চার দশক পেরিয়ে এসেও সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুটছেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। মাঠে যেমন গোলের পর গোল করে প্রতিপক্ষকে ভড়কে দিচ্ছেন, তেমনি মাঠের বাইরেও দাপুটে ব্যবসায়ী হিসেবে নিজের সাম্রাজ্য বিস্তৃত করে চলেছেন। ফুটবল ইতিহাসের সর্বোচ্চ আয় করা ক্রীড়াবিদ, সোশ্যাল মিডিয়া আইকন, বিলাসবহুল জীবনযাত্রার প্রতীক—রোনালদো যেন এক পরিপূর্ণ ব্র্যান্ড!
আজ ৫ ফেব্রুয়ারি ৪০ বছরে পা দিলেন এই পর্তুগিজ তারকা। বয়স তার জন্য কেবলই সংখ্যা, কারণ প্রতিদিন নিজেকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়াই তার লক্ষ্য। পেশাদার ফুটবলে ২০ বছরেরও বেশি সময় পার করেও তিনি এখনো বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ আক্রমণভাগের খেলোয়াড়। আর্থিক দিক থেকেও তিনি অপ্রতিরোধ্য, তার সম্পদের পরিমাণ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে অনেক আগেই।
সৌদি আরবের ফুটবল ‘রাজা’ রোনালদো
ফুটবল দুনিয়ায় সবচেয়ে বেশি আয় করা খেলোয়াড় এখন রোনালদো। ২০২৩ সালে সৌদি ক্লাব আল নাসর-এ যোগ দেওয়ার পর তার আয় আকাশ ছুঁয়েছে। বর্তমান চুক্তি অনুযায়ী, এই ক্লাব থেকে বছরে ২০০ মিলিয়ন ইউরো (প্রায় ২৪০০ কোটি টাকা) বেতন পাচ্ছেন তিনি। শুধু তাই নয়, গুঞ্জন রয়েছে যে, ক্লাবের শেয়ারও পেতে পারেন তিনি।
রোনালদোর আয় এতটাই বিশাল যে, প্রতিদিন তিনি প্রায় ৫.৫ লাখ ইউরো (প্রায় ৬.৬ কোটি টাকা) পান! এমন আয়ের কারণে তিনি সহজেই বিশ্বের শীর্ষ আয় করা ক্রীড়াবিদদের তালিকায় নিজের জায়গা পাকা করেছেন।
মাঠে রেকর্ড, লক্ষ্য ১০০০ গোল
গোল যেন তার দ্বিতীয় নাম। ক্যারিয়ারের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত গোলবন্যা বইয়ে চলেছেন সিআর৭। বর্তমানে তার ৯২৩ গোল, আর লক্ষ্য ১০০০ গোলের মাইলফলক স্পর্শ করা। এ নিয়ে রোনালদো নিজেও বলেছেন, ‘আমি জানি না কতদিন খেলব, তবে ১০০০ গোলের স্বপ্ন সত্যি করার জন্য লড়াই করব।’
ফুটবল মাঠে বয়স বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে না তার জন্য। এখনো সৌদি লিগের সবচেয়ে ভয়ংকর ফরোয়ার্ডদের একজন তিনি। তার ফিটনেস লেভেল ২৫ বছর বয়সী অনেক ফুটবলারের চেয়েও ভালো। এটাই তাকে অনন্য করে তুলেছে।
ফুটবলের বাইরেও ‘বিজনেস ম্যাগনেট’
ফুটবলের পাশাপাশি রোনালদো এখন পুরোদস্তুর এক ব্যবসায়ী। তার মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর সংখ্যা ২১। তার ভাই হুগো অ্যাভেইরো এবং বন্ধু মিগুয়েল পাইসাও তাকে ব্যবসা সামলাতে সাহায্য করেন।
