সারাদেশে বন্ধ ট্রেন চলাচল, রেলকর্মীদের ক্ষোভের বলি যাত্রীরা

বিগত সরকারের আমলে বেতন, পেনশন ও আনুতোষিক সুবিধা কমিয়ে দেওয়া নিয়ে রেলওয়ের রানিং স্টাফদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছিল। এ নিয়ে তারা দীর্ঘদিন ধরেই আন্দোলন করছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের এ সময় সেই দাবি আদায়ে আন্দোলন আরও জোরদার হয়। বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যে দাবি পূরণ না হওয়ায় সোমবার রাত ১২টা থেকে সারা দেশে ট্রেন চলাচল বন্ধ রেখেছেন তারা। এতে চরম বিপাকে পড়েছেন সাধারণ যাত্রীরা।

সমস্যা সমাধানে সোমবার রাজধানীর কমলাপুরে আন্দোলনকারী রানিং স্টাফদের সঙ্গে বৈঠক করেন রেলওয়ের কর্মকর্তারা। তবে বৈঠকে কোনো সমাধান হয়নি দাবি করে নিজেদের কর্মবিরতির ঘোষণা অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।

বাংলাদেশ রেলওয়ে রানিং স্টাফ ও শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়ন সাধারণ সম্পাদক মো. মজিবুর রহমান রাত পৌনে ৮টায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ন্যায্য দাবি আদায়ে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করছি। এর আগে ২০২২ সালের ১৩ এপ্রিল রেল চলাচল বন্ধ করে দিয়েছিলাম। কিন্তু তখন দাবি পূরণের আশ্বাস দেওয়া হলেও পরে তা বাস্তবায়ন হয়নি। তাই এবার আর কোনো আশ্বাস নয়। দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত এই আন্দোলন চলবে।’ 

তিনি আরও বলেন, ‘এর আগেও তিনবার কর্মবিরতিতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ বারবার আশ্বাস দিয়েছিল যে আমাদের দাবি তারা বিবেচনা করছে। এখন আর আমাদের কোনো উপায় নেই।’

মজিবুর রহমান বলেন, ‘রেলওয়ের রানিং স্টাফরা ১৬০ বছর ধরে অবসরের পর মাইলেজের ভিত্তিতে পেনশন ও আনুতোষিক পেয়ে আসছেন। রাজনৈতিক ও প্রাকৃতিক যেকোনো দুর্যোগকালীন পরিস্থিতিতে ট্রেন সচল রাখেন তারা। তাদের কোনো সাপ্তাহিক ছুটি বা জাতীয় দিবসের বন্ধ নেই। কিন্তু গত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় আমাদের দীর্ঘদিনের সুবিধা কমিয়ে দেন।’ 

যাত্রী জিম্মি করে আন্দোলন কতটা যৌক্তিক, তা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা অনেক সময় দিয়েছি। কিন্তু দাবি মানা হয়নি। এখন আমাদের চাকরি গেলে যাবে। আমরা ২০৩৬ জন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানিয়েছি, দাবি মানতে না পারলে আমাদের বিদায় করেন। আমরা আর চাকরি করব না।’

যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. শামসুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, যাত্রীদের জিম্মি করে এভাবে আন্দোলন করা ভালো কিছু না। তবে এটাও সত্যি, রেলের কর্মীদের এই দাবি দীর্ঘদিনের এবং সেটি সমাধান করতে না পারার দায় মন্ত্রণালয় এবং রেলওয়ে কোনোভাবেই এড়াতে পারে না। 

তিনি বলেন, গত দেড় দশকে রেলে লাখ কোটি টাকার উন্নয়ন হয়েছে। কিন্তু তা টেকসই হয়নি। শুধু উন্নয়নসর্বস্ব চিন্তার কারণে রেল তার নিজের আয় বাড়াতে পারেনি। প্রতিষ্ঠান হিসেবে চরম অদক্ষতার পরিচয় দিয়েছে। অথচ রেলওয়ের মূল্যবান জমির সর্বোত্তম ব্যবহার এবং পণ্যবাহী ট্রেনসেবা বৃদ্ধির মাধ্যমে রেলওয়েকে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার বিরাট সুযোগ ছিল। এ কাজটা করতে পারলে তখন কিন্তু রেলের কর্মীদের এসব দাবি নিয়ে সমস্যা থাকত না। 

উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, পাশের দেশ ভারত সম্প্রতি তাদের কনটেইনারবাহী ট্রেনসেবার মাধ্যমে ৮ হাজার কোটি টাকা আয় করেছে। নিজেদের ব্যয় মিটিয়েও যাত্রীদের ২ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়েছে এখান থেকে।

শামসুল হক আরও বলেন, রেলের ওপরের কর্মকর্তা, আমলারা নানা সুবিধা বাগিয়ে নিয়েছেন এবং এখনো নিচ্ছেন। অথচ ব্যয়সংকোচনের নামে নিচের দিকের কর্মীদের সুবিধা কমিয়ে দেওয়া হলো। নিজেদের কৃচ্ছ্রসাধন না করে বরং উল্টো মজা করছেন, অপচয় করছেন। আর কর্মীদের বঞ্চিত করা হচ্ছে ন্যায্য সুবিধা থেকে। এটা তো চরম বৈষম্য। 

তিনি আরও বলেন, রেলে বিপুল বিনিয়োগ হলেও জনগণ কাক্সিক্ষত সুবিধা পাচ্ছেন না। এখন বঞ্চিতদের আন্দোলনের কারণে সেই যাত্রীরাই দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। 

রানিং স্টাফদের দাবি মন্ত্রণালয়ের হাতে নেই

রানিং স্টাফদের মূল বেতনের সঙ্গে রানিং অ্যালাউন্স (ভাতা) যোগ করে পেনশন প্রদান এবং আনুতোষিক সুবিধা দেওয়ার দাবিটি রেলপথ মন্ত্রণালয়ের হাতে নেই বলে জানিয়েছেন রেলপথ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান। 

তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘তাদের (রানিং স্টাফদের) যে দাবি ছিল, তা অর্থ বিভাগ কিছুটা গ্রহণ করেছে। আরও অনেক বিভাগের কর্মচারীরা দাবি-দাওয়া নিয়ে বিক্ষোভ করছেন। এটা তো বুঝতে হবে, স্বল্প সময়ে সব দাবি পূরণের সক্ষমতা সরকারের আছে কি না। রেলওয়ে রানিং স্টাফদের দাবির বিষয়টি আমাদের হাতে নেই। এটা অর্থ মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করা হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘সরকারের তো এটি দেওয়ার সামর্থ্য থাকতে হবে। এটা তো শুধু রেলওয়ের দাবি না, এ রকম অনেক বিভাগের দাবি আছে। এজন্য আমরা আলোচনা করছি, দেখা যাক কী হয়।’

রানিং স্টাফদের দাবি

রেলওয়েতে কর্মরত গার্ড, লোকোমাস্টার (চালক), সহকারী লোকোমাস্টার, সাব-লোকোমাস্টার এবং টিটিইদের রানিং স্টাফ বলা হয়। সারা দেশে রেলওয়েতে প্রায় দুই হাজার রানিং স্টাফ রয়েছেন।

স্বাভাবিক নিয়ম অনুযায়ী দৈনিক কর্মঘণ্টা আট ঘণ্টা হলেও রানিং স্টাফদের গড়ে ১৫-১৮ ঘণ্টা কাজ করতে হয়। সেজন্য তাদের আগে দেওয়া হতো বিশেষ আর্থিক সুবিধা, যাকে রেলওয়ের ভাষায় বলা হয় মাইলেজ। মাইলেজ রানিং স্টাফদের বেতনেরই অংশ।

ওই সুবিধার আওতায় প্রতি ১০০ কিলোমিটার ট্রেন চালালে রানিং স্টাফরা তাদের এক দিনের মূল বেতনের সমপরিমাণ টাকা অতিরিক্ত পেতেন। আট ঘণ্টায় এক দিনের কর্মদিবস ধরলে রানিং স্টাফদের প্রতি মাসে কাজ দাঁড়ায় আড়াই বা তিন মাসের সমপরিমাণ। তাদের বেতনও সেভাবেই দেওয়া হতো। 

এ ছাড়া মূল বেতনের হিসাবে অবসরকালীন ভাতা যা হয়, তার সঙ্গে অতিরিক্ত আরও ৭৫ শতাংশ টাকা বেশি দিয়ে পেনশন দেওয়া হতো তাদের।

