সাফ জেতানো মেয়েদের সঙ্গী কান্না

উথাল-পাথাল চলছিল বেশ কদিন ধরেই। বুকে জমে থাকা কষ্টগুলো উগড়ে দেবেন কি দেবেন না, এই দোলাচলে দুলছিলেন নারী সাফজয়ী বাংলাদেশ দলের অধিকাংশ ফুটবলার। অবশেষে নীরবতা ভেঙেছেন। জমে থাকা কষ্টগুলো উগরে দিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়লেন সাবিনা, মাসুরা, মারিয়া, ঋতুরা। জানিয়ে দেন, ব্রিটিশ কোচ পিটার বাটলারের অধীনে কোনো অবস্থাতেই খেলবেন না। প্রয়োজনে একযোগে ছেড়ে দেবেন খেলা। পরপর দুবার সাফ শিরোপা জেতানো মেয়েদের ভাগ্যে কী লেখা আছে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে বৃহস্পতিবার রাতের খবর, বিদ্রোহী এই ফুটবলারদের ক্যাম্প থেকে বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে বাফুফে!

কোচের প্রতি অনাস্থা এনেছেন দুই সাফে বাংলাদেশ দলকে প্রতিনিধিত্ব করা ১৮ ফুটবলার। বুধবার বাফুফে সভাপতির কাছে চিঠি দিয়ে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করেছিলেন। যেখানে স্বাক্ষর করেন জোড়া সাফজয়ী দলের অধিনায়ক সাবিনা খাতুন, সহঅধিনায়ক মারিয়া মান্ডা, কৃষ্ণারানী সরকার, মাসুরা পারভীন, শামসুন্নাহার সিনিয়র, শামসুন্নাহার জুনিয়র, শিউলি আযিম, সানজিদা আক্তার, ঋতুপর্ণা চাকমা, সুমাইয়া, মনিকা চাকমা, রূপনা চাকমা, তহুরা খাতুন, নাসরিন, সাগরিকা, নিলুফা ইয়াসমিন, স্বর্ণা ও সাথী আক্তার। তবে ক্যাম্পে থাকা বাকি ১২ ফুটবলার অবশ্য কোচের অধীনে অনুশীলন করতে রাজি হয়েছেন।

সাবিনাদের প্রত্যাশা খুব বেশি কিছু ছিল না। অক্টোবরে শিরোপা জয়ের পর পাওয়ার কথা ছিল অনেক কিছু। বাফুফে ঘোষিত দেড় কোটি টাকা বোনাস, নতুন চুক্তি, ম্যাচ ফি আড়াই মাসেও বাফুফের নতুন নের্র্তৃত্ব এর কিছুই দেয়নি মেয়েদের। তবে এই চাওয়াগুলোও মেয়েদের কাছে ছিল গৌণ। তাদের দাবি ছিল একটাই। প্রতিনিয়ত যে কোচের কাছে সম্মানহানি হয়েছে, যে কোচ সারাক্ষণ মানসিক চাপে রেখেছেন, ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে কটূক্তি করেছেন, মেয়েদের চালচলন, পোশাক-পরিচ্ছদ, এমনকি বডি শেমিং করতেও ছাড়েননি, সেই কোচের বিদায় চেয়েছিলেন তারা। বাফুফে তাদের এই চাওয়াটুকু গুরুত্ব দেয়নি। তাদের মতের বিরুদ্ধে গিয়ে কোচকে জবাবদিহির আওতায় না এনে উল্টো পুরস্কৃত করেছে, দুবছর নবায়ন করেছে চুক্তি।

বাটলার ক্যাম্পে যোগ দেওয়ার পর থেকেই বেঁকে বসেন ফুটবলাররা। তাতে ক্যাম্পে সৃষ্টি হয় অচলাবস্থা। নিজেদের সিদ্ধান্তে অনড় থেকে মেয়েরা তিন দিনে দুটি টিম মিটিংয়ে অংশ নেননি। বাটলারের সঙ্গে জিমেও বৃহস্পতিবার ঘাম ঝরাননি। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ক্যাম্প ছেড়ে ১৮ ফুটবলার নেমে আসেন বাফুফে ভবনের গাড়ি বারান্দায়। সঙ্গে ছিল তিন পৃষ্ঠার বিবৃতি। সেখানে পরিষ্কার করেন কেন তারা বাটলারের অধীনে খেলতে চান না। এ সময় কান্নায় ভেঙে পড়তে দেখা যায় মেয়েদের।

অধিনায়ক সাবিনা শুরু করলেও কান্নায় ভেঙে পড়ে কথা শেষ করতে পারেননি, ‘দেখুন এখানে একটা জিনিসই বলার, নিজেদের আর কিছু প্রমাণের নেই। ব্যাপারটা আত্মসম্মানের; (এ সময় কান্নায় ভেঙে পড়েন)। কারণ দিন শেষে মেয়েরা দেশের জন্য খেলে। কিন্তু দেশের মানুষ মেয়েদের যেভাবে কটূক্তি করছে, এটা মেয়েদের জন্য মেনে নেওয়াটা অসম্ভব।’ পরে অবশ্য নিজেকে সামলে সাবিনা বলেন, ‘উনি (বাটলার) অনেক হাইপ্রোফাইল কোচ, সন্দেহ নেই। তবে কোচ নিয়ে যখন এত কথা হচ্ছে, তার মানে কিছু একটা সমস্যা আছে। কিছু মিডিয়ায় এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমাদের নিয়ে যা লেখা হচ্ছে সেটা আমাদের প্রাপ্য কি না, জানি না। আমরা ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতির সঙ্গে বসতে চাই।’

মারিয়া মান্ডার কথা, ‘আপনারা জানেন এখানে আমরা এতবছর আছি, কখনো কোনো কোচ নিয়ে আপত্তি তুলিনি। ডিসিপ্লিনের কোনো ইস্যুও ছিল না। আমরাও ডিসিপ্লিন ভঙ্গ করিনি।’ সানজিদার দাবি, ‘মাঠে আমরা মানসিকভাবে চাপে থাকি। আসলে আমরা অনেক সকালে ঘুম থেকে উঠি। অনেক সময় ক্যাজুয়ালি থাকি। এটা নিয়ে উনি যা বলেন, তাতে আপসেট হয়ে যাই। অনুশীলনে তখন আর মন বসাতে পারি না। এমনকি গেম চলাকালেও আমাদের সঙ্গে এটা হয়েছে।’

এদিকে বাফুফের সাধারণ সম্পাদক ইমরান হোসেন তুষার মেয়েদের জানিয়েছেন, তাদের কথামতো ট্রেনিংয়ে অংশ না নিলে তাদের ক্যাম্প থেকে বের করে দেওয়া হবে, পৌঁছে দেওয়া হবে যার যার বাড়িতে! তবে মেয়েরা বাফুফে সভাপতির সঙ্গে কথা বলার আগে ক্যাম্প ছাড়তে নারাজ। ব্যক্তিগত সফরে লন্ডনে থাকা তাবিথের ওপর এখন নির্ভর করছে এই মেয়েদের ভবিষ্যৎ।