উপযোগিতাহীন উন্নয়ন আত্মঘাতী ভেলকিবাজি

আজকাল অনেক ক্ষেত্রেই যেকোনো সংস্কার বা সেবা, নিয়োগ, পদোন্নতি, দাবি-দাওয়ার বহর তথা অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে  স্বেচ্ছাচারিতার পরিবেশ সৃজিত হচ্ছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।  অবস্থা এমন, অর্থ খরচ ব্যতীত বিনামূল্যে প্রাপ্য কোনো সাধারণ সেবা পর্যন্ত মিলছে না। উপরির বিনিময়ে যেকোনো ন্যায্য সেবাও যদি বিক্রি হয়, সম্পদ ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে আত্মসাৎ অপচয়, অপব্যয় পরিবেশ পরিস্থিতি সেক্ষেত্রে লাগামহীন হয়ে উঠতে পারে। স্থানীয় বা জাতীয় পর্যায়ে গণপ্রতিনিধিরা নির্বাচনের সময় ভোটারদের বলবেন তাদের ‘সমাজসেবার সুযোগ’ দিতে। কিন্তু সেখানে যদি দেখা যায় সমাজসেবার সুযোগ পাওয়ার জন্য ‘ভালো পরিমাণ অর্থ’  বিনিয়োগ করা হচ্ছে, তাহলে কথিত ‘সমাজসেবা’ তো বিনিয়োগ ব্যবসায় পরিণত হবে। কেননা, নির্বাচিত হয়ে কোনো পদে গেলে আলোচ্য ব্যক্তি নিজের বিনিয়োজিত অর্থটা আগে উঠিয়ে নিতে চাইবেন। সুতরাং নির্বাচন পদ্ধতিতে অর্থ ব্যয়ের মাধ্যমে সমাজসেবার সুযোগ কিনতে হলে বিনিয়োগের উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়ে অন্যদিকে চলে যেতে পারে। সেক্ষেত্রে জনস্বার্থ বিঘিœত হওয়ার সম্ভাবনা সুপ্রচুর। তহবিল তছরূপ, আত্মসাৎ, সম্পদ ও ক্ষমতার অপব্যবহার হলে স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতার যে লেশমাত্র থাকে না তা তো সবাই সাম্প্রতিককালে হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে।  

স্বচ্ছতা আনয়নে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বা সংস্থায় দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে অধিষ্ঠিত কর্তাব্যক্তিদের দায়িত্ব পালনে অর্পিত ক্ষমতা প্রয়োগে প্রতিশ্রুত (commitment) ও দৃঢ়চিত্ততা প্রয়োজন। নিজেদের অধিক্ষেত্রে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের পরিবর্তে আদিষ্ট হয়ে কিংবা অন্যায় কে প্রশ্রয় দিতে যদি তাদের কর্মধারা পরিচালিত হয় সেক্ষেত্রে কোনো প্রতিষ্ঠান কার্যকরভাবে জবাবদিহিমূলক ভূমিকা পালনে নিষ্ঠাবান হয়ে উঠতে পারবে না। এক্ষেত্রে পরিবেশ পরিস্থিতি স্বচ্ছতার অভাব ও স্বেচ্ছচারিতার অজুহাতে যৌক্তিকতা লাপাত্তা এমনকি স্বজনপ্রীতির পরিবেশ বা ক্ষেত্র তৈরি  হয়েই যেতে পারে। ন্যায়নীতি নির্ভর সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এটি হবে প্রধান প্রতিবন্ধকতা। পাবলিক সার্ভিসে রাষ্ট্রের হয়ে রাষ্ট্রের পক্ষে প্রতিটি কর্মকর্তার নিজ নিজ দায়িত্ব যথাযথ পরিপালনের মাধ্যমে একটা স্বচ্ছ ও আস্থার পরিবেশ সৃষ্টির সুযোগ থাকা দরকার। যারা নীতি প্রণয়ন করে, নীতি উপস্থাপন করে তাদের প্রত্যেকেরই নিজস্ব দৃঢ়চিত্ততা এবং নীতি-নিয়ম পদ্ধতির প্রতি দায়িত্বশীল থাকা আবশ্যক। এর পরিবর্তে যদি চাকরি যাওয়া বা পদোন্নতি আটকে যাওয়ার ভয় থাকে, তাহলে কোনো বিভাগই স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে না। ফলে তাদের দ্বারা প্রতিষ্ঠা পায় না স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতার নিশ্চয়তা। বরং বাড়াবাড়ি ও মাত্রাতিক্রমণের মাধ্যমে অধিকতর ক্ষতির কারণ সৃষ্টি হয়। সুশাসন, স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতা প্রয়োজন সবার স্বার্থে, গণতন্ত্রের স্বার্থে, অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বার্থে। কারণ এটা পরস্পরের পরিপূরক। মানবসম্পদ তৈরিতে যেকোনো জাতির জন্য শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতেই হতে হয় সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ। কারণ শিক্ষাই ভবিষ্যৎ জনসম্পদ তৈরি করবে। মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ তৈরি করবে। দায়িত্বশীল মানুষ তৈরি করবে। দায়িত্বশীল নেতা তৈরি করবে। যে মানুষ থাকবে নীতিমালা বাস্তবায়নে  সে মানুষ খাঁটি সৃজনশীল মানুষ হিসেবে দেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণ করবে। ঠিক তেমনিভাবে স্বাস্থ্য খাত থেকে মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত হলে, মানুষ সুস্থ হলেই না তার উৎপাদনশীলতা, সৃজনশীলতাসহ প্রত্যেক বিষয় বাড়বে।

