মহান আল্লাহর নেয়ামতসমূহের মধ্যে খাদ্য অন্যতম। মানবদেহে শক্তি সঞ্চার, ক্ষয়পূরণ ও রোগপ্রতিরোধে খাদ্যের ভূমিকা অপরিসীম। এজন্য চাই পুষ্টিকর ও মানসম্মত খাদ্য। কিন্তু খাদ্যে ভেজাল দেওয়ার প্রবণতা আমাদের দেশে মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। আমাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সব খাদ্যেই ভেজাল মেশানো হয়। বাদ যায় না মৌসুমি ফল, শাকসবজি, মাছ-মাংসও। যার ফলে ভেজাল খাদ্য জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিষাক্ত খাবার গ্রহণের ফলে সাধারণ মানুষ বিভিন্ন জটিল ও মরণব্যাধি রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।
বিভিন্ন মৌসুমি ফল ও খাদ্যে কেমিক্যাল প্রয়োগ বর্তমানে চরম আকার ধারণ করেছে। এসব কেমিক্যাল মেশানোর ফলে পুষ্টি ও স্বাদ কোনোটাই পাওয়া যাচ্ছে না ঠিকমতো। অনেকে ভয়ে মৌসুমি ফল কিনতে সাহস পাচ্ছেন না। অথচ দৈহিক রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে মৌসুমি পুষ্টিকর ফল খাওয়া সবার জন্য অত্যন্ত জরুরি। প্রচলিত আইনে খাবারে ভেজাল মেশানো অপরাধ। সমাজবহির্ভূত, অনৈতিক ও অত্যন্ত গর্হিত এসব কাজ ইসলামে চরমভাবে নিন্দিত। কারণ এতে কয়েক ধরনের অপরাধ জড়িত। এক. এটি এক ধরনের ধোঁকাবাজি। দুই. এটি মূলত অবৈধ পন্থায় অপরের অর্থ গ্রহণ, যা আত্মসাতের শামিল। তিন. ভেজাল মিশ্রিত খাদ্য বিক্রয়ের সময় মিথ্যা কথা বলতে হয়। চার. মানুষকে কষ্ট দেওয়া হয় এবং শারীরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়।
ফুটপাত থেকে অভিজাত হোটেল রেস্তোরাঁ কোনোটাই ভেজালমুক্ত নয়। মহাখালী পাবলিক হেলথ ইনস্টিটিউটের খাদ্য পরীক্ষাগারের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৫৪ ভাগ খাদ্যপণ্য ভেজাল এবং তা দেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। যারা খাদ্যে ভেজাল দেয়, এমন ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘কেয়ামতের দিন ব্যবসায়ীরা মহা অপরাধী হিসেবে উত্থিত হবে। তবে যারা আল্লাহকে ভয় করবে, নেকভাবে সততা ও ন্যায়নিষ্ঠার সঙ্গে ব্যবসা করবে তারা ছাড়া।’ (তিরমিজি) খাদ্যে ভেজাল দেওয়া ক্রেতার সঙ্গে প্রতারণার শামিল। প্রতারণা করা ভয়ংকর অপরাধ। এ প্রসঙ্গে হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘একদিন হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বাজারে খাদ্যস্তূপের ভেতরে হাত প্রবেশ করে দেখলেন, ভেতরেরগুলো ভেজা। তিনি খাদ্য বিক্রেতার কাছে জানতে চাইলেন, এমনটা করা হলো কেন? বিক্রেতা বলল, বৃষ্টিতে ভিজে গেছে, হে আল্লাহর রাসুল! রাসুল (সা.) বললেন, তাহলে তুমি খাদ্যগুলো ওপরে রাখনি কেন, যাতে মানুষ দেখতে পেত? লোকটি চুপ করে রইল। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, যে ব্যক্তি প্রতারণা করে সে আমার উম্মত নয়।’ (সহিহ মুসলিম ১০২)
