ঘটনার তদন্ত হয়, রিপোর্ট থাকে হিমঘরে

সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার-মেহেরুন রুনি হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে লুকোচুরি চলছেই। পুলিশের তিনটি ইউনিট এ মামলার তদন্ত করেছে। সর্বশেষ তদন্ত করছে পিবিআই। মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার তারিখ ১১৫ বার পেছানো হয়েছে। 

প্রাথমিক তদন্তে কী উদঘাটন করা হয়েছে, তা আজও জানতে পারেননি মামলার বাদী ও দেশবাসী। আগামী ২ মার্চ প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নতুন তারিখ ঠিক করা হয়েছে। এটির মতোই বিভিন্ন সময়ে সংঘটিত চাঞ্চল্যকর মামলার তদন্ত প্রকাশিত হচ্ছে না। এসব মামলার শুধু তদন্তই করে যাচ্ছেন তদন্তকারী কর্মকর্তারা। 

অভিযোগ রয়েছে, তদন্তকারীরা প্রতিবেদনগুলো লুকিয়ে রাখেন। ঘটনাবলির সঙ্গে কারা যুক্ত বা যুক্ত নয়, তাও জানা সম্ভব হচ্ছে না। এ নিয়ে ভুক্তভোগীরা ত্যক্ত-বিরক্ত।

সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছে, দেশে ফৌজদারি মামলার তদন্তে ঘাটতির কারণে অভিযুক্তদের দোষ প্রমাণের হার কমবেশি ২০ শতাংশ। ৮০ শতাংশ আসামিই খালাস পেয়ে যায়। থানা-পুলিশের একেকজন তদন্ত কর্মকর্তার কাছে অনেক মামলা থাকে। তাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার নানা কাজেও সক্রিয় থাকতে হয়। তদন্তে প্রয়োজনীয় সময় দিতে পারেন না তারা। অনেকের বিরুদ্ধে প্রভাবশালীর চাপে তদন্ত ভিন্ন খাতে অথবা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ আছে। তদন্তে বড় ধরনের দুর্বলতা থাকলে তা রায়ের আগেই নজরে আনা সম্ভব। সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) অসম্পূর্ণ প্রতিবেদনের বিষয়ে অভিমত দিয়ে আবার তদন্তের কথা বলতে পারেন। আবার চার্জ গঠনের সময় বা বিচার চলাকালে পুলিশ প্রতিবেদনে দুর্বলতা ধরা পড়লে স্বপ্রণোদিত হয়ে পুনরায় তদন্তের আদেশ দেওয়ার এখতিয়ার আদালতের রয়েছে। কারণ অসম্পূর্ণ প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বিচার হলে আসামিপক্ষ রেহাইয়ের সুযোগ পায়। তবে আগেভাগে তদন্তের ত্রুটি সামনে আসার নজির কম। 

২০১৫ সালের ২৩ অক্টোবর গভীর রাতে পবিত্র আশুরা উপলক্ষে তাজিয়া মিছিলের প্রস্তুতির সময় পুরান ঢাকার হোসেনী দালানে বোমা হামলার ঘটনা ঘটে। তাতে দুজন নিহত ও শতাধিক ব্যক্তি আহত হন। ছয় বছর পর এ মামলার রায় হয়। বিচারক তার পর্যবেক্ষণে বলেছেন, তদন্ত কর্মকর্তার অবহেলায় মূল পরিকল্পনাকারীরা আইনের আওতার বাইরে রয়ে গেছে। 

এর আগেও বিভিন্ন চাঞ্চল্যকর মামলার তদন্তের দুর্বলতার বিষয়টি রায়ের সময় উঠেছিল। তদন্তকারী কর্মকর্তা তদন্তে কী পেয়েছিলেন মামলার বাদী তা জানতেই পারেননি। ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে আলোচিত বিশ্বজিৎ হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করা হয়। 

রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলে, ‘ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় অস্বচ্ছ তদন্তকাজ প্রতিরোধ করা খুব গুরুত্বপূর্ণ। আমরা যে সমাজে বাস করি, সেখানে বিত্তশালী ও ক্ষমতাধররা প্রায়ই দায়মুক্তি পেয়ে যায়। অপরাধ করেও প্রভাব খাটিয়ে তারা সহজেই তদন্ত প্রক্রিয়া থেকে বেরিয়ে যায়। অনেক মামলা আছে, যেখানে পুলিশ, অপরাপর তদন্ত সংস্থা, চিকিৎসক, বিশেষজ্ঞ ব্যক্তি মিথ্যা ও উদ্দেশ্যমূলক প্রতিবেদন দিয়ে অপরাধীকে সাহায্য করেছে। আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার জন্যই তারা এমন বেআইনি কাজ করে থাকে। এরকম অসৎ ও উদ্দেশ্যমূলক তদন্ত চলতে পারে না। প্রজাতন্ত্রের একজন কর্মচারীকে অবশ্যই দায়িত্বশীল হতে হবে এবং তার জবাবদিহি থাকতে হবে। এ মামলার বাদী তদন্ত প্রতিবেদনের বিষয়ে কিছুই জানতে পারেননি।’
 
পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ফৌজদারি অপরাধের তদন্ত করছে পুলিশ। পাশাপাশি অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ও পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই), র‌্যাব, ডিবিসহ বেশ কয়েকটি ইউনিট মামলার তদন্ত করছে। বিশেষ করে চাঞ্চল্যকর মামলাগুলো বিশেষায়িত ইউনিট দিয়ে তদন্ত করা হয়। নানা কারণে তদন্তকারী কর্মকর্তা দীর্ঘ সময় ধরে তদন্ত করেন। আবার কোনো কোনো কর্মকর্তা দ্রুত তদন্ত প্রতিবেদন দিয়ে দেন। প্রতিবেদন মামলার বাদীদের জানার অধিকার আছে। কিন্তু তারা জানতে পারেন না। ওই কর্মকর্তা বলেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও আগের ধারাতেই আছে পুলিশ। প্রায়ই দেখা যায় তদন্তে দুর্বলতার কারণে মামলা নষ্ট হয়ে যায়। প্রতিবেদন যদি বাদীরা আগে দেখতে পান তাহলে ভুুক্তভোগীদের উপকারই হতো। আমরা চেষ্টা করছি তদন্ত প্রতিবেদন হিমঘরে আর না রাখতে।’

কয়েকটি মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তারা দেশ রূপান্তরকে জানান, তদন্তের দুর্বলতা ছাড়াও বিচারের দীর্ঘসূত্রতা, সাক্ষীর গরহাজিরা, সাক্ষ্যগ্রহণের সময় ভিকটিমকে হয়রানি, আলামত নষ্ট হওয়া, সঠিকভাবে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি গ্রহণ না করা, ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪২ ধারায় সব অভিযোগের বিষয়ে আসামিকে যথাযথভাবে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দেওয়া, বিচার চলাকালে সাক্ষীর হঠাৎ প্রসিকিউশনের বিপক্ষে কথা বলা, বাদী-বিবাদী পক্ষের গোপন সমঝোতা বিচার প্রক্রিয়া ও রায়কে প্রভাবিত করে। বছর চারেক আগে মামলার সাজার অনুপাত নিয়ে একটি বিশ্লেষণ করেছিল পুলিশ সদর দপ্তর। তাতে দেখা যায়, নারী নির্যাতন মামলার ৯৫ শতাংশ আসামিই খালাস পাচ্ছে। ধর্ষণ মামলার ৮৮ শতাংশ, দ্রুত বিচার আইনের মামলার ৮৭ ও হত্যা মামলার ৭৬ শতাংশ আসামি খালাস পেয়ে যাচ্ছে। তারা অনেকটা চাপে পড়ে তদন্ত প্রতিবেদনের বিষয়ে বাদীদের জানান না। ইউনিট চিফদের কাছে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হলেও তা চাপা পড়ে যায়।

পুলিশ সূত্র জানায়, ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের ভাড়া বাসায় সাংবাদিক দম্পতি সাগর ও রুনি নৃশংসভাবে খুন হন। সাগর মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক ছিলেন। রুনি ছিলেন এটিএন বাংলার সিনিয়র প্রতিবেদক। সাগর-রুনি হত্যার ঘটনায় রুনির ভাই নওশের আলম বাদী হয়ে শেরেবাংলা নগর থানায় মামলা করেন। প্রথমে এ মামলা তদন্ত করেছিল শেরেবাংলা নগর থানার পুলিশ। চার দিন পর মামলার তদন্তভার ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) কাছে হস্তান্তর করা হয়। ৬২ দিনের মাথায় ২০১২ সালের ১৮ এপ্রিল হাইকোর্টে ব্যর্থতা স্বীকার করে ডিবি। এরপর আদালত র‍্যাবকে মামলাটি তদন্তের নির্দেশ দেয়। দীর্ঘ সময় পার হলেও সংস্থাটি তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে পারেনি। এখন পিবিআই এটির তদন্ত করছে। তদন্ত প্রতিবেদনের জন্য সংস্থাগুলো সময় নিয়ে থাকে। কিন্তু বাদী সাধারণত জানতে পারেন না প্রাথমিক তদন্তে কী আসছে।