স্বাস্থ্য খারাপ থাকলে, পুষ্টিহীন হলে কেউ  ভালো কাজ করতে সমর্থ হয় না। বরং তাকে সুস্থ ও কর্মক্ষম করে তোলার জন্য পরিবার ও রাষ্ট্রকে বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হয়। স্বাস্থ্য খাতে পর্যাপ্ত  বিনিয়োগ এজন্য দরকার যে, সবাইকে সুস্থ, নিরোগ ও স্বাস্থ্যবান নিরাপদ পেতে হবে। লোকবল সুস্থ হলেই সবকিছু বিকাশ লাভ করবে। এর বিপরীতে যদি দেখা যায় স্বাস্থ্য খাতে ধীরে ধীরে বাজেট কমছে, অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিবেচনার বাইরে থেকে যাচ্ছে, হাসপাতালে ওষুধ দেওয়া হচ্ছে কিন্তু তা রোগী পাচ্ছে না, রোগীকে বাইরে থেকে ওষুধ কিনতে হচ্ছে। চিকিৎসককে বেতন দেওয়া হচ্ছে, যাতে তারা হাসপাতাল বা সরকারি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে রোগীকে সুষ্ঠু চিকিৎসা দেন। অথচ হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা না দিয়ে তাদের বাধ্য করা হচ্ছে, প্রাইভেট চেম্বার কিংবা বেসরকারি ক্লিনিকে যেতে। জনগণের করের টাকায় চিকিৎসক, শিক্ষক, পাবলিক সার্ভেন্টকে বেতন দেওয়া হচ্ছে শিক্ষা-স্বাস্থ্য-প্রশাসনিক নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা তথা স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার জন্য। কিন্তু সেভাবে সেবাপ্রাপ্তি ঘটছে না। শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে যথাযথভাবে না পড়িয়ে তাদের কোচিং/প্রাইভেট পড়তে বলা হচ্ছে। শিক্ষার্থীকে দ্বিগুণ খরচ করতে হচ্ছে। উপযুক্ত ও গুণগত শিক্ষাদানের প্রয়াস প্রচেষ্টায় বাণিজ্যিক মনোভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। তার মানে, সেখানে শিক্ষক বা চিকিৎসকের দায়িত্ব পালনে স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতার পরিবেশ পরিব্যাপ্ত হচ্ছে না। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে একটা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান যখন দেখছেন, অভিভাবকরাও সন্ধ্যায় ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা তদারকিতে মনোনিবেশ করতে পারছে না, বিদেশি চ্যানেলে সিরিয়াল দেখার ব্যতিব্যস্ততার জন্য। তখন স্কুল-কলেজের শিক্ষকদের ওপরের শ্রেণির মেধাবী শিক্ষার্থীদের দিয়ে এমনকি সুশিক্ষিত অভিভাবক ও কর্মকর্তাদের দিয়ে স্কুলেই সান্ধ্য ক্লাস নেওয়ার ব্যবস্থা করেছেন। ফলে স্কুল-কলেজে পড়াশোনার একটি স্বেচ্ছা ও স্বতঃপ্রণোদিত ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা হয়েছে। পাবলিক পরীক্ষায় ফল ভালো আসছে। এটা দায়িত্বশীল পরিবেশ বিনির্মাণে স্থানীয় উদ্যোগ।

