দেশে ফিরতে হবে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থীদের

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রম্পের অভিবাসন নীতিমালার আওতায় যুক্তরাষ্ট্রে চিরস্থায়ীভাবে থাকার জন্য রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থী হয়ে যেসকল বাংলাদেশি আবেদন করেছেন কিন্তু চূড়ান্ত আদেশ এখনও পাননি তাদের দেশে ফিরে যেতে হবে। গত দেড় দশকে দেশের বিভিন্ন দলের হাজার হাজার নেতাকর্মী এই রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থী আবেদন করে চূড়ান্ত রায়ের অপেক্ষায় তীর্থের কাকের মত বসে আছেন। এদের মধ্যে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি, জামায়েতে ইসলামিসহ অন্যান্য দলের নেতাকর্মীরাও রয়েছেন।

নতুন অভিবাসী নতুন নীতিমালা সম্পর্কে নিউ ইয়র্কের আইনজীবী খায়রুল বাশার বলেন, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি আমলে যারা রাজনৈতিক আশ্রয় গ্রহণ করে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে তাদের অনেককেই দেশে ফেরত যেতে হতে পারে। এ সময়ের মধ্যে কেউ যদি কোনো নির্দিষ্ট আদেশ পেয়ে থাকেন তাদের ফেরত যেতে হবে না । শুধু রাজনৈতিক আশ্রয় নয় অভিবাসী সংক্রান্ত যে কোনো সমস্যায় পড়লে প্রবাসীদের অভিজ্ঞ অভিবাসী আইনিজীবীদের সঙ্গে পরামর্শ নেবার আহবান জানান তিনি।

তিনি বলেন, নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব আইন বাতিলের ঘোষণায় অন্যান্য দেশের অবৈধ নাগরিকদের মত ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছেন প্রচুর সংখ্যক বাংলাদেশি। তাদের আশ্বাস দিয়ে বলেন ভীত হবার কোনো কারণ নেই। কারণ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এত সহজে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব আইন বাতিল ও অবৈধ নাগরিকদের বহিষ্কার করতে পারবে না। এ দেশের সংবিধানের সংশোধন ও আইনি অনেক ঝামেলা রয়েছে। তাই যুক্তরাষ্ট্রে কাগজপত্রহীন বাংলাদেশিদের দুঃশ্চিন্তা না করার পরামর্শ দেন তিনি।

বিভিন্ন অভিবাসী সংস্থা ও মার্কিন অভিবাসী আইনজীবিরাও একই ধারণা পোষণ করেছেন। ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্টের (আইসিই) আসন্ন অভিযানে নিউ ইয়র্কের অনথিভুক্ত অভিবাসীদের শিক্ষিত করার জন্য জরুরি প্রচেষ্টা শুরু করেছে।

কুইন্সের নির্বাচিত কর্মকর্তারা এবং অভিবাসী অধিকার সংগঠনগুলো অনথিভুক্ত অভিবাসীদের আহ্বান জানিয়েছেন যেন তারা নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হন, কারণ ট্রাম্প প্রশাসন নিউ ইয়র্ক সিটিতে ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইসিই) অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

সাম্প্রতিক মিডিয়া রিপোর্টে বলা হয়েছে যে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিষেকের পরপরই আইসিই এজেন্টরা নিউ ইয়র্কে অভিযান শুরু করতে চলেছেন। অফিসে যোগ দেওয়ার আগে ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে তার প্রশাসন 'আমেরিকার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বিতাড়ন কার্যক্রম' শুরু করবে। বলা হচ্ছে এই অভিযান প্রথমে শিকাগোতে শুরু হবে এবং তারপর মিয়ামি ও নিউ ইয়র্ক সিটিতে সম্প্রসারিত হবে।

এই প্রেক্ষাপটে অভিবাসী অধিকার সংস্থা ‘মেক দ্য রোড নিউ ইয়র্ক’গত নভেম্বরের নির্বাচনের পর থেকে স্থানীয় সম্প্রদায়ের জন্য নিয়মিত ‘আপনার অধিকার জানুন’ কর্মশালা পরিচালনা করে আসছে। এই প্রেজেন্টেশনগুলো অনথিভুক্ত বাসিন্দাদের ক্ষমতায়ন করার লক্ষ্যে তাদের সাংবিধানিক অধিকার এবং আইসিই অভিযানের সময় কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে হবে তা শেখায়।

 মেক দ্য রোড নিউ ইয়র্ক-এর নাগরিক অধিকার এবং অভিবাসন বিষয়ে প্রধান সংগঠক লুবা কর্টেজ বলেছেন, সংস্থাটি অনথিভুক্ত অভিবাসীদের মার্কিন সংবিধানের চতুর্থ এবং পঞ্চম সংশোধনীর অধিকার সম্পর্কে সচেতন করতে উল্লেখযোগ্য প্রচেষ্টা চালিয়েছে।

চতুর্থ সংশোধনী নাগরিকদের অযৌক্তিক তল্লাশি এবং আটক থেকে সুরক্ষা প্রদান করে এবং পঞ্চম সংশোধনী প্রক্রিয়াগত অধিকার এবং আত্ম-অপরাধ থেকে রক্ষা করে। কর্টেজ বলেন, এই অধিকারগুলো অভিবাসনের অবস্থা নির্বিশেষে অনথিভুক্ত অভিবাসীদের জন্য প্রযোজ্য।