পুলিশ সূত্র জানায়, ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের ভাড়া বাসায় সাংবাদিক দম্পতি সাগর ও রুনি নৃশংসভাবে খুন হন। সাগর মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক ছিলেন। রুনি ছিলেন এটিএন বাংলার সিনিয়র প্রতিবেদক। সাগর-রুনি হত্যার ঘটনায় রুনির ভাই নওশের আলম বাদী হয়ে শেরেবাংলা নগর থানায় মামলা করেন। প্রথমে এ মামলা তদন্ত করেছিল শেরেবাংলা নগর থানার পুলিশ। চার দিন পর মামলার তদন্তভার ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) কাছে হস্তান্তর করা হয়। ৬২ দিনের মাথায় ২০১২ সালের ১৮ এপ্রিল হাইকোর্টে ব্যর্থতা স্বীকার করে ডিবি। এরপর আদালত র‍্যাবকে মামলাটি তদন্তের নির্দেশ দেয়। দীর্ঘ সময় পার হলেও সংস্থাটি তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে পারেনি। এখন পিবিআই এটির তদন্ত করছে। তদন্ত প্রতিবেদনের জন্য সংস্থাগুলো সময় নিয়ে থাকে। কিন্তু বাদী সাধারণত জানতে পারেন না প্রাথমিক তদন্তে কী আসছে।

ফায়ার সার্ভিস সূত্র জানায়, একের পর এক ঘটছে বড় ধরনের বিস্ফোরণ ও আগুনের ঘটনা। এসব ঘটনায় তাৎক্ষণিক তদন্ত কমিটি গঠন হলেও কিছুদিন পরই থমকে যায় তদন্ত। আড়ালেই থেকে যায় প্রকৃত ঘটনা। কারণও অজানা থেকে যায়। দুর্ঘটনা বা নাশকতারোধে তৎপর নয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। ঘটনার পর প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্টরা নড়েচড়ে বসলেও আদতে এসব লোকদেখানো তৎপরতা বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। 

তারা বলছেন, রয়ে যায় ত্রুটিপূর্ণ ও অনুমোদনহীনভাবে নির্মাণ করা ভবন; ত্রুটিপূর্ণ বৈদ্যুতিক সংযোগসহ সব অনিয়ম। অথচ ঝরে যায় বেশ কিছু প্রাণ। ২০১০ সালের ৩ জুন রাজধানীর পুরান ঢাকার নিমতলীতে রাসায়নিকের গুদামে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১২৪ জনের মৃত্যু হয়। ২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি চকবাজারের চুড়িহাট্টায় ওয়াহেদ ম্যানশনের আগুনে মারা যান ৭১ জন। কিন্তু আবাসিক এলাকা থেকে রাসায়নিকের গুদাম সরানোর কোনো সফল উদ্যোগ নেই। কখনো প্রতিবেদনে তদন্তের ফল সামনে এলেও দুর্ঘটনার সব দায় শেষ পর্যন্ত কোনো ব্যক্তি, ভবন মালিক, কারাখানা মালিক বা কর্তৃপক্ষের ওপরই চাপানো হয়। ফলে প্রকৃত কারণ উদঘাটিত হয় না। ২০২২ সালের ৪ জুন সীতাকুণ্ডের বিএম কনটেইনার ডিপোতে বিস্ফোরণে ৪৪ জন মারা যান। পুলিশের তদন্তে কী এসেছে, তা আজও জানা যায়নি। ২০২১ সালের ২৭ জুন মগবাজারের একটি তিনতলা বাড়িতে বিস্ফোরণ ঘটে। এতে ১২ জন মারা যান। আহত হন দুই শতাধিক। এ ঘটনারও তদন্ত প্রতিবেদন আলোর মুখ দেখেনি।