নানান আঙ্গিকে পরীক্ষা-পর্যালোচনায় দেখা যায়, শিক্ষক-চিকিৎসক-আইনজীবী-ব্যবসায়ী, এমনকি চাকরিজীবীদেরও বাঞ্ছিতভাবে জবাবদিহিতার আওতায় আনা সম্ভব হচ্ছে না। অতিমাত্রায় কোটারি, সিন্ডিকেট বা দলীয় বা রাজনীতিকীকরণের কারণে পেশাজীবী, সংস্থা সংগঠন এবং এমন কি সুশীল সেবকরাও প্রজাতন্ত্রের হয়ে দল-নিরপেক্ষ অবস্থানে থাকতে তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে এমন একটা পরিবেশ তৈরি হয়, যার ছত্রছায়ায় নানানভাবে অবৈধ অর্জন চলার পথ সুগম হতে পারে। সেবক প্রভুতে পরিণত হলে সম্পদ আত্মসাৎ, ক্ষমতার অপব্যবহারের দ্বারা অর্জিত অর্থ দখলের লড়াইয়ে অর্থায়িত হয়ে, এভাবেই একটা ঘূর্ণায়মান দুষ্টচক্র বলয় হয়। অর্থাৎ সুশাসনের অভাবে স্বচ্ছতার অস্বচ্ছতায় ঘুরে-ফিরে পুরো প্রক্রিয়াকে বিষিয়ে তোলে। সুতরাং সবক্ষেত্রে সর্বাগ্রে উচিত স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। এটা প্রয়োজন গণতন্ত্র ও সার্বিক উন্নয়নের স্বার্থে। বলার অপেক্ষা রাখে না, সুশাসন-স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে সত্যিকার উন্নয়ন হবে না, গণতন্ত্রও প্রতিষ্ঠা পাবে না। এটা পরস্পরের পরিপূরক। স্বচ্ছতার অস্বচ্ছতায় যে উন্নয়ন হয়, তাতে জনগণের সুফল নিশ্চিত হয় না। এ উন্নয়নের কোনো উপযোগিতা বা রিটার্ন নেই। বিষয়টি এক ধরনের আত্মঘাতী ভেলকিবাজি। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করতে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ধরা যাক, তাতে খরচ ৪০০ কোটি টাকা। সেটা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে করার কথা এবং বরাদ্দ সেভাবেই দেওয়া। কিন্তু সড়কটি শেষ করতে যদি দশ বছর লেগে যায় এবং ৪০০ কোটি টাকা খরচের জায়গায় দ্রব্যমূল্য ও নির্মাণ সামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধিজনিত কারণে যদি প্রায় ১২০০ কোটি টাকা খরচ করতে হয় সেটা সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার দুর্বল পরিস্থিতিরই পরিচায়ক। আলোচ্য অর্থ দিয়ে একই সময়ে হয়তো আরও দুটি সড়ক করা যেত। সময়ানুগ না হওয়া এবং দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির অজুহাতে তিনটা সড়কের অর্থ খরচ করে একটা সড়ক নির্মিত হয়েছে। আরেকটি বিবেচ্য বিষয় সড়কটি যথাসময়ে নির্মিত হলে (৩ বছর) পরিবহন খাতে সক্ষমতা বৃদ্ধির ফলে উপযোগিতা সৃষ্টি হয়ে জিডিপিতে অবদান রাখতে পারত। যথাসময়ে নির্মাণ উত্তর প্রাপ্য সেবা ও উপযোগিতার আকাক্সক্ষা হাওয়া হয়ে যাওয়ার ফলে প্রাপ্তব্য উপযোগিতা মেলেনি যথাসময়ে।

জিডিপি প্রবৃদ্ধির মূল কথা হলো, যে অর্থই ব্যয় করা হোক না কেন, সেই আয়-ব্যয় বা ব্যবহারের দ্বারা অবশ্যই পণ্য ও সেবা উৎপাদিত হতে হবে। পণ্য ও সেবা উৎপাদনের লক্ষ্যে যে অর্থ আয় বা ব্যয় হবে সেটাই বৈধ। আর যে আয়-ব্যয় কোনো পণ্য ও সেবা উৎপাদন করে না সেটা অবৈধ, অপব্যয়, অপচয়। জিডিপিতে তার কোনো ভূমিকা থাকে না। আরও খোলাসা করে বলা যায় যে, আয় পণ্য ও সেবা উৎপাদনের মাধ্যমে অর্জিত হয় না এবং যে ব্যয়ের মাধ্যমে পণ্য ও সেবা উৎপাদিত হয় না সেই আয়-ব্যয় জিডিপিতে কোনো অবদান রাখে না। কোনো প্রকার শ্রম বা পুঁজি বিনিয়োগ ছাড়া মওকা যে আয় তা সম্পদ বণ্টন বৈষম্য সৃষ্টিই শুধু করে না সেভাবে অর্জিত অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রেও সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ধার ধারে না। ফলে তা সৃষ্টি করে আর্থিক বিচ্যুতি। এভাবে যে অর্থ আয় বা খরচ করা হয়, তা প্রকারান্তরে অর্থনীতিকে পঙ্গু ও পক্ষাঘাতগ্রস্ত করে।

লেখক: সাবেক সচিব এবং এনবিআর চেয়ারম্যান

mazid.muhammad@gmail.com