‘মেক দ্য রোড’যেকোনো আইসিই অভিযানের সময় ব্যক্তিদের 'পঞ্চম সংশোধনী দাবি করার' এবং অবিলম্বে আইনজীবী গ্রহণ করার পরামর্শ দিয়েছে।

সংগঠনটি আরও জানিয়েছে, অনথিভুক্ত অভিবাসীরা দরজায় কড়া নাড়ার উত্তর দেওয়া থেকে বিরত থাকুন। কারণ আইসিই এজেন্টদের দরজা খোলা মানে তাদের বাড়িতে প্রবেশের নীরব অনুমতি দেওয়া।

কর্টেজ বলেন, যদি আপনি কারও উপস্থিতি লক্ষ্য করেন, তাহলে দরজা খুলবেন না। জিজ্ঞাসা করুন তারা কারা। যদি তারা বলে যে তাদের একটি পরোয়ানা আছে, তাদের তা ডাকবাক্স দিয়ে অথবা দরজার নিচ দিয়ে দেখানোর অনুরোধ করুন।

তিনি বলেন, অনথিভুক্ত অভিবাসীদের বিচারিক পরোয়ানা এবং প্রশাসনিক পরোয়ানার মধ্যে পার্থক্য সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। বিচারিক পরোয়ানায় বিচারকের স্বাক্ষর থাকে এবং এটি আইসিই এজেন্টদের কোনো বাড়িতে প্রবেশ করার অধিকার প্রদান করে। অন্যদিকে প্রশাসনিক পরোয়ানায় কেবল একটি সিল থাকে এবং এটি কোনো তল্লাশি করার অনুমতি দেয় না।

কোর্টেজ আরও বলেন, আইসিই এজেন্টরা প্রায় ৯৯% সময় প্রশাসনিক পরোয়ানা বহন করে। মানুষ এই পার্থক্য জানে না, তাই তারা ধরে নেয় এটি একটি বৈধ পরোয়ানা এবং তাদের (আইসিই) ঢুকতে দেয়। আমরা সত্যিই চাই যে লোকেরা এই দুই ধরনের পরোয়ানার মধ্যে পার্থক্য এবং কীভাবে আইসিই আপনার বাড়িতে প্রবেশের ক্ষমতা পায় তা বুঝুক।

নিউইয়র্ক স্টেট অ্যাসেম্বলির সদস্য ক্যাটালিনা ক্রুজ ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করে বলেন, গুজব প্রায়ই নিউ ইয়র্কের অনথিভুক্ত সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে ভীতি সৃষ্টি করতে পারে। আগামী চার বছরে অনেক গুজব এবং ভয়ের পরিবেশ তৈরি হবে। আমরা আমাদের প্রতিবেশীদের সচেতন থাকার এবং ভুল তথ্য না ছড়ানোর অনুরোধ করছি। তবে তাদের যেকোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকা উচিত এবং স্থানীয় আইনগত সেবা সংগঠনের সাথে যোগাযোগ করে তাদের অধিকার এবং বিকল্পগুলি আরও ভালোভাবে বুঝতে হবে। আমরা এর আগেও এই পরিস্থিতি থেকে বেঁচে গেছি। এবারও বাঁচব।

স্টেট সিনেটর ক্রিস্টেন গনজালেজ বলেন, নিউ ইয়র্ক একটি আশ্রয় শহর। আমাদের অবশ্যই সেই শিরোনামের পাশে দাঁড়াতে হবে এবং আমাদের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সম্প্রদায়গুলোকে রক্ষা করতে হবে। সকল মানুষের জীবনের মর্যাদা পাওয়ার অধিকার রয়েছে, যাতে তারা স্থানচ্যুতি বা বহিষ্কারের ভয়ে ভীত না হয়, এবং আমি সিটি ও স্টেট নেতাদের সঙ্গে কাজ করার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ নিউইয়র্কের অভিবাসীদের রক্ষা করতে।

অন্যদিকে, সিটি কাউন্সিলের সদস্য রবার্ট হোল্ডেন এক বিবৃতিতে বলেন, আইসিই অভিযান অনেক আগেই প্রয়োজন ছিল ফেডারেল আইন প্রয়োগ করার জন্য এবং আমাদের শহরগুলোকে অবৈধভাবে থাকা এবং অপরাধ করা লোকদের থেকে মুক্ত করার জন্য। আমাদের যথেষ্ট অপরাধী রয়েছে, আমাদের আরও অপরাধী আমদানি করার দরকার নেই। যারা ফেডারেল আইন লঙ্ঘন করে এবং অবৈধ অপরাধীদের বহিষ্কার থেকে রক্ষা করে, তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে।

এদিকে কোর্টেজ অনথিভুক্ত অভিবাসীদের তাদের কর্মস্থলের পাবলিক এবং নন-পাবলিক এলাকা সম্পর্কে সচেতন হতে অনুরোধ করেছেন। তিনি বলেছেন, এটি গুরুত্বপূর্ণ যে নিয়োগকর্তারা কর্মক্ষেত্রে নিরাপদ জায়গা নির্ধারণ করেন যেখানে তারা নিশ্চিত যে অনথিভুক্ত কর্মীরা আইসিই অভিযানের সময় নিরাপদ থাকবে।

কোর্টেজ আরও যোগ করে বলেন যে, যারা তাদের অভিবাসনের স্থিতির কারণে বহিষ্কারের ঝুঁকিতে নেই, তারা তাদের অনথিভুক্ত প্রতিবেশীদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে সাহায্য করতে পারেন।