এই প্রথম বাংলা একাডেমি তার সাহিত্য পুরস্কার স্থগিত করে সবার মনোযোগের কেন্দ্রে এলো, বিশেষত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আর গণমাধ্যম জুড়ে ঝড় বইছে। বাংলা একাডেমি যতটা গবেষণা বিষয়ে সম্পৃক্ত ছিল, তা ছাপিয়ে অধিকতর অন্য বিষয়ে জড়িয়ে পড়েছে। বইমেলা আয়োজন ও অন্য কাজে অনেক সময় অপচয় হয় বলে অনেকে ধারণা পোষণ করেন। বহুতল ভবন নির্মিত হয়েছে। কাজের পরিধিও বেড়েছে।
১৯৬০ সাল থেকে বার্ষিক পুরস্কার প্রদান করে বাংলা একাডেমি। এ পুরস্কার ‘বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার’ নামে সমধিক পরিচিত। বাংলা সাহিত্যের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য এই পুরস্কার দেওয়া হয়। ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন শাখায় ৯ জনকে এই পুরস্কার দেওয়া হতো। ১৯৮৬ সালে ২ জন সাহিত্যিক পুরস্কার পান (মোহাম্মদ রফিক ও হুমায়ুন আজাদ)। ২০০৯ সালে চারটি শাখায় পুরস্কার দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। ১৯৮৫, ১৯৯৭ এবং ২০০০ সালে বাংলা একাডেমি কাউকে সাহিত্য পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন দেয়নি।
১৯৫৫ সালে বাংলা একাডেমি প্রতিষ্ঠা লাভ করে। একাডেমি ১৯৬০ সালের ২৬ জুলাই পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর দি বেস্টলি একাডেমি (অ্যামেনডেন্ট) অর্ডিন্যান্স জারির মাধ্যমে বাংলা একাডেমি কার্যক্রমের সূচনা ঘটে। সাহিত্য পুরস্কার শুরু থেকে চালু আছে। কবিতা, উপন্যাস, নাটক, গবেষণা, ছোটগল্প, শিশুসাহিত্য, আত্মজীবনী, স্মৃতিকথা ও ভ্রমণ কাহিনি, বিজ্ঞান প্রযুক্তি ও অনুবাদ সাহিত্যে যারা অবদান রাখছেন তারাই একমাত্র বাংলা একাডেমি পুরস্কারে ভূষিত হয়ে থাকেন।
স্বাধীনতার পর অনেক কিছুর পরিবর্তন হয়েছে। বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্তি নিয়ে বিতর্ক ও মর্যাদা ক্ষন্ন হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হওয়া তার মধ্যে প্রধান।
রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন, ব্যক্তি বন্দনা ও সন্তুষ্টি কোনো কোনো ক্ষেত্রে এমন তীব্র হয়েছে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার যে প্রাপ্তি যে গৌরবের ছিল তা হয়েছে ম্লান; ম্লান থেকে ম্লানতর হচ্ছে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের কারণে। এমন মানুষ এ পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছেন, তাদের কেউ চেনে না। অজ্ঞাত, অখ্যাত, অপরিচিত ভাগ্যে হীনের সম্মান জুটেছে। অনেক পুরস্কারের সময় বাংলা একাডেমি অনেক সময় তাদের পুরস্কার ফিরিয়ে নিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে রাখঢাক করে পুরস্কার চালু রাখা হয়েছে। একজন লেখক ত গতবছর পুরস্কারপ্রাপ্তির প্রায় দশ বছর পর একাডেমি পুরস্কার বর্জন করেছেন।
বাংলা একাডেমি শুধু নয়, জাতীয় পর্যায়ে ঘোষিত পুরস্কার, পদক পুরস্কার নিয়ে কম বিতর্ক তৈরি হয়নি। ২০২০ সালে একুশে পদক ও স্বাধীনতা পুরস্কার বিতর্ক তুঙ্গে ওঠে সব ছাড়িয়ে যায়। বাংলা একাডেমির সাবেক মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান ৭ আগস্ট ২০২০ সালে ফেসবুকে লেখেন এবারের একুশে পদক বড়ই হতাশাব্যঞ্জক হয়েছে। যারা যারা পুরস্কার কমিটিতে ছিলেন তাদের সাহিত্য সংস্কৃতি সম্বন্ধে কোনো ধারণা নেই। তিন-চারটি ছাড়া অন্যগুলো ছিল হাস্যকর।
