অর্থনীতির লাগাম টানতে হবে

গণঅভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনার দেশত্যাগ ও আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দায়িত্ব নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। গত ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দেশের স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনতে চেষ্টা চালাচ্ছে। সে ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকার সক্ষমতা দেখাতে পারেনি। আর্থিক খাতে এক ধরনের স্থবিরতা বিরাজ করছে। এ বাস্তবতায় নির্বাচনেরও আলোচনা উঠছে। ‘বিগত স্বৈরাচারী সরকারের সময় দেশের দুর্বল অর্থনৈতিক পরিস্থিতির’ কথা উল্লেখ করে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) বলেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের গত ছয় মাসে অর্থনীতিতে তেমন চাঞ্চল্য ফেরেনি। তা ছাড়া জরুরিভাবে নিত্যপণ্যের বাজারে নিয়ন্ত্রণ আনতেও ব্যর্থ হয়েছে সরকার। এমন পরিস্থিতিতে মৃত ব্যাংকগুলোকে বন্ধ করে দেশে রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে যত দ্রুত সম্ভব নির্বাচনের পরিবেশ তৈরির কথা বলেছে সিপিডি। বিগত সরকারের উন্নয়ন নীতি, দুর্নীতি এবং জবাবদিহিহীনতা দেশের অর্থনীতির ওপর বিপুল চাপ সৃষ্টি করেছে। বিদেশি মুদ্রায় আমদানি করা কাঁচামাল দিয়ে পণ্য রপ্তানি করে অর্থ দেশে না আনা, আমদানি-রপ্তানিতে মূল্য কমবেশি দেখিয়ে অর্থ পাচার ও ঋণ করে অলাভজনক উন্নয়নের খেসারত হিসেবে একসময়ের রেকর্ড বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ ঝুঁকিতে পড়েছে। খাদ্য ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বজায় রাখতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। উপরন্তু হাসিনা সরকারের বৃহৎ অবকাঠামোগত উন্নয়নের একটা বড় অংশই ছিল অপ্রয়োজনীয় এবং রাজনৈতিক বিবেচনাপ্রসূত। এগুলোর জন্য অবিবেচনাপ্রসূত সুদে বড় অঙ্কের ঋণ নিয়েছিল বিগত সরকার। এগুলোর সুদসহ সরকারের ঋণ পরিশোধের অক্ষমতা বর্তমানে অর্থনীতির ওপর চাপ বহুগুণে বৃদ্ধি করেছে। 

অন্যদিকে নতুন সরকার গঠনের পর ৫ মাস পার হলেও দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখনো স্বাভাবিক হয়নি। মব জাস্টিজ, পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা, শ্রম আন্দোলন, সরকারি বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দাবি আদায়ের আন্দোলন, ব্যবসা-বাণিজ্যে নিরাপত্তাহীনতাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। এতে বিদেশি ঋণপ্রাপ্তি ও রেমিট্যান্স বৃদ্ধিতে দেশে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় এগিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত মিললেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়ায় এর সুফল পাওয়া যাবে না বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। স্বৈরাচারী ও লুটেরা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মূল্যায়ন করার জন্য শে^তপত্র প্রকাশ করে। সেখানে গত ১৫ বছরের নির্মম লুটপাট, ব্যাংক দখল, লাগামহীন মূল্যস্ফীতি ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে আসে। বাংলাদেশ থেকে ২৮টি উপায়ে দুর্নীতির মাধ্যমে ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অবৈধভাবে পাচার হয়েছে বলে শে^তপত্রে দাবি করা হয়েছে। আমাদের মতো একটি অনুন্নত দেশে অর্থনৈতিক সংস্কারের লক্ষ্য কী হওয়া উচিত অন্তর্বর্তী সরকার তা পরিষ্কার করেনি। আমরা কি আমাদের সংস্কারের লক্ষ্যের বিষয়ে পরিষ্কার?

সিপিডির সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, জুলাই আন্দোলনের মূল কারণ ছিল কর্মসংস্থানের অভাব। বিগত সরকারের বৈষম্যমূলক নীতি বেকারত্ব পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করেছিল। সমাজে বৈষম্য বেড়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়ে কর্মসংস্থান বাড়াতে পারেনি। সংস্থাটি বলছে, জনগণের ম্যান্ডেট ছাড়া কোনো সরকার বেশি দিন থাকতে পারে না। অন্তর্বর্তী সরকারের ঘোষিত সময়ের মধ্যে নির্বাচন চায় তারা। এ পরিস্থিতিতে যত দ্রুত সম্ভব গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় যেতে সংস্থাটি অন্তর্বর্তী সরকারের আগামী ডিসেম্বর থেকে পরের বছর জুনের মধ্যে নির্বাচন দেওয়ার রোডম্যাপের কথা উল্লেখ করেছে।

দুঃখজনক বিষয় হলো, পতিত একনায়ক রাজনৈতিক সরকারের মতো বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার নানা পণ্য ও সেবা খাতে ভ্যাট ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়েছে, যা অভাবনীয়! ভ্যাট পরোক্ষ কর হওয়ায় সরকার সহজেই এর ভার সাধারণ জনগণের কাঁধের ওপর ছেড়ে দিতে পেরেছে। একদিকে দেশের মানুষের বড় চাওয়া মূল্যস্ফীতি কমানো, অন্যদিকে মুদ্রা সংকোচন নীতি প্রবৃদ্ধির হার কমিয়ে দেবে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বিপুল পরিমাণের ঋণ পেলেও অর্থনীতিতে চ্যালেঞ্জ রয়েছে। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাই অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।