একটি ভালো সংগীত তৈরি করতে গীতিকার সুরকার গায়ক ও বাদ্যযন্ত্রীর সমন্বিত প্রয়াস যেমন অপরিহার্য, তেমনি দেশ বা সংসারের সামষ্টিক অর্থনীতির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা সব পক্ষের সহযোগিতা ছাড়া সুচারুরূপে সম্পাদন সম্ভব নয়। আধুনিক শিল্প ও বাণিজ্য ব্যবস্থাপনার বেলাতেও, এমনকি যেকোনো উৎপাদন ও উন্নয়ন উদ্যোগেও ভূমি, শ্রম ও পুঁজি ছাড়াও মালিক শ্রমিক সব পক্ষের সমন্বিত ও পরিশীলিত প্রয়াস প্রচেষ্টা থাকতে হয়। এটাই সব সাফল্যের চাবিকাঠি বলে বিবেচিত হচ্ছে। মানব সম্পদ উন্নয়ন কার্যক্রমের দ্বারা দক্ষতা ও কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি ছাড়াও সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়াসে সুসমন্বয়ের আবশ্যকীয়তা অপরিহার্য। স্থান কাল পাত্রের পর্যায় ও অবস্থানভেদে উন্নয়ন ও উৎপাদনে সবাইকে একাত্মবোধের মূল্যবোধে উজ্জীবিত করাও সামগ্রিক সামষ্টিক ব্যবস্থাপনার একটা অন্যতম উপায় ও উপলক্ষ।
বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নকামী কল্যাণ অর্থনীতিতে সব পক্ষকে স্ব স্ব অবস্থানে থেকে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন এবং সব প্রয়াস প্রচেষ্টায় সমন্বয়ের মাধ্যমে সার্বিক উদ্দেশ্য অর্জনের অভিপ্রায়ে অয়োময় প্রত্যয়দীপ্ত হওয়ার পরিবেশ সৃষ্টির আবশ্যকতা অনস্বীকার্য। একজন কর্মচারীর পারিতোষিক তার সম্পাদিত কাজের পরিমাণ বা পারদর্শিতা অনুযায়ী না হয়ে কিংবা কাজের সফলতা ব্যর্থতার দায়দায়িত্ব বিবেচনায় না এনে যদি দিতে হয় অর্থাৎ কাজ না করেও সে যদি বেতন পেতে পারে, কিংবা তাকে বেতন দেওয়া হয়, তাহলে দক্ষতা অর্জনের প্রত্যাশা আর দায়িত্ববোধের বিকাশভাবনা মাঠে মারা যাবেই। এ ধরনের ব্যর্থতার বজরা ভারী হতে থাকলে যেকোনো দেশ ও সমাজ, অর্থনীতি রাজনীতি ভর্তুকির পরাশ্রয়ে যেতে বাধ্য। দারিদ্র্যপীড়িত জনবহুল কোনো দেশে পাবলিক সেক্টর বেকার ও অকর্মণ্যদের জন্য যদি অভয়ারণ্য কিংবা কল্যাণ রাষ্ট্রের প্রতিভূ হিসেবে কাজ করে তাহলে সেখানে স্বয়ম্ভর অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বপ্ন অধরা থেকে যাবে। উপযুক্ত কর্মক্ষমতা অর্জন ও প্রয়োগের পরিবেশ সৃষ্টি করে যদি বিপুল জনগোষ্ঠীকে জনশক্তিতে পরিণত করা না যায়, তাহলে উন্নয়ন কর্মসূচিতে বড় বড় বিনিয়োগও ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে পারে।
চাকরিকে সোনার হরিণ বানানোর কারণে সে চাকরি পাওয়া এবং রাখার জন্য অস্বাভাবিক দেনদরবার চলাই স্বাভাবিক। দায়-দায়িত্বহীন চাকরি পাওয়ার সুযোগের অপেক্ষায় থাকার ফলে নিজ উদ্যোগে স্বনির্ভর হওয়ার আগ্রহতেও অনীহা চলে আসে। মানবসম্পদ শক্তি ও সাহসের অপচয়ের এর চেয়ে বড় নজির আর হতে পারে না। দরিদ্রতম পরিবেশে যেখানে শ্রেণিনির্বিশেষে সবার কঠোর পরিশ্রম, কৃচ্ছতা সাধন ও আত্মত্যাগ আবশ্যক সেখানে সহজে ও বিনা ক্লেশে কীভাবে অর্থ উপার্জন সম্ভব সেদিকেই ঝোঁক বেশি হওয়াটা সুস্থতার লক্ষণ নয়। নেতা বা সমাজসেবক নির্বাচনে প্রার্থিতার পরিচয়ে যে অঢেল অর্থ ব্যয় চলে তা যেন এমন এক বিনিয়োগ যা অবৈধভাবে অধিক উসুলের সুযোগ সন্ধানেই সমর্পিত। শোষণ, বঞ্চনা, বিভেদ, বিসংবাদ সৃষ্টির মাধ্যমে জনস্বার্থ উদ্ধারে নিবেদিতচিত্ত হওয়ার বদলে নানা নেতৃত্ব নিজেরাই যখন আত্মস্বার্থ উদ্ধারে ব্যতিব্যস্ত হয়ে শোষণের প্রতিভূ বনে যায়, তখন দেখা যায় যাদের তারা প্রতিনিধিত্ব করছে তাদেরই তারা প্রথম ও প্রধান প্রতিপক্ষ। প্রচ- স্ববিরোধী এই পরিবেশ ও পরিস্থিতিতে সুশাসন, জবাবদিহিতা, জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার প্রয়াস বালখিল্যের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়।
মানুষের দায়িত্ববোধের দ্বারা কর্তব্য-কর্ম সুচারুরূপে সম্পাদনের মাধ্যমে সমাজ সমৃদ্ধি লাভ করে। আবার এই মানুষের দায়িত্বহীনতার কারণে সমাজের সমূহ ক্ষতিসাধিত হয়। ‘মানব’ সম্পদ না হয়ে সমস্যায় পরিণত হলে, সমাজের অগ্রগতি তো দূরের কথা, সমাজ মুখ থুবড়ে পড়তে বাধ্য। মানুষের উদ্ভাবনী শক্তি সভ্যতার বিবর্তনে সহায়তা করে। মানুষের সৃষ্ট দুর্ভিক্ষ, সহিংস সন্ত্রাসী কার্যকলাপ কিংবা যুদ্ধ এবং মারণাস্ত্রের ব্যবহারে মানুষের ধ্বংস অনিবার্য হয়ে ওঠে। মানবতার জয়গান মানুষই রচনা করে, আবার মানবভাগ্যে যত দুর্গতি তার স্রষ্টাও সে। মানুষের সৃজনশীলতা, তার সৌন্দর্যজ্ঞান, পরস্পরকে সম্মান ও সমীহ করার আদর্শ অবলম্বন করে সমাজ এগিয়ে চলে। পরমতসহিষ্ণুতা আর অন্যের অধিকার ও দাবির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার মাধ্যমে সমাজে বসবাস করার পরিবেশ সৃষ্টি হয়। অন্যের অন্যায়-অনিয়মের নজির টেনে নিজেদের অপকর্মের দৃষ্টান্তকে ব্যাখ্যার বাতাবরণে ঢাকার মতো আত্মঘাতী ও প্রবঞ্চনার পথ পরিহার করেই বরং সবার সহযোগিতা ও সমন্বিত উদ্যোগের আবহ সৃষ্টি করতে পারলে সমাজ নিরাপদ বসবাসযোগ্য হয়ে ওঠে। সমাজের উন্নতি, অগ্রগতি ও কল্যাণ সৃষ্টিতে মানুষের সার্বিক উন্নতি অপরিহার্য শর্ত। যে কারণে সমাজবিজ্ঞানীরা মানুষের আর্থ-সামাজিক সার্বিক উন্নয়নকে দেশ জাতি রাষ্ট্রের সব উন্নয়নের পূর্বশর্ত সাব্যস্ত করে থাকেন। মানুষ ছাড়া মনুষ্য সমাজের প্রত্যাশা বাতুলতামাত্র। সুতরাং একটি মানুষের উন্নতি সবার উন্নতি, সমাজের উন্নতি। একেক মানুষের দায়িত্ববোধ, তার কা-জ্ঞান, তার বৈধ অবৈধতার উপলব্ধি এবং ভালোমন্দ সীমা মেনে চলার চেষ্টা প্রচেষ্টার মধ্যে পরিশীলিত পরিবেশ গড়ে ওঠা নির্ভর করে। রাষ্ট্রে সব নাগরিকের সমান অধিকার এবং দায়িত্ব নির্ধারিত আছে। কিন্তু দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা অধিকার আদায়ের সম্ভাবনা ও সুযোগকে নাকচ করে দেয়। পণ্য ও সেবা সৃষ্টি না হলে চাহিদা অনুযায়ী ভোগের জন্য সম্পদ সরবরাহে ঘাটতি পড়ে। মূল্যস্ফীতি ঘটে সম্পদ প্রাপ্তিতে প্রতিযোগিতা বাড়ে। পণ্য ও সেবা সৃষ্টি করে যে মানুষ সেই মানুষই ভোক্তার চাহিদা সৃষ্টি করে। উৎপাদনে আত্মনিয়োগের খবর নেই, চাহিদার ক্ষেত্রে ষোলোআনা-টানাপড়েন তো সৃষ্টি হবেই। অবস্থা ও সাধ্য অনুযায়ী উৎপাদনে একেকজনের দায়িত্ব ও চাহিদার সীমারেখা বেঁধে দেওয়া আছে। কিন্তু এ সীমা অতিক্রম করলে টানাপড়েন সৃষ্টি হবেই। ওভারটেক করার যে পরিণাম দ্রুতগামী বাহনের ক্ষেত্রে, সমাজে সম্পদ অর্জন, সার্বিক চাঁদাবাজি, সত্যকে আড়াল, ন্যায়নীতি নির্ভরতাকে নির্বাসনে পাঠানোর ক্ষেত্রে সীমা অতিক্রমণে একই পরিবেশ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়ে থাকে। সমাজে নেতিবাচক মনোভাবের বিস্তার, অস্থিরতা ও নাশকতার যতগুলো কারণ এ যাবৎ আবিষ্কৃত হয়েছে তার মধ্যে সম্পদের অবৈধ অর্জন এবং এতদুপলক্ষে নির্মম প্রতিযোগিতা, নিজের ব্যাপারে ষোলোআনা জরুরি ভাবলেও অন্যের অধিকার অস্বীকার ও বর্জন এবং আত্মত্যাগ স্বীকারে অস্বীকৃতি মুখ্য।
জাপানে কলকারখানা কিংবা অফিস-আদালতে বার্ষিক বেতন বৃদ্ধির জন্য আন্দোলন হয় না। অর্থবছরে শুরুর পরপরই একটি নির্দিষ্ট দিনে শ্রমিক-মালিক পক্ষ একত্রে বসে বিগত বছরের আয়-ব্যয়ের স্থিতিপত্র সামনে নিয়ে খোলাখুলি আলোচনায় বসে স্থির করে আগামী বছরে বেতন বেশি হবে না কম হবে। কো¤পানি টিকলে আমি টিকব, এই নীতিতে বিশ্বাসী সবাই যার যার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করে থাকে। কো¤পানির প্রেসিডেন্ট, তার স্ত্রী কিংবা তার ছেলেকে কো¤পানির কর্মকালীন সময় আলাদা করে শনাক্ত করা চলে না। কো¤পানির প্রেসিডেন্ট, তার স্ত্রী ও ছেলেমেয়ে সবাই নিজেকে ওই কো¤পানির চাকুরে হিসেবে বিবেচনা করে। বছর শেষে কো¤পানির নিট লাভ-লোকসান যা হয়, তা-ই তার প্রকৃত পাওনা। কোম্পানিতে বড় সাহেব-ছোট সাহেব বলে কোনো ভেদ-বিভেদ নেই। আছে কর্মক্ষমতা দক্ষতা আর দায়িত্ব অনুযায়ী শ্রেণিবিন্যাস। সেখানে একজন সাধারণ কর্মীরও অবদান রাখার সুযোগ আছে। কো¤পানির সার্বিক অগ্রগতির পেছনে পরামর্শ দেওয়ার স্বীকৃতি আছে সবার।
সনি কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা প্রাণপুরুষ মরিতা সান তার আত্মজীবনীতে লিখেছেন, কো¤পানির প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রতিদিন সকালে অফিসে এসে প্রথমে তিনি পরিদর্শনে যান কারখানার টয়লেটগুলোয়। তিনি মনে করতেন, টয়লেট ও অন্যান্য আঙিনা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা রাখার দায়িত্বে যেসব শ্রমিক তাদেরও যথেষ্ট অবদান রাখার অবকাশ আছে উৎপাদনে। তিনি হিসাব করে দেখিয়েছেন, উৎপাদন শ্রমিকরা অবসরে যখন টয়লেটে আসে তখন তা যদি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পায় তখন তাতে তাদের মন প্রসন্ন হয়। সিটে ফিরে গিয়ে তারা আরও একনিষ্ঠ সহকারে উৎপাদনে মনোনিবেশ করতে পারে। এর ফলে উৎপাদনে উৎকর্ষ বৃদ্ধি পায়। এভাবে দিনে যদি ১০০০ টেলিভিশন উৎপাদিত হয় কোনো কারখানায়, মরিতা সানের মতে তার মধ্যে ন্যূনতম ৪টি টেলিভিশন উৎপাদন বেশি হয় উৎপাদন শ্রমিকের প্রসন্ন মন-মানসিকতার কারণে। তিনি সবাইকে উৎপাদনে যোগ্য অংশীদার হিসেবে স্বীকৃতি দিতেন। ফলে শ্রেণি ও পর্যায়ভেদে সবাই যার যার কাজ তা সুন্দর ও সুচারুরূপে সম্পাদন করে।
হোন্ডা কো¤পানির প্রতিষ্ঠাতা নিজেই হোন্ডা মোটরসাইকেলের ডিজাইন করতেন গভীর রাতে। গভীর মনোনিবেশ সহকারে এ কাজ যাতে তিনি করতে পারেন সে জন্য তার স্ত্রী রাত জাগতেন তার সঙ্গে। রাতে ফেরিঅলা মিষ্টি আলু বিক্রি করত সুন্দর সুরে গান করে। মিষ্টি আলু ফেরিওয়ালার গানের সুরে হোন্ডা সাহেবের মনোনিবেশে যাতে ব্যাঘাত সৃষ্টি না হয় সে জন্য তার স্ত্রী ফেরিওয়ালার পুরো আলু কিনে নিয়ে তাকে ঘরে ফিরে যেতে অনুরোধ করতেন। এ হচ্ছে আধুনিক প্রযুক্তি বলে বলিয়ান জাপানে পথিকৃৎদের প্রতিষ্ঠার কাহিনি। টয়োটা পরিবারের উত্থান একজন ব্যক্তির অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল। অনুসন্ধিৎসাও গভীর নিষ্ঠা অধ্যবসায় সামান্য অবস্থা থেকে তিলে তিলে গড়ে ওঠা এক বিশাল শিল্প সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা। কোয়ালিটির প্রশ্নে কোনো আপস নেই পরিবেশনে মুনশীয়ানায় আন্তরিকতায় কমতি নেই। ডিজাইন ও উৎপাদন প্রক্রিয়ায় গভীর অভিনিবেশ সহকারে এমন সচেতন ও একাগ্রতার সমাহার ঘটানো হয়ে থাকে যে যাতে উৎপাদনের প্রত্যেক পর্যায়ে অপচয়-বাতিল- পরিত্যক্তের পরিমাণ কমে আসে।
বহু দেশের জাতীয় নেতৃত্ব যখন অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রশ্নে গোটা দেশবাসীকে ভাববন্ধনে আবদ্ধ করতে জাতীয় স্বার্থ সমুন্নত রাখার চেষ্টায়, তখন সদ্য রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের পদপৃষ্ঠ থেকে উঠে আসা বাংলাদেশের মতো উন্নয়ন সম্ভাবনা সমৃদ্ধ সমাজে ঐকমত্যের ওজস্বিতা হাতড়াতে হচ্ছে কেন? শোষণ-বঞ্চনা ও বণ্টন বৈষম্যের অলিগার্কিক ও ফ্যাসিবাদী শাসনের যাঁতাকল থেকে ‘মুক্তির সংগ্রামে’ বিজয় লাভের পর এই প্রশ্ন এই বিবেচনা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক প্রতীয়মান হয়।
লেখক: বৈষম্যহীন বাংলাদেশ
প্রত্যাশী কলাম লেখক
mazid.muhammad@gmail.com