সাহিত্যিক, কে মুক্তিযোদ্ধা কে একেবারেই আমলা তারা কেউ এ পুরস্কার পেতে পারেন না। সে সম্পর্কে বিচারক ও বাছাইকারীদের অজ্ঞতা পর্বতপ্রমাণ। এতে সরকারের বদনাম হয়। সরকারকে এ বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে।
স্বাধীনতা পুরস্কার ঘোষণার পর শামসুজ্জামান লিখলেন, এবার সাহিত্যে পুরস্কার পেলেন রইসউদ্দিন ইনি কে চিনি না। নিতাই দাসই বা কে? হায়! স্বাধীনতা পুরস্কার। তখন রইজউদ্দিন ও কালিদাসকে স্বাধীনতা পুরস্কারের জন্য মনোনীত করা হয়েছিল।
একুশে পদক একজন কবির স্ত্রী পান, একটি মাত্র অনুবাদ গ্রন্থের জন্য।
স্বাধীনতা পুরস্কারে একজন সাবেক আমলার নাম অন্তর্ভুক্তিতে ক্ষোভ তীব্র দাবানলের মতো জ¦লতে থাকে।
অনেক আগে থেকেই বাংলা একাডেমি পুরস্কার বিতরণ পক্ষপাতদুষ্ট। শৈশব ও কৈশোরে কিংবা যৌবনের প্রথম ভাগে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারকে আমরা নোবেল পুরস্কার ভাবতাম বললে অত্যুক্তি হবে না। এবার বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ২০২৪ যারা মনোনয়ন পেয়েছিলেন তাদের ১০ জনের নাম ঘোষণা করা হয় ২৩ জানুয়ারি ২০২৫ তারিখ। আলোচনা, সমালোচনা ও বিতর্ক বিস্তৃত হয়।
২০১৭ সালে নিয়াজ জামানের নাম মনোনীত হলে বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। তাকে এ পুরস্কার গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকতে তৎকালীন মহাপরিচালক জানিয়েছিলেন। এ তথ্যের কথা উল্লেখ করেছেন কথাসাহিত্যিক আহমাদ মোস্তফা কামাল। পুরস্কার ঘোষণার পর কবি ফরিদ কবির ফেসবুক ওয়ালে লিখেছেন, ‘বাংলা একাডেমি পুরস্কার নিয়ে আমি অনেক লিখেছি। এক সময় মনে হলো অনেক হয়েছে। এ বিষয়ে কিছু লেখা প-শ্রম ছাড়া কিছু ছিল না। অনেক দিন চুপ ছিলাম। ভেবেছিলাম এ নিয়ে আর কিছু লিখব না। কারণ পুরস্কারটির দাম এক সম্পর্কে আমি নিজেই ১ টাকা ২৫ কিংবা ১ টাকা ৫০ বলে উল্লেখ করেছিলাম। কিন্তু এই পুরস্কার নিয়ে সাধারণ মানুষের কোনো আগ্রহ না থাকলেও লেখক সমাজে যখন বেশ আহা উহু ও হাহাকার দেখি তখন কিছু লেখার জন্য হাত ও হাতের আঙুল নিশপিশ করতে থাকে। তবে আজ লিখছি ভিন্ন কারণে। পুরস্কার প্রক্রিয়া সম্পর্কে ধারণা না থাকায় এমন সব প্রশ্ন উঠছে যা একটা জটিলতা সৃষ্টি করছে বলে আমার ধারণা।’ দুই ভাগের মনোনয়ন প্রথম ভাগে ফেলোদের মধ্য থেকে ও পরের ভাগের মহাপরিচালকসহ মনোনয়নকারীদের চূড়ান্ত বিচার সম্পর্কে তিনি একটি রসিকতার সূচনা করেছেন।
দীর্ঘ বক্তব্য আমি সম্পূর্ণটা না তুলে মূল কথা তুলে ধরলাম মাত্র। সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরওয়ায় ফারুকীর দুটি পোস্টও বানানভুল ভরা সামঞ্জস্যহীন, যেখানে ব্যক্তিগত ক্ষমতা প্রয়োগ এবং তিনি কর্তৃত্ব জাহির করছেন বলে নজরে পড়েছে।
প্রথম পোস্টে তিনি লিখেছেন, ‘বাংলা একাডেমি পুরস্কারের সঙ্গে মন্ত্রণালয়ের বা আমার ব্যক্তিগত কোনো সম্পর্ক নেই। একুশে পদকের ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা থাকে।
তারপরও মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত হিসেবে আমি এই পুরস্কার নিয়ে যে সমালোচনা হচ্ছে সেটা গ্রহণ করেছি। একজন নারী লেখক খুঁজে না পাওয়া বিস্ময়কর। এ ছাড়া কিছু ক্যাটাগরিতে যে প্রশ্ন উঠেছে সেগুলোও অযৌক্তিক না। সময় এসেছে এই পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন প্রক্রিয়া সংস্কার করা।
একই সঙ্গে একাডেমিকে একটা বিশেষ গোষ্ঠীর মিলনমেলা না বানিয়ে কি করে ইনক্লুসিভ করা যায়। কী করে তরুণ মেধাকে এর চালিকাশক্তির অংশ করা যায় সেটা নিয়ে আমাদের কাজ করতে হবে।’
তরুণ মেধাকে একাডেমির চালিকাশক্তির অংশ করা যায় কীনা সেটা নিয়ে আমাদের কাজ করতে হবে মোস্তফা সরওয়ার ফারুকীর এই বক্তব্য আমাদের নতুনভাবে উদ্দীপ্ত করেছে।
২৬ জানুয়ারি ২০২৫ তারিখে তিনি ফেসবুকে আরও লিখলেন, বাংলা একাডেমি পুরস্কারের জন্য ঘোষিত নামের তালিকা স্থগিত করা হয়েছে।
পাশাপাশি এটাও বলা প্রয়োজন যে, আজব নীতিমালা এ ধরনের উদ্ভট ও কোটারি পুরস্কারের সুযোগ করে দেয়। সেগুলো দ্রুত রিভিউ করা আমাদের প্রথম কাজ, পাশাপাশি বাংলা একাডেমি কীভাবে পরিচালিত হবে, কোন সব নীতিতে চলবে এসব কিছুই দেখতে হবে। একাডেমির আমূল সংস্কারের দিকে আমরা যাব এখন। দেশের সংস্কার হবে বাংলা একাডেমির কেন নয়? পুরস্কার স্থগিত করা হয়েছে।
২৫ জানুযারি ৬টায় বাংলা একাডেমিতে পুরস্কার কমিটির সভা হয়। সভায় উদ্ভূত সামাজিক, রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং পুরস্কার তালিকাভুক্ত কারও কারও সম্পর্কে কিছু অভিযোগ উত্থাপিত হওয়ায় বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ২০২৪-এর পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন সম্পর্কে আলোচনা হয়।
উত্থাপিত অভিযোগ সম্পর্কে অনুসন্ধানে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
এমতাবস্থায় বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ২০২৪-এর পূর্ব তালিকা স্থগিত করা হলো। অনধিক তিন কর্মদিবসের মধ্যে পুনর্বিবেচনার পর তালিকাটি প্রকাশ করা হবে। যদিও মঙ্গলবার তিন কর্মদিবস শেষ হলেও বুধবার সন্ধ্যায় এ লেখা প্রকাশ পর্যন্ত একাডেমি ঘোষণা দিতে পারেনি।
গণমাধ্যমে এসব অসামঞ্জস্য নিয়ে কথা বলছেন কবি সাহিত্যিকরা, বহুজনের বহু মন্তব্য সামাজিক মাধ্যম, ব্যক্তিগত মতবিনিময়, চা আড্ডায় চলছে। কেউ বলছেন যারা মনোনয়ন পেয়েছিলেন তাদের মর্যাদা ক্ষুন্ন হলো। কেউ বলছেন দু-একজনকে বাদ দিয়ে পুরস্কার দিলে মন্দ হতো না। কেউবা বলছেন পুরস্কার যথার্থই ছিল। কী প্রয়োজন ছিল এ স্থগিতের। কেউ বলছেন প্রথম আলো এবং নির্বাহী কমিটির এক নম্বর সদস্য কবি সাজ্জাদ শরিফের প্রিয়ভাজনরাই পেয়েছে পুরস্কার। মোটা দাগে বলা যায়, এর দায় সংশ্লিষ্ট সবার। এটা ভালো দৃষ্টান্ত নয়। চারপাশে যখন অস্থিরতা, তখন এ রকম একটা ঘটনা কি সাহিত্য অঙ্গনের গতিপথকে কি নতুন কিছুর সূচনা করল কিনা তা কি আমাদের জানিয়ে গেল?
এই পথচলা কি বন্ধুর হতে চলেছে? বাংলা একাডেমির পুরস্কার নীতিমালায় পরিবর্তন আসা প্রয়োজন। যদি এখন নীতিমালা ও ও নির্বাচক পদ্ধতি সঠিক-সুনির্দিষ্ট হয়, তবে তা হবে ভালো। আমরা স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসি। স্বপ্নের বাংলাদেশে যোগ্য মানুষ অনেক আছেন তারা পাদপ্রদীপের আলোয় আসতে পারেন না। যদি আসেন তবে তা ধন্যবাদার্হ। সাহিত্য- সংস্কৃতিতে নতুন আলোর ঝলকানি দেখার লড়াই-সংগ্রামে আমরা সমবেত। আবার মিলবে মেলা সেই গানের উদ্দীপনা আমাদের ধমনিতে বহমান।