সন্ত্রাসীদের বেপরোয়া উৎপাতে শান্ত খুলনা এখন আতঙ্কের নগরীতে পরিণত হয়েছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে গত সাড়ে পাঁচ মাসে নগরী ও জেলায় ১১টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। সর্বশেষ গত শুক্রবার রাতে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র অর্ণবকে নগরীর শেখপাড়া তেঁতুলতলা মোড়ে সন্ত্রাসীরা প্রথমে গুলি ও পরে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে।
জানা যায়, এদিন রাত সোয়া ৯টার দিকে তেঁতুলতলা মোড়ে চা পান করছিলেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ডিসিপ্লিনের মাস্টার্সের ছাত্র অর্ণব কুমার সরকার। এ সময় ৮ থেকে ১০টি মোটরসাইকেলে লোকজন এসে প্রথমে তাকে গুলি করে। গুলি তার গায়ে লাগার পর রাস্তায় লুটিয়ে পড়লে সন্ত্রাসীরা তাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে আহত। পরে আশঙ্কাজনক অবস্থায় পার্শ্ববর্তী খুলনা সিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
শুধু এ ঘটনাই নয়, সাম্প্রতিক সময়ে খুলনা নগরী যেন সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। প্রায় প্রতি রাতেই নগরীর কোথাও না কোথাও ঘটছে অস্ত্রের মহড়া, পাল্টাপাল্টি-ধাওয়া, গোলাগুলি, খুনসহ অপরাধমূলক নানা কর্মকাণ্ড।
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ (কেএমপি) থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে গত সাড়ে পাঁচ মাসে নগরীতে ১১টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।
সাধারণ মানুষের অভিযোগ, গত ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ৫ মাস পেরিয়ে গেলেও খুলনায় পুরোপুরি সক্রিয় হয়নি পুলিশ। আগের মতো পুলিশের টহল ও অভিযান দেখা যাচ্ছে না। এ ছাড়া কারাগারে থাকা বেশ কয়েকজন সন্ত্রাসী জামিনে বেরিয়ে এসেছে। একইসঙ্গে পালিয়ে থাকা সন্ত্রাসীরাও এলাকায় ফিরেছে। সক্রিয় হয়ে উঠেছে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য ও বখাটেরাও। তারা নগরীর বিভিন্ন জায়গায় মোটরসাইকেলে মহড়া দিচ্ছে। যার অধিকাংশেরই বয়স ১৮ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে। ব্যবসায়ীদের কাছে চাঁদাও দাবি করছে। মাদক বেচাকেনাও বেড়েছে। এসব কারণে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, টিসিবির পণ্য কেনার লাইনে দাঁড়ানোকে কেন্দ্র করে ২১ জানুয়ারি বেলা ১১টায় সন্ত্রাসীদের ছুরিকাঘাতে নগরীর ২১ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের সহসভাপতি মানিক হাওলাদার নিহত হন।
একই দিন সন্ধ্যায় নগরীর সরকারি আযম খান কমার্স কলেজের পাশের সড়কে নওফেল নামে এক ছাত্রদল কর্মীকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে আহত করে সন্ত্রাসীরা। এ ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতে রাত সাড়ে ৯টার দিকে প্রতিপক্ষের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে সজীব শিকদার নামে আরেক যুবক গুরুতর আহত করা হয়।
এর আগে গত শনিবার রাতে নগরীর মিস্ত্রিপাড়ার রসুলবাগ মসজিদের সামনে ২৭ নম্বর ওয়ার্ড স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক শাহীনকে হত্যার উদ্দেশে পরপর কয়েকটি গুলি ছোড়ে সন্ত্রাসীরা। একটি গুলি তার কানে বিদ্ধ হয়ে বের হয়ে গেলেও ডান বুকে বিদ্ধ হওয়া গুলিটি বের করতে পারেননি চিকিৎসকরা। তিনি ঢাকায় চিকিৎসাধীন।
গত ২ নভেম্বর রাতে নগরীর শেরে বাংলা রোডের আলকাতরা মিলের পাশে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করা হয় রাসেল ওরফে পঙ্গু রাসেলকে। একই রাতে বাড়িতে যাওয়ার পথে কমার্স কলেজের সামনে সন্ত্রাসীদের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে আহত হয় জেলা যুবদলের যুগ্ম সম্পাদক মো. হাবিবুর রহমান বেলাল।
৩০ নভেম্বর রাতে সন্ত্রাসীদের এলোপাথাড়ি কোপে আহত হন ৩০ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সদস্য সচিব আমিন হোসেন বোয়িং মোল্ল। চারদিন খুলনা সিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পর তার মৃত্যু হয়।
১২ ডিসেম্বর রাতে নগরীর লবণচরা থানা এলাকার একটি ফিলিং স্টেশনের সামনে কুপিয়ে জখম করা হয় রেজা শেখ নামে এক যুবককে। ধারালো অস্ত্রের আঘাতে শরীর থেকে তার পা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
১৩ ডিসেম্বর রাতে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়ার সময় নগরীর পূর্ব বানিয়াখামার এলাকায় আকাশ নামে এক যুবককে লক্ষ্য করে সন্ত্রাসীরা পরপর কয়েক রাউন্ড গুলি করে। একটি গুলি তার কোমরে বিদ্ধ হয়।
খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব মো. বাবুল হাওলাদার বলেন, ‘খুলনা এখন সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। পুলিশ প্রশাসন ও যৌথ বাহিনী মাঠে থাকলেও তারা অনেকটাই নিষ্ক্রিয়। যদিও তারা দাবি করেন, তারা এ ব্যাপারে সক্রিয়, কিন্তু চোখের সামনে প্রতিনিয়ত যা দেখছি, তাতে আমরা শঙ্কিত। নিরাপত্তাহীনতার মধ্য দিয়ে সবাইকে যেতে হচ্ছে।’
খুলনা মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব শফিকুল আলম তুহিন বলেন, পুলিশ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি। পুলিশ কাজে ফিরলেও তাদের ভূমিকা এখনো সন্তোষজনক না।
কেএমপির উপকমিশনার (মিডিয়া) আহসান হাবিব বলেন, সন্ত্রাসীরা অতর্কিতে মহানগরী এলাকায় প্রবেশ করে অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু ঘটনা ঘটিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে। তারা পুলিশের চোখ ফাঁকি দেওয়ার জন্য কৌশল অবলম্বন করছে। তবে প্রতিটি ঘটনাতেই সন্ত্রাসীদের চিহ্নিত করে তাদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। আমরা আশা করছি, শিগগিরই জনজীবনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে পারব।