বাংলাদেশ ব্যাংকের চলতি ও আর্থিক হিসাব টানা কয়েক মাস ধরে নেতিবাচক থাকার পর অবশেষে আবারও ইতিবাচক ধারায় ফিরছে। একই সঙ্গে কমেছে বাণিজ্য ঘাটতিও। হাসিনা সরকার পতনের পর ব্যাপক হারে রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন প্রবাসীরা। পাশাপাশি রপ্তানি আয়ও বাড়ছে। বিপরীতে আগের মতো আমদানি হচ্ছে না শিল্পের কাঁচামাল ও মূলধনী যন্ত্রপাতি। এ কারণে চলতি হিসাবে উদ্বৃত্ত দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি খরচ কম হওয়ায় কমে এসেছে বাণিজ্য ঘাটতি। তথ্যমতে, জুলই-ডিসেম্বরে বাণিজ্য ঘাটতি ৭৯৩ কোটি এবং চলতি হিসাবে উদ্বৃত্ত ছিল ৩ কোটি ৩০ লাখ ডলার। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এসব তথ্য।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডলার সংকট ও বাংলাদেশ ব্যাংকের কড়াকড়ির কারণে দেশে মূলধনী যন্ত্রপাতিসহ সার্বিকভাবে আমদানি কমে গেছে। ব্যবসায়ীরা নতুন করে বিনিয়োগে যাচ্ছেন না। ব্যাংকগুলো এখন আমদানি ঋণপত্র খোলার বিষয়ে বেশ সাবধানি। এতে সার্বিকভাবে বাণিজ্য ঘাটতি কমে গেছে। এটা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি ইতিবাচক দিক। কারণ ঘাটতি কমাতে পারলে ধীরে ধীরে মূল্যস্ফীতিও কমে আসবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন বলছে, বৈদেশিক লেনদেনের চলতি হিসাবের ভারসাম্যে ৬ দশমিক ৫১ বিলিয়ন ডলারের বড় ঘাটতি নিয়ে শেষ হয়েছিল ২০২৩-২৪ অর্থবছর। সুখবর হচ্ছে, ব্যালান্স অব পেমেন্টে উদ্বৃত্ত নিয়ে শুরু হয়েছে ২০২৪-২৫ অর্থবছর। চলতি অর্থবছরের (২০২৪-২৫) প্রথম ছয় মাস অর্থাৎ ডিসেম্বর শেষে চলতি হিসাবে উদ্বৃত্ত দাঁড়িয়েছে ৩ কোটি ৩০ লাখ ডলার। কিন্তু এক মাস আগেও চলতি হিসাবে ঘাটতি ছিল। আর এর পরিমাণ ছিল ১৯ কোটি ১০ লাখ ডলার। আগের অর্থবছরে (২০২৩-২৪) চলতি হিসাবে ঘাটতি ছিল ৩৪৬ কোটি ৫০ লাখ ডলার। হিসাব অনুযায়ী নভেম্বরের চেয়ে চলতি হিসাবে ঘাটতি ১১৭.২৭ শতাংশ কমেছে ডিসেম্বরে।
তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) ২ হাজার ২৩২ কোটি ৪ লাখ ডলারের পণ্য ও সেবা রপ্তানি হয়েছে। অন্যদিকে আমদানি হয়েছে ৩ হাজার ২০৮ কোটি ৮ লাখ ডলার। ফলে ৯৭৬ কোটি ডলারের বাণিজ্য ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এক মাস আগে এই ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৭৯৩ কোটি ডলার। অর্থাৎ এক মাসে ১৮২ কোটি ডলারের বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে। তবে আগের অর্থবছরের একই সময়ে বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ১ হাজার ৮৭ কোটি ডলার। সেই হিসাবে এক মাসের ব্যবধানে বাড়লেও গত বছরের একই সময়ের তুলনায় বাণিজ্য ঘাটতি ১০ দশমিক ২২ শতাংশ কমেছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী মুখপাত্র ও পরিচালক শাহরিয়ার সিদ্দিক বলেন, চলতি হিসাবে ঘাটতি কমা বা উদ্বৃত্ত হওয়া অর্থনীতির জন্য পজেটিভ। গত ছয় মাসে রেমিট্যান্স ২৭ দশমিক ৭ শতাংশ ও রপ্তানিতে ১১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হলেও আমদানি প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। অর্থাৎ বিদেশি মুদ্রা বাইরে যাওয়ার তুলনায় বাংলাদেশে প্রবেশের গতি বেশি ছিল। তাই চলতি হিসাবে উদ্বৃত্ত দেখা দিয়েছে। যদিও মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি কমেছে। কিন্তু এই রপ্তানি কমা কোনো সমস্যা না। নতুন বিনিযোগ থমকে আছে। সেজন্য মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি কমেছে। অন্যান্য ভোগ্যপণ্য ঠিক আছে। এই সূচক আমাদের অর্থনীতির জন্য ভালো সংবাদ। পাশাপাশি এটি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণেও সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।
তথ্যমতে, জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ছয় মাসে ১৩ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। যেটা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৭ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি। কারণ আগের বছরের একই সময়ে রেমিট্যান্সের পরিমাণ ছিল ১০ দশমিক ৮০ বিলিয়ন ডলার।
সামগ্রিক লেনদেন ভারসাম্যে (ওভারঅল ব্যালান্স) ঘাটতিও কিছুটা কমেছে। জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে এই সূচকে ঘাটতি ছিল ৩৮ কোটি ৪০ লাখ ডলার। কিন্তু গত মাসেও এই ঘাটতির পরিমাণ ছিল ২৪৭ কোটি ৩০ লাখ ডলার। আর গত বছর (২০২৩) ডিসেম্বর শেষে সামগ্রিক লেনদেন ভারসাম্যে (ওভারঅল ব্যালান্স) ঘাটতি ছিল ৩৪৫ কোটি ১০ লাখ ডলার।
২০২৩-২৪ অর্থবছর শেষে আর্থিক হিসাবে (ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্ট) উদ্বৃত্তের পরিমাণ ছিল ৪ দশমিক ৫৪ বিলিয়ন ডলার। ২০২৪-২৫ অর্থবছর ঘাটতি নিয়ে শুরু হলেও এখন আর্থিক হিসাব উদ্বৃত্ত। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) আর্থিক হিসাবে ১৩৭ কোটি ৯০ লাখ ডলার উদ্বৃত্ত। কিন্তু এক মাস আগেও অর্থাৎ নভেম্বর ৫৬ কোটি ডলার ঘাটতি ছিল।