২০২২ সালের জানুয়ারিতে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে রানিং স্টাফদের সেই সুবিধা বাতিল করা হয়। এ ছাড়া বেসামরিক কর্মচারী হিসেবে রানিং স্টাফদের পেনশন এবং আনুতোষিক ভাতায় মূল বেতনের সঙ্গে পাওয়া কোনো ভাতা যোগ করার বিষয়টি বাদ দেওয়া হয়। এরপর থেকে বাংলাদেশ রেলওয়ে রানিং স্টাফ ঐক্য পরিষদে ধারাবাহিকভাবে আন্দোলন করছে।

গত ২২ জানুয়ারি সংবাদ সম্মেলনে মাইলেজের ভিত্তিতে পেনশন ও আনুতোষিক প্রদান এবং নিয়োগপত্রের দুই শর্ত প্রত্যাহারসহ বিভিন্ন দাবি জানান রেলওয়ের রানিং স্টাফরা। তা না হলে ২৮ জানুয়ারি থেকে ট্রেন চলাচল বন্ধের হুঁশিয়ারি দেন।

নতুন নিয়োগ পাওয়া ট্রেনচালক, সহকারী ট্রেনচালকসহ রানিং স্টাফদের পুরনোদের মতো সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হচ্ছে না বলেও সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করা হয়।

লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, ২০২২ সালের পর নিয়োগপত্রে দুটি শর্ত আরোপ করা হয়েছে। নতুন নিয়োগ পাওয়া কর্মীরা চলন্ত ট্রেনে দায়িত্ব পালনের জন্য রানিং অ্যালাউন্স ছাড়া অন্য কোনো ভাতা পাবেন না এবং মাসিক রানিং অ্যালাউন্সের পরিমাণ মূল বেতনের চেয়ে বেশি হবে না।

এ ছাড়া অবসরে যাওয়ার ক্ষেত্রে সর্বশেষ আহরিত মূল বেতনের ভিত্তিতে পেনশন ও আনুতোষিক পাবেন, যা রেলওয়ের কোনো আইন বা বিধিবিধানে বলা নেই।

এদিকে রেলপথ মন্ত্রণালয় থেকে আবারও অর্থ মন্ত্রণালয়ের মতামত জানতে চাইলে সর্বশেষ গত ২৩ জানুয়ারি অর্থ মন্ত্রণালয় রেলপথ মন্ত্রণালয়কে জানায়, ‘২০২২ সালের ২১ আগস্ট অর্থ বিভাগের ৯১ নম্বর স্মারকে জারি করা পত্রের (খ) অনুচ্ছেদটি অপরিবর্তিত রাখা হলো এবং (ক) অনুচ্ছেদটি নিম্নরূপে সংশোধন করা হলো।’

সংশোধনে বলা হয়, ‘রানিং স্টাফ হিসেবে চলন্ত ট্রেনে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে ভ্রমণ ভাতা বা দৈনিক ভাতার পরিবর্তে রেলওয়ে এস্টাবলিশমেন্ট কোডের বিধান অনুযায়ী রানিং অ্যালাউন্স প্রাপ্য হবেন। চলন্ত ট্রেনে দায়িত্ব পালনের জন্য রানিং অ্যালাউন্স ছাড়া অন্য কোনো ভাতা প্রাপ্য হবেন না এবং মাসিক রানিং অ্যালাউন্সের পরিমাণ প্রাপ্য মূল বেতনের চেয়ে বেশি হবে না।’

আন্দোলনকারীরা জানান, ২০২২ সালের ৪ এপ্রিল অর্থ মন্ত্রণালয়ের একটি চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে ওই বছরের ১০ এপ্রিল রানিং স্টাফদের কর্মবিরতিতে সারা দেশে ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে অর্থ মন্ত্রণালয় ১৩ এপ্রিল চিঠিটি প্রত্যাহার করে নেয়। পরে তৎকালীন রেলপথমন্ত্রী ঢাকা রেলওয়ে স্টেশনে গিয়ে সংবাদমাধ্যমের সামনে এ সমস্যা দ্রুত সমাধানের আশ্বাস দেন। যার ধারাবাহিকতায় ২০২৩ সালের ১১ জুন তৎকালীন রেলওয়ের মহাপরিচালক স্পষ্ট করে রানিং স্টাফদের মাইলেজ যোগে পেনশন ও আনুতোষিক সুবিধা দেওয়ার নির্দেশ দেন। কিন্তু ওই বছরের ১৮ জুন অর্থ মন্ত্রণালয়ের একটি কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে আবারও আপত্তি জানায়। ফলে রানিং স্টাফদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে।