থেকে মাত্র তিন কিলোমিটার দূরে পশ্চিম গোপিনাথপুর গ্রাম। ওই গ্রামটি উপজেলার বরিশাল ইউনিয়নের অন্তর্গত। ১৯৯৫ সালের প্রতিষ্ঠিত হয় নুনিয়াগাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ৩৩ শতক জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যালয়ে শতাধিক শিক্ষার্থী লেখাপড়া করে। বতর্মানে পাঁচজন শিক্ষক রয়েছেন।
শিক্ষকদের অভিযোগ, ভাটা স্থাপনের পর থেকে ভাটা বন্ধের জন্য বিভিন্ন অধিদপ্তরে অভিযোগ দিয়ে আসছেন তারা। এ বছরও পরিবেশ অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসক, ইউএনও বরাবর অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। স্কুলের সীমানার ঘেঁষে গড়ে তোলা হয়েছে ভাটাটি । কাঠ পুড়িয়ে ইট পোড়ানো হচ্ছে। গোটা মৌসুম তারা এভাবেই পুড়তে থাকবে। স্কুলের চার পাশে ভাটা ঘিরে ফেলেছে। ধুলা-বালি আর ট্রাক্টরে শব্দ সব সময় লেগেই আছে। ভাটা থেকে কালো ধোঁয়া বিদ্যালয়ের ভবনে প্রবেশ করে শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট করছে। প্রায় শিক্ষার্থী শ্বাসকষ্ট কাশিসহ নানা সমস্যায় অসুস্থ হচ্ছে। এর আগে একাধিক অভিযানে অর্থ জরিমানা করে প্রশাসন। কিন্তু প্রশাসনের নির্দেশ অমান্য করে তারা ইট ভাটার কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
বুধবার সকালে সরেজমিনে দেখা গেছে, চারদিকে সবুজের সমারোহ। গ্রামের তিন ফসলি জমির অন্তত ছয় একর জমিতে চলছে ইট ভাটার কার্যক্রম। হাজার হাজার কাঁচা ইট প্রস্তুত করে রাখা হয়েছে। অন্তত ৫০ জন শ্রমিক ভাটায় কাজ করছেন। ভাটার পাশে গাছের গুঁড়ি ফেলে রাখা হয়েছে। শ্রমিকরা সেই গাছের গুঁড়ি ভাটায় ইট পোড়ানোর জন্য নিয়ে যাচ্ছে। স্কুলের সঙ্গে গ্রামের রাস্তাটি উচুনিচু ও ধুলা-বালি উড়ছে। চারপাশে ধুলার কারণে স্কুলের জানালা বন্ধ করে দিয়েছে শিক্ষকরা। ভাটার জায়গায় কিছু ইট ও মাটি ফেলে রাখা হয়েছে। ইট তৈরির জায়গা প্রস্তুত করা হচ্ছে।
জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের সূত্রে জানা গেছে, জেলায় মোট ১২৬টি ইটভাটা রয়েছে। এর মধ্যে বৈধ ভাটা মাত্র ১৬টি। বাকি ১১০ টি ভাটা অবৈধ। পশ্চিম গোপিনাথপুর গ্রামে স্কুল ঘেঁষে ইটভাটাটি অবৈধ। এই ভাটার রেজিস্ট্রেশন, পরিবেশ ছাড়পত্র নেই। নেই জেলা প্রশাসনের অনুমতি।
জানতে চাইলে গাইবান্ধা পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মুহাম্মদ হেদায়েতুল ইসলাম বলেন, স্কুল ঘেষে ইটভাটা স্থাপনের কোনো সুযোগ নেই। গাইবান্ধায় নতুন কার্যালয় করা হয়েছে। সম্প্রতি ওই অবৈধ ভাটাতে যৌথ অভিযানে ১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। ভাটা কার্যক্রম বন্ধের জন্য নোটিশ করা হয়েছে। কিন্তু নোটিশ অপেক্ষা করে তারা আবার ভাটা চালু রেখেছে। এবিষয়ে অভিযোগ পেয়েছি, দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অথচ ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন)২০১৯ অনুযায়ী, বিশেষ কোনো স্থাপনা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রেলপথ, হাসপাতাল ও ক্লিনিক, গবেষণা প্রতিষ্ঠান কিংবা অনুরূপ কোনো স্থান বা প্রতিষ্ঠান থেকে কমপক্ষে এক কিলোমিটার দূরে ইটভাটা স্থাপন করতে হবে।
এলাকাবাসী জানায়, এই গ্রামের তিন ফসলি জমি ইজারা নিয়ে অবৈধভাবে ইটভাটা নির্মাণ করেন উপজেলার পশ্চিম গোপিনাথপুর গ্রামের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী শ্রী গোপাল চন্দ্র। মের্সাস এমএমবি ব্রিকস ১ নাম দেওয়া হয়েছে। এই ভাটা থেকে পশ্চিমে দুই কিলোমিটার দূরে তাদের আর একটি ভাটা রয়েছে। তিনি প্রশাসনকে ম্যানেজ করে ভাটা চালান।
এ নিয়ে এলাকাবাসীর অভিযোগের প্রেক্ষিতে গেল ২৩ ডিসেম্বর ভ্রাম্যমাণ আদালত এক লাখ টাকা জরিমানা করে এবং পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ভাটাটির কার্যক্রম বন্ধ রাখতে বলা হয়। ওই সময় ভাটা চালু করবেন না বলে মুচলেখা দেন ভাটার মালিক। কিন্তু উল্টো পরদিন থেকেই ভাটাটি আবার চালু করা হয়।
রহস্যজনক কারণে ভাটাটি বন্ধের জোড়ালো পদক্ষেপ নেইনি প্রশাসন। এই ভাটার রেজিস্ট্রেশন,পরিবেশ ছাড়পত্র নেই। নেই জেলা প্রশাসনের অনুমতি। ভাটা মালিক প্রভাবশালী হওয়ায় কেউ বাঁধা দিতে সাহস পাচ্ছেন না।
নুনয়াগাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সাহীনা আক্তার বলেন, বিষয়টি নিয়ে খুব কষ্টে আছি আমরা। ইটের ভাটা লোকালয়ের বাইরে স্থাপনের নিয়ম থাকলেও এটি করা হয়েছে স্কুলের সীমানা ঘেঁষে। শিশুদের শ্বাসকষ্টসহ নানা ধরনের স্বাস্থ্য ঝুঁকি রয়েছে। স্কুলে পাঠদানের পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পাশাপাশি পরিবেশ দূষণের কারণে ওই এলাকার তিন ফসলি জমি, বসতবাড়ি ও গাছপালা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এর প্রতিকার চেয়ে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে অভিযোগ দিলেও কোনো কাজ হচ্ছে না।
এসব বিষয়ে ইটভাটা মালিক শ্রী গোপাল চন্দ্রের মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন দিয়েও তার মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
মাসুম মিয়া নামের এক অভিভাবক বলেন, বাচ্চাকে বিদ্যালয়ে পাঠিয়ে চিন্তায় থাকতে হয় কখন বাচ্চাটি অসুস্থ হয়ে পড়ে। স্কুলে গেলে নাকে পোড়ামাটির গন্ধ এসে লাগে। চোখ মেলে যাতায়াত করতে দম বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম হয়। প্রশাসন আসে চলে যায়,কিন্তু ভাটা বন্ধ হয় না।
এ বিষয়ে পলাশবাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) ও সহকারি কমিশনার (ভুমি) আল-ইয়াসা রহমান তাপাদার জানান, অবৈধ ইট ভাটায় অভিযান অব্যাহত রয়েছে। সম্প্রতি ওই ভাটার মালিককে ১ লাখ টাকা জরিমানা করে ভাটার কার্যক্রম বন্ধ ও ভাটা স্থান্তান্তের জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তারপরও ভাটার চালু রাখলে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানান তিনি।