গত রবিবার জাতীয় নিরাপদ খাদ্য দিবস উপলক্ষে শাহবাগের সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের লেকচার হলে আয়োজিত সেমিনারে খাদ্য সচিব মাসুদুল হাসান বলেন, খাদ্য, স্বাস্থ্য ও সুস্থতাকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। এগুলো একে অপরের পরিপূরক। সুস্থ থাকতে হলে নিরাপদ খাদ্য গ্রহণ করতে হবে। কেননা বর্তমানে বিশ্বে ৭০০ বিলিয়ন লোকের খাদ্য কত নিরাপদ সেই প্রশ্ন জেগেছে। অনিরাপদ খাদ্য গ্রহণের কারণে দিনে ৫ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনোভাবে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে। সেমিনারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্য ও পুষ্টি বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. খালেদা ইসলাম বলেন, ব্যাকটেরিয়া, কেমিক্যাল, কাচের টুকরা ইত্যাদির কারণে খাদ্য অনিরাপদ হয়। তা ছাড়া পানিবাহিত ভাইরাস, বিষাক্ত পদার্থের কারণেও অনিরাপদ হয়। এ খাদ্যের কারণে প্রতি ১০ জনের মধ্যে একজন অসুস্থ হয়। অনিরাপদ খাদ্যগ্রহণের ফলে বিশে^ পাঁচ বছরের নিচে ৪ লাখ ২০ হাজার শিশুর মৃত্যু হয়। বাংলাদেশে বছরে ৩৫ হাজার মানুষ অনিরাপদ খাদ্যের কারণে মারা যায়। খাদ্য ও পুষ্টি ইনস্টিটিউটের তথ্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, খাবারে অনেক ভেজাল রয়েছে। ঘির মধ্যে ৬৬ দশমিক ৬৭, গুড়ে ৪৩ দশমিক ৭৫, মধুতে ৩৩ দশমিক ৩৩, মিষ্টিতে ২৮ দশমিক ৫৭, হলুদে ২৭ দশমিক ৯৩, ডাল ও ছোলায় ৫, চালে ৮ দশমিক ৩৩, মরিচে ১৪ দশমিক ৬৩, গুঁড়া দুধে ১৬ দশমিক ৬৭ এবং লবণে ১৭ দশমিক ৩৩ শতাংশ ভেজাল রয়েছে।
যারা খাদ্যে ভেজাল মেশায় তাদের ইবাদত কবুল হয় না। কারণ রুজি-রুটি হালাল হওয়া ইবাদত কবুলের পূর্বশর্ত। অথচ ভেজাল মেশানো লোকদের উপার্জিত অর্থ হারাম। হাদিসে বলা হয়েছে, হারাম খাদ্যের মাধ্যমে যে রক্ত-মাংস তৈরি হবে, ওই রক্ত-মাংসের শরীরের মাধ্যমে কৃত কোনো ইবাদত কবুল করা হবে না। যেসব ব্যবসায়ী খাদ্যে ভেজাল দেয়, ভেজাল মেশায়, ভেজালে সমর্থন দেয়, ভেজাল থেকে উপকৃত হয় তাদের সম্পর্কে রাসুল (সা.) কঠিন সতর্ক বার্তা দিয়েছেন। এ ছাড়া বাজার-ঘাটে প্রায়ই দেখা যায়, যারা খাদ্যে ভেজাল মেশায়, তারা অনেক সময় মিথ্যা কসম করে। পণ্য বিক্রি করতে শপথ করে বলে, ‘আল্লাহর কসম! এটি একদম খাঁটি’ ইত্যাদি। এভাবে মিথ্যা কসম করে পণ্য বিক্রয়কারী সম্পর্কে হাদিসে ভয়ংকর শাস্তির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সুতরাং মিথ্যা কসম থেকে বেঁচে থাকতে হবে।
বস্তুত খাদ্যে ভেজাল রোধে কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। ভ্রাম্যমাণ আদালতের ঘন ঘন অভিযান খাদ্যে ভেজাল অনেকাংশে কমিয়ে আনতে পারে। সেই সঙ্গে অসাধু ব্যবসায়ী ও অপরাধে সংশ্লিষ্টদের কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করা, মানুষকে ক্ষতি করে ব্যবসায়ীদের অধিক মুনাফা লাভের হীনমানসিকতা পরিত্যাগ করা, মানুষের মাঝে নৈতিকতাবোধ এবং পরকালীন জবাবদিহিতার বোধ জাগ্রত করা। কারণ সত্যিকারের কোনো মুমিন-মুসলমান খাদ্যে ভেজাল মেশাতে পারে না। অস্বাস্থ্যকর খাদ্য খাইয়ে মানুষকে অসুস্থ করতে পারে না। অন্যকে কষ্ট দিতে পারে না।
মানুষ মনে করে, শুধু নামাজ না পড়লে, রোজা না রাখলে, হজ না করলে বা জাকাত না দিলে জাহান্নামের শাস্তি ভোগ করতে হবে। অথচ ব্যবসায়ে প্রতারণা ও ঠকবাজি করলে পাপী হিসেবে সাব্যস্ত হতে হবে এবং জাহান্নামের আগুনে পুড়তে হবে, এই বোধটুকু দেশের ব্যবসায়ীদের কবে জাগ্রত হবে? বিষয়টি তাদের অনুধাবন করা জরুরি।
লেখক : শিক্ষক ও কলামিস্ট
atikr2047@gmail.com