রোনালদো শুধুমাত্র ফুটবলের মঞ্চেই নয়, ব্যবসার জগতেও দাপুটে এক নাম। মাঠে অবিশ্বাস্য দক্ষতা দেখিয়ে যেমন প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলেন, তেমনি কৌশলী বিনিয়োগের মাধ্যমে নিজের ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন। ফুটবল ইতিহাসের প্রথম বিলিয়ন ডলার আয় করা ক্রীড়াবিদদের একজন তিনি। বর্তমানে তার ব্যক্তিগত সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ইউরো, আর তার বিনিয়োগ ও ব্র্যান্ডগুলো তাকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
ব্যবসা ও বিলাসিতায় রোনালদোর এক বিশাল সাম্রাজ্য
ফুটবলের পাশাপাশি বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ করে রোনালদো নিজের আয়ের উৎস বহুগুণ বাড়িয়ে নিয়েছেন। বর্তমানে তার ২১টি কোম্পানি রয়েছে, যার মাধ্যমে তিনি বিপুল অঙ্কের আয় করছেন। এসব কোম্পানির দায়িত্ব তার বড় ভাই হুগো অ্যাভেইরো ও তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও সাবেক সতীর্থ মিগুয়েল পাইসাও দেখাশোনা করেন।
সিআর৭ ফ্যাশন ব্র্যান্ড: স্টাইল ও বিলাসিতার প্রতীক। রোনালদো তার ব্যক্তিগত ফ্যাশন ব্র্যান্ড সিআরসেভেন ফ্যাশন-এর মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় হয়েছেন। এই ব্র্যান্ডের অধীনে রয়েছে—
সিআর৭ আন্ডারওয়্যার – ২০১৩ সালে চালু করা এই ব্র্যান্ড এখন ৪০টিরও বেশি দেশে বিক্রি হয়। সিআর৭ ফুটওয়্যার – ইতালিয়ান লেদার দিয়ে তৈরি প্রিমিয়াম জুতা ও স্নিকার্সের সংগ্রহ। সিআর৭ পারফিউম – ‘CR7 Play It Cool’ ও ‘CR7 Game On’ নামে জনপ্রিয় সুগন্ধির লাইন রয়েছে।
সিআরসেভেন ফিটনেস অ্যান্ড জিম: ফিটনেস নিয়ে বরাবরই সিরিয়াস রোনালদো সিআরসেভেন ফিটনেস অ্যান্ড জিম নামে একটি আন্তর্জাতিক জিম চেইন চালু করেছেন। পর্তুগাল, স্পেন, ব্রাজিলসহ কয়েকটি দেশে তার জিম রয়েছে, যেখানে আধুনিক ট্রেনিং সুবিধা রয়েছে।
হোটেল ব্যবসা: সিআরসেভেন প্যাসতানা হোটেল। বিশ্বের নামীদামী শহরগুলোতে হোটেল ব্যবসায়ও পা রেখেছেন রোনালদো। পর্তুগালের হোটেল ব্র্যান্ড পেসতানা গ্রুপ-এর সঙ্গে মিলে তিনি সিআরসেভেন প্যাসতানা হোটেলস চালু করেছেন। তার হোটেল রয়েছে—লিসবন, মাদেইরা (পর্তুগাল), মাদ্রিদ (স্পেন), নিউ ইয়র্ক (যুক্তরাষ্ট্র), মারাকাশ (মরক্কো)।
ট্রান্সপ্লান্ট ক্লিনিক ও বিউটি ইন্ডাস্ট্রি
রোনালদো ইন্সপিরা মেডিকা নামে একটি হেয়ার ট্রান্সপ্লান্ট ক্লিনিক চালু করেছেন, যেখানে চুল পড়া সমস্যার স্থায়ী সমাধান দেওয়া হয়।
ঘড়ির ব্যবসা: সিআরসেভেন টাইমপিসেস। সম্প্রতি তিনি নিজের ঘড়ির ব্র্যান্ড সিআরসেভেন টাইমপিসেস চালু করেছেন, যা তার খেলোয়াড়ি জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোর অনুপ্রেরণায় ডিজাইন করা হয়েছে।
রোনালদোর গ্যারেজ: স্বপ্নের সুপারকার সংগ্রহ
রোনালদো শুধু বিলাসবহুল জীবনযাপনই করেন না, গাড়ির প্রতিও তার বিশেষ আগ্রহ রয়েছে। তার গ্যারেজে রয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে দামি সুপারকারগুলোর সংগ্রহ, যার মূল্য প্রায় ৩০ মিলিয়ন ইউরো!
রোনালদোর কিছু আইকনিক সুপারকার:
বুগাত্তি চিরন (২.৬ মিলিয়ন ইউরো) – ২৬১ মাইল প্রতি ঘণ্টা গতির এই গাড়ি বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুতগতির গাড়িগুলোর একটি।
বুগাত্তি লা ভয়েচার নোয়ার (১১ মিলিয়ন ইউরো) – বিশ্বের সবচেয়ে দামী গাড়িগুলোর একটি, যা মাত্র ১টি ইউনিট তৈরি করা হয়েছে।
ফেরারি ডেটোনা এসপি৩ (২ মিলিয়ন ইউরো) – লাল রঙের এই গাড়িতে ৮৪০ হর্সপাওয়ারের ভি১২ ইঞ্জিন রয়েছে।
রোলস-রয়েস কালিনান (৩৫০,০০০ ইউরো) – বিলাসবহুল এসইউভি, যা রোনালদোর ব্যক্তিগত পছন্দের গাড়িগুলোর মধ্যে একটি।
ল্যাম্বরগিনি অ্যাভেন্তাডর (৪০০,০০০ ইউরো) – ৭০০ হর্সপাওয়ারের এই স্পোর্টস কারটি তিনি প্রায়ই চালাতে দেখা যায়।
মার্সিডিজ-বেঞ্জ জি-ওয়াগন ব্রাবাস (৬০০,০০০ ইউরো) – এটি তার স্ত্রী জর্জিনা রদ্রিগেজ উপহার দিয়েছিলেন।
অডি আরএস৭, ম্যাকলারেন সেনা, অ্যাস্টন মার্টিন ডিবিএস সুপারলেগেরা, ও মাসেরাতি গ্রানক্যাব্রিও – তার সংগ্রহে আরও অনেক সুপারকার রয়েছে।
শুধু গাড়ি নয়, সম্প্রতি নিজস্ব ঘড়ির ব্র্যান্ড চালু করেছেন রোনালদো। এই ঘড়িগুলোর ডিজাইন তার ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের ওপর ভিত্তি করে করা হয়েছে, আর এটি তার জর্জিনা রদ্রিগেজের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগ।
সোশ্যাল মিডিয়ার ‘রাজা’
রোনালদো শুধু মাঠ ও ব্যবসায় নয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্যক্তি। ইনস্টাগ্রামে তার অনুসারীর সংখ্যা ৬৪৮ মিলিয়ন, যা তাকে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ফলোয়ার থাকা ব্যক্তি বানিয়েছে।
এখান থেকেই বিপুল আয় করেন তিনি। স্পন্সর পোস্ট থেকে বছরে ১০০ মিলিয়ন ইউরোর বেশি আয় করেন রোনালদো, যা অনেক খেলোয়াড়ের বেতনের চেয়েও বেশি!
সম্প্রতি তিনি ইউটিউবে চ্যানেল খুলেছেন, যা মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে ৭৩ মিলিয়ন সাবস্ক্রাইবার পেয়ে গেছে। সেখানে নিজের অনুশীলন, ব্যক্তিগত জীবন ও বিলাসবহুল জীবনের ভিডিও শেয়ার করেন তিনি।
৪০ বছর বয়সেও অনবদ্য রোনালদো
ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো শুধুমাত্র একজন ফুটবলার নন, তিনি এক বিশাল ব্র্যান্ড। মাঠের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি ব্যবসার জগতেও তার ব্যাপক বিস্তার। ফুটবলে ৯২৩ গোলের মালিক এই পর্তুগিজ তারকার লক্ষ্য ১,০০০ গোলের মাইলফলক স্পর্শ করা।
তিনি ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে ধনী ও সফল ক্রীড়াবিদদের একজন। তার নামে স্টেডিয়াম, হোটেল, ফ্যাশন ব্র্যান্ড, সুপারকার কালেকশন—সব মিলিয়ে তিনি সত্যিকারের এক আইকন। ৪০ বছর বয়সেও তিনি যে উদ্যমী, তাতে তার সাম্রাজ্য আরও বড় হবে, এটাই অনুমেয়।
বিশ্বের সবচেয়ে পরিশ্রমী ক্রীড়াবিদদের একজন হিসেবে পরিচিত এই কিংবদন্তির গল্প এখানেই শেষ নয়। ১০০০ গোলের লক্ষ্য, নতুন ব্যবসায়িক উদ্যোগ ও আরও অনেক কিছু অপেক্ষা করছে তার সামনে।বয়স শুধু সংখ্যা—এ কথার সেরা উদাহরণ হতে পারেন কেবল একজনই। আর তিনি ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো!