ম্যানচেস্টারের ইতিহাদ স্টেডিয়ামের বাইরে আগুন লাগার দৃশ্য যেন প্রতীকী ছিল—ম্যানচেস্টার সিটির চ্যাম্পিয়নস লিগ অভিযানের জন্য। আগুন যেমন নেভানো হয়েছিল, তেমনি শেষ মুহূর্তের লড়াইয়ে নিজেদের প্লে-অফে টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছে পেপ গার্দিওলার দল। কিন্তু সামনের চ্যালেঞ্জ আরও কঠিন, কারণ পরবর্তী ধাপে তাদের প্রতিপক্ষ হতে পারে ইউরোপের দুই পরাশক্তি—রিয়াল মাদ্রিদ বা বায়ার্ন মিউনিখ।
গুরুত্বপূর্ণ এই ম্যাচের আগে মাঠের বাইরে আগুন লাগার ঘটনার প্রসঙ্গে গার্দিওলা রসিকতা করে বলেছিলেন, 'আমি ভাবছিলাম, সাংবাদিকরা তাদের হেডলাইন পেয়ে গেছে!' তবে মাঠে যে নাটকীয়তা হলো, সেটাও কম রোমাঞ্চকর ছিল না।
গোটা মৌসুমজুড়ে চ্যাম্পিয়নস লিগে দুর্বল পারফরম্যান্সের ছাপ রেখেছে ম্যানচেস্টার সিটি। গ্রুপ পর্বের নতুন ফরম্যাটে শুধু ২২তম স্থানেই শেষ করেছে তারা—একটি লজ্জার ব্যাপার ক্লাবটির উচ্চাকাঙ্ক্ষার সঙ্গে তুলনা করলে। ব্রুগের বিপক্ষে ৩-১ ব্যবধানে জিতলেও, প্রথমার্ধে যখন রাফায়েল ওনিয়েদিকার গোলে পিছিয়ে পড়েছিল, তখন মনে হচ্ছিল ইউরোপ থেকে ছিটকে যাচ্ছে সিটি।
সিটি শিবিরে তখন নীরবতা, গার্দিওলা ডাগআউটে হতাশায় টাকা মাথাতেও যেন চুল ছিঁড়ছিলেন। পুরো প্রথমার্ধে কোনো শটও লক্ষ্যে রাখতে পারেনি সিটি—গার্দিওলার কোচিং ক্যারিয়ারে এমন ঘটনা দ্বিতীয়বার ঘটল।
বিরতির পর গার্দিওলা মাঠে নামান সাভিনিয়োকে, তুলে নেন ইলকায় গুন্দোয়ানকে। এই বদলই হয়ে ওঠে ম্যাচের টার্নিং পয়েন্ট। নিজেদের মাঠে একরকম বেঁচে ফিরে আসে সিটি। তাদের উত্তরণের নায়ক কিন্তু নিজেরাই ছিল না, বরং ব্রুগের জোয়েল ওর্ডোনেজ আত্মঘাতী গোল করায় লিড পায় সিটি। এরপর আর পিছনে তাকাতে হয়নি, জয় নিশ্চিত করতে আরও দুটি গোল যোগ হয়।
এই জয়ে ১১ মৌসুম ধরে টানা নকআউট পর্বে খেলার ধারাবাহিকতা রক্ষা করল সিটি, কিন্তু চ্যাম্পিয়নস লিগের বর্তমান চ্যাম্পিয়নদের এমন অবস্থা নিঃসন্দেহে হতাশাজনক।
বাছাইকৃত দল: আতালান্তা, বরুসিয়া ডর্টমুন্ড, রিয়াল মাদ্রিদ, বায়ার্ন মিউনিখ, এসি মিলান, পিএসভি, পিএসজি, বেনফিকা।
অবাছাইকৃত দল: মোনাকো, ব্রেস্ত, ফেইনুর্ড, জুভেন্টাস, সেল্টিক, ম্যানচেস্টার সিটি, স্পোর্টিং সিপি, ক্লাব ব্রুগে।
৩১ জানুয়ারি সুইজারল্যান্ডের নিয়নে অনুষ্ঠিত হবে প্লে-অফের ড্র। সিটি যেহেতু অবাছাইকৃত দল, তাই তাদের প্রতিপক্ষ হতে পারে রিয়াল মাদ্রিদ বা বায়ার্ন মিউনিখের মতো পরাশক্তি। দুই লেগের এই লড়াইয়ে বাছাইকৃত দল নিজেদের মাঠে দ্বিতীয় লেগ খেলার সুবিধা পাবে।
গার্দিওলার দুশ্চিন্তার কারণ শুধু পরবর্তী প্রতিপক্ষই নয়, বরং দলের সামগ্রিক দুর্বলতা। পুরো মৌসুমে ডিফেন্স ছিল নড়বড়ে, আক্রমণে ধার কম, আর মিডফিল্ডেও ছিল ফাঁকফোকর। এমন অবস্থায় রিয়াল বা বায়ার্নের মতো দলগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা কঠিনই হবে।
গার্দিওলা অবশ্য আত্মবিশ্বাস হারাচ্ছেন না, বললেন, 'আমরা এটা ডিজার্ভ করেছি। রিয়াল তো এই প্রতিযোগিতার রাজা, বায়ার্ন দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় রাজা। তারা আমাদের মুখোমুখি হতে পেরে কতটা খুশি জানি না, তবে আমরা তৈরি।'
ইতিহাস বলে, দুর্বল শুরু করেও অনেক দল পরে ঘুরে দাঁড়িয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতেছে। সিটির জন্য আশার কথা, কেভিন ডি ব্রুইনে ধীরে ধীরে ছন্দে ফিরছেন, জন স্টোনস ফিরেছেন, রুবেন দিয়াস ও নাথান আকেরও ফেরার সম্ভাবনা আছে। কিন্তু এই মৌসুমের যে দুর্বলতা, সেটি কাটিয়ে না উঠতে পারলে শেষ ষোলোতে জায়গা পাওয়াও কঠিন হয়ে যেতে পারে।
এখন দেখার বিষয়, বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা নিজেদের ভুল শুধরে ইউরোপের শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখতে পারে কি না। কারণ প্লে-অফে জয় মানেই রিয়াল বা বায়ার্নের বিপক্ষে নতুন এক মহাযুদ্ধের প্রস্তুতি।