গা-ছাড়াভাবে কাজের অভিযোগ অনেক পুলিশের বিরুদ্ধে, তথ্য পাচার করছেন কেউ কেউ

রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও কিছু পুলিশ কর্মকর্তা ও অন্য সদস্যদের গা-ছাড়াভাবের কারণে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসছে না। প্রায় প্রতিদিনই হত্যা, অপহরণ, ছিনতাই, ডাকাতিসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকান্ড চলছে।

এসব নিয়ন্ত্রণ করতে পুলিশের ঊর্ধ্বতনরা দফায় দফায় বৈঠক করছেন। ইতিমধ্যে পুলিশ সদর দপ্তরসহ বিভিন্ন ইউনিটে ব্যাপক রদবদল করা হয়েছে। যারা দীর্ঘদিন পদোন্নতিবঞ্চিত ছিলেন, তাদের দেওয়া হয়েছে পদোন্নতি। এমনকি যেসব কর্মকর্তা অবসরে চলে গিয়েছিলেন, তাদেরও বাহিনীতে ফিরিয়ে এনে বসানো হয় উচ্চপদে।

পুলিশ সদর দপ্তর নিশ্চিত হয়েছে, সরকারকে বিতর্কিত করতে নতুন করে পদায়ন করাসহ বিভিন্ন স্থানে থাকা কর্মকর্তা ও অন্য সদস্যরা অলসতা দেখাচ্ছে। পাশাপাশি পুলিশের গুরুত্বপূর্ণ তথ্যও ফাঁস করে দিচ্ছেন কেউ কেউ। আর এসব রোধ করতে পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশে ইউনিট, রেঞ্জ ও জেলাগুলোতে বিশেষ টিম গঠন করা হয়েছে।

টিমের সদস্যরা ছদ্মবেশে ওই ‘অলস পুলিশদের’ চিহ্নিত করে প্রতিবেদন দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে পুলিশের একটি সূত্র দেশ রূপান্তরকে নিশ্চিত করেছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, পলাতক পুলিশ কর্মকর্তাদের আস্থাভাজনরা এখনো সক্রিয় আছে। তারা নানা কায়দায় তথ্য পাচার করছেন বলে অভিযোগ আছে। তাদের মধ্যে অনেকেই ভোল্ট পাল্টে আওয়ামী লীগবিরোধী হওয়ার চেষ্টা করছেন। এ চেষ্টা করে কেউ সফল হয়েছেন। আবার কেউ ব্যর্থ হচ্ছেন। এমনকি অর্থ খরচ করে ভালো স্থানে পোস্টিং নিয়েছেন।

তিনি আরও বলেন, মামলা হওয়া পুলিশ কর্মকর্তাদের মধ্যে কিছু কর্মকর্তা পেশাদার পুলিশ কর্মকর্তার নাম আছে। গত সরকারের আমলে তারা ভালো অবস্থানে থাকলেও কখনো অন্যায়কে প্রশ্রয় দেননি। ছাত্র-জনতার আন্দোলনবিরোধী ছিলেন না। পুলিশের কতিপয় কর্মকর্তার যোগসাজশে তাদের বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দেওয়া হয়েছে। এমনও পুলিশ সদস্য আছেন তারা সিনিয়র কর্মকর্তাদের গায়ে পর্যন্ত হাত তুলেছেন। তাদের মামলা থেকে নাম দ্রুত বাদ দিলে পুলিশের জন্যই মঙ্গল।

সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানায়, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পুলিশের দুইশোর বেশি কর্মকর্তা আত্মগোপনে থাকলেও তাদের আস্থাভাজনরা বিভিন্ন ইউনিটির গুরুত্বপূর্ণ স্থানে দায়িত্ব পালন করছেন। সেখান থেকে তারা কৌশলে সব ধরনের কলকাঠি নাড়ছেন বলে অভিযোগ আছে। এমনকি তাদের মাধ্যমে কেউ কেউ তথ্য পাচার করারও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।

আবার কিছু সৎ ও নিষ্ঠাবান পুলিশ কর্মকর্তাদের আসামি করায় কিছুটা সমালোচনা রয়েছে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নিয়েছে পাঁচ মাসের বেশি। এ সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখাসহ বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। অপরাধীদের বিষয়ে কঠোর অবস্থানে যাওয়ার নির্দেশনা দিয়েছে সরকারের হাইকমান্ড। নিয়মিত চিরুনি অভিযান হওয়ার কথা থাকলেও তা হচ্ছে না। রাস্তায় থাকছে না পুলিশের কোনো ধরনের টহল। রাত গভীর হলে নিস্তব্ধতা দেখা দেয়। এমনকি থানার সামনেও থাকে সুনসান নীরবতা।

অভিযোগ উঠেছে, পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটিতে কর্মরত সদস্যরা গা-ছাড়াভাবে থাকছেন। এমনকি আন্ডারওয়ার্ল্ডের অপরাধীরা জামিন নিয়ে ছাড়া পেয়ে যাচ্ছেন। ফলে কয়েক মাস ধরে দেশের আইনশৃঙ্খলা অবনতি হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশের ঊর্ধ্বতনরা দফায় দফায় বৈঠক করে চলেছেন। খুনখারাবি, চাঁদাবাজি, ডাকাতি, ছিনতাইসহ নানা অপরাধ বেড়ে গেছে আশঙ্কাজনকভাবে।

পুলিশ সূত্র জানায়, রাত নামতেই অলিগলি থেকে রাজপথের অধিকাংশ এলাকা চলে যায় ছিনতাইকারীদের দখলে। ঢাকার মোহাম্মদপুর, হাজারীবাগ, যাত্রাবাড়ীসহ একাধিক স্থানে অপরাধের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় নগরবাসীকে আতঙ্কগ্রস্ত করে তুলেছে। গণঅভ্যুত্থানে বিতর্কিত ভূমিকার কারণে পুলিশের মনোবল ও তৎপরতা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে গেছে। যৌথ বাহিনীর সাঁড়াশি অভিযানের উদ্যম নেই। অনেক ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে গড়িমসি করছেন অনেক পুলিশ সদস্য। এসব কারণে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। ব্যবসায়ীদের টার্গেট করে সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারী-ডাকাত দল ছিনিয়ে নিচ্ছে অর্থ ও মালপত্র।

ভুক্তভোগীরা বলছেন, রাতের ঢাকায় ছিনতাই প্রতিরোধে পুলিশের সক্রিয়তা কম। টহল পুলিশের দেখাও মেলে না। আবার ছিনতাই হওয়া অর্থ ও মালপত্র উদ্ধারের নজিরও কম। ফলে ছিনতাইয়ের ঘটনা বাড়ছেই।

পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমাদের কাছে তথ্য এসেছে, সরকারকে বিতর্কিত করতে কতিপয় পুলিশ কর্মকর্তা থেকে শুরু করে কনস্টেবল পর্যন্ত গা-ছাড়াভাবে চলছে। অলসভাবে তারা ডিউটি করছে। এসব ‘অলস কর্মকর্তাদের’ চিহ্নিত করতে বিশেষ টিম গঠন করা হয়েছে। প্রতিটি ইউনিট, রেঞ্জ ও প্রতিটি জেলায় গোপনে কাজ করছে। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকজনকে চিহ্নিত করা হয়েছে। সবাইকে চিহ্নিত করে প্রতিবেদন পাঠাবে পুলিশ সদর দপ্তরে।