নিগার সুলতানা জ্যোতির কথাগুলো এখনো স্পষ্ট বাজছে কানে। ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে খেলতে যাওয়ার আগে মিরপুরের শেরে বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামের সংবাদ সম্মেলন কক্ষে বসে আছেন বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দলের অধিনায়ক। রাজশাহীতে বড় দৈর্ঘ্যরে ম্যাচ খেলে এসেছেন, যেখানে তার নাম জুড়ে গেছে ইতিহাসে। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে সেঞ্চুরি করা বাংলাদেশের প্রথম নারী ক্রিকেটারের গৌরব তার নামের পাশে। জ্যোতি আশা করেছিলেন লম্বা সময় ব্যাটিং করার অভিজ্ঞতাটা কাজে লাগবে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে। হতাশা ঘুচবে ব্যাটিং নিয়ে। সেটা হয়নি। তিন ওয়ানডের সিরিজে একবার মাত্র পুরো ৫০ ওভার ব্যাট করতে পেরেছেন বাংলাদেশের ব্যাটাররা, সেটাও ৯ উইকেট হারিয়ে। একবারের জন্যও দলীয় দুইশ রান হয়নি। সিরিজটা বাংলাদেশের মেয়েরা হেরেছে ২-১ ব্যবধানে, প্রথম ম্যাচে হারের পর দ্বিতীয় ম্যাচ জিতে বিশ্বকাপে খেলার স্বপ্ন মেয়েরা বাঁচিয়ে রাখলেও তৃতীয় ওয়ানডেতে আগে ব্যাট করে মাত্র ১১৮ রানে গুটিয়ে গিয়ে ৮ উইকেটের হারে এখন বাছাইপর্বের অগ্নিপরীক্ষায় পড়তে হবে জ্যোতিদের।
২ উইকেটে ৭৪ রান থেকে ১১৮ রানে অলআউট। ৮ উইকেটের পতন ঘটেছে ৪৪ রানে। আর শেষ ৭ উইকেটের হিসাব নিলে ৯৪-৩ থেকে ১১৮ রানে অলআউট হতে বাংলাদেশের লেগেছে ১৩ ওভার আর ২৪ রান। বাংলাদেশের বিপদের বড় কারণ হয়েছেন কারিশমা রামচরক। ত্রিনিদাদে জন্ম নেওয়া এই অফস্পিনার আগের ম্যাচেও ৪ উইকেট নিয়েছিলেন, সিরিজ নির্ধারণী ম্যাচে ৬.৫ ওভারে মাত্র ১২ রান দিয়ে নিয়েছেন ৪ উইকেট। তার শিকারের তালিকায় আছেন সোবহানা আক্তারি, স্বর্ণা আক্তার, রাবেয়া খান ও ফারিহা তৃষ্ণা।
পুরুষ কিংবা নারী, বয়সভিত্তিক কিংবা জাতীয় দল; সংবাদ সম্মেলনে দলের নেতৃস্থানীয় যে খেলোয়াড়ই আসেন তাদের মুখে শোনা যায় যে বাংলাদেশকে জিততে হলে ভালো খেলতে হবে পুরো দল হিসেবে। একজন দুজনের ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সে জয়ের রাস্তা তৈরি হবে না। ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে সেই পুরনো কথাটাই যেন আবার মনে করালেন জ্যোতিরা। ওয়ানডাউনে নামা শারমিন আক্তার সুপ্তা একপ্রান্ত আগলে ৫৮ বলে ৩৭ রান করেছেন, ৫টা বাউন্ডারি মেরেছেন। দলের বাকি সবাই মিলে মেরেছেন মাত্র ৪টি বাউন্ডারি। ফারজানা হক পিঙ্কি মেয়েদের ক্রিকেটে ভরসাপূর্ণ ওপেনার, কিন্তু সীমিত ওভারের খেলায় মাঝে মাঝে তার অতিরিক্ত ধীরলয়ের ব্যাটিং দলের জন্য বিপদও ডেকে আনে। ২২ রান করতে পিঙ্কি নিয়েছেন ৬৫ বল, স্ট্রাইক রেট ৩৩। এই ২০২৪ সালে এসে এমন প্রস্তর যুগের ব্যাটিং, তাও আবার উদ্বোধনী ব্যাটসম্যানের; এই ব্যাপারটা মিরপুরের উইকেটের জন্য হয়তো উপযোগী। তবে সেন্ট কিটসের ব্যাটিং সহায়ক উইকেটে এ রকম একটা শুরু দলের জন্য উপকার বয়ে আনে না। অন্তত ৫০-৬০ স্ট্রাইক রেট না হলে শুরুতেই প্রতিপক্ষকে চড়ে বসার সুযোগ দেওয়া হলে, সেই চক্রব্যূহ থেকে বের হওয়া কঠিন।
খেলা যখন ক্যারিবিয়ানে, তখন প্রধান আশঙ্কা থাকে পেস বোলিং নিয়েই। কিন্তু পরপর দুই ম্যাচে ৪ উইকেট নিয়ে সিরিজ সেরা হওয়া অফস্পিনার কারিশমা রামচরককে খেলতেই যেন খাবি খেলেন বাংলাদেশের ব্যাটাররা। অথচ বাংলাদেশ দলের তরফ থেকে বরাবরই বলা হয় স্পিন বোলিং বাংলাদেশের বড় শক্তি। তাদেরই তো নেটে খেলেন জ্যোতি-পিঙ্কি-সুপ্তারা। বিদেশের মাটিতে গিয়ে স্পিনারকে ঝুড়ি ঝুড়ি উইকেট দিয়ে আসার মানে হচ্ছে দেশের স্পিনারদের সঙ্গে তাদের মানের ফারাক।
ঘুরে ফিরে শেষ পর্যন্ত ক্রিকেটের মৌলিক সমস্যার জায়গাতেই এসে আটকে যায় সবকিছু। ঘরোয়া ক্রিকেটে মেয়েদের যে লিগ হয়, তাতে একটা দুটো দল বাদে বাকি বেশিরভাগ দলেই মানসম্পন্ন ক্রিকেটারের অভাব। মানহীন প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন ঘরোয়া ক্রিকেটে অনেক অনেক রান করেও ব্যাটাররা বিদেশের মাটিতে রান করতে পারেন না। মেয়েদের টি-টোয়েন্টি খেলার অভিজ্ঞতা শুধু জাতীয় দলে, এর বাইরে নেই। এমনই এক দুষ্টচক্রে আটকে থেকে একই বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছে মেয়েদের ক্রিকেট। দেশের মাটিতে সমশক্তির বা কাছাকাছি শক্তির দলের সঙ্গে ঘরের মাঠে পেরে উঠলেও বিদেশের মাটিতে সাফল্যের দেখা সহজে মেলে না।
বাছাইপর্বের চিত্র
দ্বিতীয় ম্যাচ জয়ের পর নিগার সুলতানা জ্যোতি বলেছিলেন, ‘বিরক্তিকর বাছাইপর্বে’ খেলতে চান না তারা। কিন্তু সেই বিরক্তিকর বাছাইপর্বই খেলতে হবে এখন বাংলাদেশকে। কিছুটা পরিবর্তিত ফরম্যাটের বাছাইপর্বে আরও পাকিস্তান, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, আয়ারল্যান্ড, স্কটল্যান্ড ও থাইল্যান্ডের সঙ্গে লিগ পদ্ধতিতে খেলবে বাংলাদেশ। এই পর্বের শীর্ষ দুই দল যোগ দেবে বিশ্বকাপে সরাসরি ওঠা ৬ দলের সঙ্গে।
বাংলাদেশ এর আগে একবারই বিশ্বকাপ খেলেছিল সেটা ২০২২ সালে। সেবারও বাছাইপর্ব খেলতে হয়েছিল। তবে করোনার কাছে এই পর্ব শেষ না হওয়ায় পূর্ব পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে বাংলাদেশ সুযোগ পেয়েছিল চূড়ান্তপর্বে। এর আগে ২০১৭ সালের বাছাইপর্ব পেরুতে পারেনি বাংলাদেশ। ২০১১’র বাছাইপর্ব নিজেরা আয়োজন করেও তা থেকে উত্তীর্ণ হতে পারেনি।