মুখোমুখি অবস্থানে ট্রাম্প-জেলেনস্কি

রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইউক্রেন সবচেয়ে বেশি সহায়তা পেয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে। দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসন শুরু থেকেই ইউক্রেনকে সামরিক ও অর্থ সহায়তা দিয়ে এসেছে। তবে সবশেষ নির্বাচনে রিপাবলিকান নেতা ডোনাল্ড ট্রাম্পের জয় ইউক্রেনের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে এসেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তার দল রিপাবলিকান পার্টির অনেক সদস্য ইউক্রেনকে সহায়তা দেওয়ার বিপক্ষে ছিলেন। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের শুরু থেকে এ পর্যন্ত কিয়েভকে সামরিক ও অন্যান্য খাতে সহায়তা বাবদ যে অর্থ দিয়েছে ওয়াশিংটন তা প্রকাশ করেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। এই তথ্য প্রকাশের পর ট্রাম্পের বিরুদ্ধে মিথ্যাচারের অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, ইউক্রেনকে সহায়তা বাবদ ২০ হাজার ডলার দেওয়া হয়েছে বলে যে অভিযোগ ট্রাম্প করেছেন, তা সঠিক নয়। গতকাল সোমবার এক প্রতিবেদনে এ খবর জানিয়েছে রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত সম্প্রচারমাধ্যম আরটি।

গত মাসে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘আমরা এ পর্যন্ত ইউক্রেনকে ২০ হাজার কোটি ডলারেরও বেশি পরিমাণ অর্থ সহায়তা প্রদান করেছি। এমনকি ইউরোপীয় ইউনিয়নও এই পরিমাণ অর্থ দেয়নি। মানে, আমি বলতে চাইছি যে আমরা আসলে কী? নির্বোধ? ট্রাম্পের এই মন্তব্যের পর সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে একটি সাক্ষাৎকার দিয়েছেন জেলেনস্কি।’

সেখানে ট্রাম্পের এই মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি বলেন, ‘ট্রাম্পের দেওয়া এই তথ্য সঠিক তথ্য নয়। আর যদি তেমনটা হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তার এই বিপুল অর্থ কোথায় গিয়েছে, আমি জানি না। এমন হতে পারে যে, মার্কিন প্রশাসনের কাগজপত্রে এ সংখ্যা লিখিত আছে।’

এ সময় তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে প্রায় ৭ হাজার ৬০০ কোটি ডলার সহায়তা পাওয়ার কথা বলেছেন জেলেনস্কি। তিনি বলেন, ‘আমরা ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে তর্ক করতে চাই না এবং ওয়াশিংটন আমাদের জন্য এ পর্যন্ত যা যা করেছে, সেজন্য আমরা যুক্তরাষ্ট্র ও সেখানকার জনগণের প্রতি আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ। কিন্তু সত্য হলো, প্রাপ্ত সহায়তার মধ্যে ৭ হাজার কোটিরও বেশি ডলার সমমূল্যের অস্ত্র ও গোলাবারুদ দেওয়া হয়েছে। এই সহায়তার মধ্যে নগদ অর্থের পরিমাণ ছিল খুবই কম।’ তবে সাক্ষাৎকারে ইউক্রেনে যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক মানবিক সহায়তাবিষয়ক প্রকল্প চালু থাকতে পারে বলেও উল্লেখ করেছেন তিনি। তবে ট্রাম্পের ২০ হাজার কোটি ডলার সহায়তার প্রদানের মন্তব্যে বিস্ময় প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘আমি সত্যিই জানি না যে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ কোথায় গেল!’

তবে রাশিয়ার নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর ঘনিষ্ঠ সূত্র থেকে জানা গেছে, দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম তেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান লুকওয়েলের একটি শোধনাগারের কাছে একাধিক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। এ ছাড়া আস্ত্রাখান গ্যাস প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্রেও আঘাত হানা হয়েছে বলে জানিয়েছে ইউক্রেনের জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা কাউন্সিলের অধীনে থাকা সেন্টার ফর কাউন্টারিং ডিজইনফরমেশনের প্রধান লেফটেন্যান্ট আন্দ্রেই কোভালেঙ্কো। তবে এ হামলায় কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।

বরাবরই ইউক্রেন যুদ্ধের বিপরীতে অবস্থান ট্রাম্পের। নির্বাচনী প্রচারকালে ক্ষমতায় ফিরলে যুদ্ধ বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তিনি। এমনকি বাইডেনের জায়গায় তিনি ক্ষমতায় থাকলে এই যুদ্ধ শুরুই হতো না বলেও মন্তব্য করেছেন ট্রাম্প। সেই সঙ্গে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে ইতিহাসের সেরা বিক্রয়কর্মী হিসেবে আখ্যা দিয়ে উপহাসও করেছেন ট্রাম্প।

ক্রিমিয়া উপদ্বীপকে রুশ ভূখণ্ড হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান না করা এবং যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ন্যাটোর সদস্যপদের জন্য তদবিরের জেরে কয়েক বছর টানাপড়েনের পর গত ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনে সামরিক অভিযান শুরু করে রুশ বাহিনী, যা এখনো চলছে। প্রেসিডেন্ট পুতিন নিজে এই অভিযানের নির্দেশ দিয়েছিলেন। এ অভিযানে গত প্রায় তিন বছরে উভয় পক্ষের হাজার হাজার সামরিক-বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছে।

এদিকে, রাশিয়ার দক্ষিণাঞ্চলের জ্বালানি স্থাপনা লক্ষ্য করে ডজনখানেক ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইউক্রেন। গতকাল চালানো হামলায় রাশিয়ার একটি প্রধান তেল শোধনাগার ও গ্যাস প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্রে আগুন ধরে যায়। এ ছাড়া ভোলগা থেকে ককেশাস পর্বতমালা পর্যন্ত ফ্লাইট চলাচল ব্যাহত হয় বলে জানিয়েছেন রাশিয়া ও ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা। রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, তাদের বিমান প্রতিরক্ষা ইউনিট রুশ ভূখণ্ডে ৭০টি ইউক্রেনীয় ড্রোন ভূপাতিত করেছে। এর মধ্যে ২৫টি ভোলগোগ্রাদ, ২৭টি রোস্তভ ও সাতটি আস্ত্রাখান অঞ্চলে ধ্বংস করা হয়েছে।