‘বাংলার জ্যোতি ও ‘বাংলার সৌরভ’ নিলামে বিক্রি

৫০ কোটি ৫৬ লাখ টাকা রাজস্ব পাচ্ছে সরকার

আপডেট : ২৫ জানুয়ারি ২০২৫, ০১:৫২ পিএম

বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন ১৯৮৭ সালে ৬০ কোটি টাকায় ‘বাংলার জ্যোতি ও ‘বাংলার সৌরভ’ নামে দুটি জাহাজ কেনে। অগ্নিদুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আগপর্যন্ত এ দুই জাহাজ থেকে বছরে গড়ে প্রায় ৪০ কোটি টাকা নিট লাভ করেছে। দুর্ঘটনার পর অকেজো হয়ে যাওয়া জাহাজ দুটির নিলামে বিক্রি থেকে সরকার রাজস্ব পাচ্ছে ৫০ কোটি ৫৬ লাখ টাকা।

২০১৫ সাল থেকে গভীর সাগরে চলাচলের অনুপযোগী এ জাহাজ দুটি শুধু লাইটার জাহাজ হিসেবে কাজ করে আসছিল। কারিগরি সীমাবদ্ধতার কারণে জাহাজ দুটি অনেক আগেই শিপইয়ার্ডে বিক্রি করে দেওয়ার জন্য বলা হলেও বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন (বিএসসি) রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে তেল পরিবহন করে আসছিল। কিন্তু গত ৩০ সেপ্টেম্বর ও ৪ অক্টোবর দুই দফায় আগুনে সম্পূর্ণ অযোগ্য হয়ে পড়ে জাহাজ দুটি। আর দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দুদিক থেকেই লাভবান হয়েছে বিএসসি। 

এ বিষয়ে বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিনার্র্স অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এগুলো অনেক আগেই স্ক্র্যাপ হিসেবে বিক্রির উপযোগী হয়ে গিয়েছিল। এতদিন এগুলো বাড়তি সাপোর্ট দিয়েছে। এখন আর স্ক্র্যাপ ছাড়া গতি ছিল না। এতে ইন্স্যুরেন্সের কভারেজ যেমন পাচ্ছে তেমনিভাবে স্ক্র্যাপের মূল্যবাবদও টাকা বেশি পাচ্ছে বিএসসি।’

বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেক বলেন, ‘নিলামে জাহাজ দুটির সর্বোচ্চ দাম উঠেছে ৪০ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। চট্টগ্রামভিত্তিক শিপইয়ার্ড প্রতিষ্ঠান মাস্টার অ্যান্ড ব্রাদার্স এই দর হাঁকিয়েছিল। জাহাজ দুটিকে তারা রড তৈরির কাঁচামাল (স্ক্র্যাপ) হিসেবে ব্যবহার করবে। এদিকে দরদাতা প্রতিষ্ঠানটিকে ভ্যাট-ট্যাক্সসহ ৫০ কোটি ৫৬ লাখ টাকা পরিশোধ করতে হবে।’

এতে প্রত্যাশার চেয়েও বেশি দাম পাওয়া গেছে জানিয়ে কমোডর মাহমুদুল মালেক বলেন, ‘এই মূল্যের সঙ্গে আমরা ইন্স্যুরেন্স থেকে টাকাও পাব। সব মিলিয়ে বিএসসি আর্থিকভাবে লাভবান হয়েছে এবং সরকারও রাজস্ব পেয়েছে।’

রাষ্ট্রীয় তেল পরিবহনে বিএসসির এ দুই জাহাজের গুরুত্ব অনেক বেশি ছিল উল্লেখ করে কমোডর মাহমুদুল মালেক বলেন, ‘এ দুই জাহাজ থেকে বছরে গড়ে নিট লাভ হয়েছে প্রায় ৪০ কোটি টাকা। ৩৮ বছরে যা ১ হাজার ৫২০ কোটিতে গিয়ে পৌঁছে। এর সঙ্গে বর্তমানে ৫০ কোটি ৫৬ লাখ টাকা যুক্ত করলে ১ হাজার ৫৭০ কোটি ৫৬ লাখ টাকায় গিয়ে উন্নীত হয় নিট লাভের পরিমাণ।’ তবে শুধু নিট লাভ হিসাব করলেই এ দুই জাহাজের গুরুত্ব অনুধাবন করা যাবে না বলে জানান বিএসসি কর্তারা। এ দুই জাহাজে প্রায় ১০০ জন নাবিক কর্মরত ছিল। তাদের বেতন-ভাতা এবং এর সঙ্গে আরও অনেক ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ যুক্ত ছিল, যা অর্থনীতিকে সচল রেখেছে। 

১৯৮৬ সালে তৈরি হওয়া বাংলার জ্যোতি এবং বাংলার সৌরভ জাহাজের প্রতিটির ওজন ৩ হাজার ৭৮৭ টন। এর আগে গত ৫ ডিসেম্বর জাহাজ দুটি নিলামে বিক্রির জন্য দরপত্র প্রকাশ করেছিল বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন। নিলামে ১৬টি প্রতিষ্ঠান দরপত্র জমা দিয়েছিল। গত ৭ জানুয়ারি নিলাম হয়। এর মধ্যে একটি প্রতিষ্ঠান নন-রেসপনসিভ হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল বাকি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ দরদাতা হয়েছিল মাস্টার অ্যান্ড ব্রাদার্স।

এ বিষয়ে কথা হয় মাস্টার অ্যান্ড ব্রাদার্সের স্বত্বাধিকারী মাস্টার আবুল কাশেম বলেন, ‘আমাদের গ্রæপের আওতায় কয়েকটি শিপইয়ার্ড রয়েছে। বিএসসির জাহাজ দুটি আমার ছোট ভাই ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ মহসিন নিলামের মাধ্যমে ক্রয় করেছেন। এ জাহাজ দুটি স্ক্র্যাপ লোহা হিসেবে আমরা ব্যবহার করব।’

বিএসসির এ দুই জাহাজ বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) আমদানি করা তেল মাদার ভেসেল (বড় জাহাজ) থেকে ডলফিন জেটির ইস্টার্ন রিফাইনারিতে নিয়ে আসত। ২০১৫ সালে নেওয়া সিঙ্গেল পয়েন্ট মুড়িং (এসপিএম) নামে নেওয়া ৪ হাজার ৯৩৫ কোটি ৯৭ লাখ টাকার প্রকল্পটি ২০১৮ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করার কথা ছিল। কিন্তু তিন দফায় মেয়াদ বাড়ায় ব্যয় বেড়ে ৮ হাজার ৩৪১ কোটি টাকায় গিয়ে পৌঁছে। ২০২৩ সালের ৩ জুলাই ‘এমটি হোরে’ নামক জাহাজ থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে মহেশখালীর কালারমার ছড়ায় স্থাপিত ট্যাংকে তেল পরিবহনের পরীক্ষামূলক কাজ শুরু হলেও গত মার্চে পাইপলাইনে তেল পরিবহন শুরু হয় নিয়মিতভাবে। পাঁচ দিন খালাসের পর তা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর আর তা চালু করা যায়নি। মহেশখালীর কালারমার ছড়া ইউনিয়নে উপকূল থেকে ১৬ কিলোমিটার পশ্চিমে বঙ্গোপসাগরে সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) স্থাপন করা হয়েছল। এসপিএম থেকে ৩৬ ইঞ্চি ব্যাসের দুটি আলাদা পাইপলাইনের মাধ্যমে ক্রুড অয়েল ও ডিজেল আসার কথা। কিন্তু পরীক্ষামূলক চালুর পর আর তা চালু করা যায়নি। এসপিএম চালু থাকলে আর লাইটার জাহাজে করে তেল চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারিতে আনার প্রয়োজন পড়ত না।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত