তামিমের বরিশাল না চিটাগং

তামিম ইকবালের সামনে এক অদ্ভুত পরিস্থিতি। চট্টগ্রামের ছেলে তামিম বিপিএলে খেলছেন ফরচুন বরিশালের হয়ে, ফাইনালের প্রতিপক্ষ তার নিজের শহর চট্টগ্রামের ফ্র্যাঞ্চাইজি চিটাগং কিংস। আজ ফাইনালে তামিমের ব্যাট হাসলে হয়তো চট্টলাবাসীকেই পুড়তে হবে কষ্টে। অন্যদিকে চিটাগং কিংস জিতলে ফরচুন বরিশালের ক্রিকেটার হিসেবে শিরোপা ধরে রাখতে না পারার আক্ষেপ অবশ্যই পোড়াবে তামিমকে, তবে চট্টগ্রামকে প্রথমবার বিপিএল শিরোপা জিততে দেখে একটুও কি ভালো লাগবে না!

চট্টগ্রামের ছেলে হয়ে তামিম প্রশংসাই করলেন ফাইনালের প্রতিপক্ষ দলের, ‘মাঠের ক্রিকেটে তারা প্রমাণ করেছে, তারা ফাইনাল খেলার দাবিদার। এমন নয় যে, শুধু এখন এসে ভালো খেলেছে। টুর্নামেন্ট জুড়েই দারুণ খেলেছে।’ ফাইনালের ব্যপারে তামিম পারফরম্যান্সের চেয়ে বড় করে দেখছেন স্নায়ুর জোরকেই, ‘যে দল বেশি শান্ত থাকবে, তারই জেতার সুযোগ বেশি। আমি কোয়ালিফায়িংয়ে অনেক নার্ভাস ছিলাম। আগে দুবার ফাইনাল খেলেছি। এত বেশি চিন্তিত থাকি না ফাইনালে। যদি শান্ত থাকতে না পারেন, চাপে পড়ে যান, তখনই ভুল করবেন। শান্ত থাকা দলই বেশি সুযোগ পাবে।’

স্নায়ুর জোরের বড় পরীক্ষা দিয়েই ফাইনালে পৌঁছেছে চিটাগং কিংস। দ্বিতীয় কোয়ালিফায়ারে তারা খুলনা টাইগার্সকে হারিয়েছে শেষ বলে বাউন্ডারি মেরে। আলিস আল ইসলাম, যার প্রধান পরিচয় বোলার; তার ব্যাটেই ফাইনাল নিশ্চিত করেছে চিটাগং কিংস। দলের সহকারী কোচ এনামুল হক জুনিয়র বললেন, ‘নেটে পেসারদের খেলা অনুশীলন করতেন আলিস, ‘আমরা যারা টেলএন্ডার, তারা সাধারণত নেটে স্পিন খেলতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। তবে আলিস আলাদা, ও সবসময় পেস বোলারদের খেলতে চাইত।’ টেলএন্ডের জোরে ফাইনালে উঠে এলেও ব্যাটিংটা কমজোর চিটাগংয়ের। ছয় নম্বরের পর আর ব্যাটসম্যান নেই, সাতে নামতে হয় খালেদ আহমেদকে। এ নিয়ে কিংসের অস্ট্রেলিয়ান কোচ শন টেইটের মত, ‘আমাদের ছয়ে শামীম হোসেনের মতো ব্যাটসম্যান আছে। সে খেললে আসলে সাতে কাউকে ওভাবে প্রয়োজন হয় না। আর আমরা গোটা আসরে এভাবেই খেলে এসেছি। ফাইনালে আমরা আমাদের দলের কৌশলে বড় কোনো পরিবর্তন আনতে চাই না।’ কোচের বক্তব্যের স্বপক্ষে বড় প্রমাণ, প্লে-অফে উঠেও নামি কোনো বিদেশিকে দলে টানেনি কিংস। অন্যদিকে বরিশাল বাড়িয়েছে শক্তি। কিউই অলরাউন্ডার জেমস নিশাম এবং গ্রুপ পর্বে খেলে যাওয়া কাইল মেয়ার্সকে দলে পেয়েছে বরিশাল। সঙ্গে ডাভিড মালান থাকায় বিদেশি খেলোয়াড়দের একটা বাড়তি শক্তিই কাজ করবে বরিশালের।

চিটাগং কিংস অবশ্য অনামিদের নিয়েই বাজিমাত করেছে। খাজা নাফি, হুসাইন তালাত আর বিনুরা ফার্নান্দো ‘দামে কম মানে ভালো’ সার্ভিস দিয়ে গেছেন দলকে। গ্রুপ পর্বে সেঞ্চুরি করলেও পরের ১০ ইনিংসে কোনো হাফসেঞ্চুরি নেই গ্রাহাম ক্লার্কের। ইংলিশ কাউন্টিতে খেলা এই ব্যাটসম্যানকে নিয়ে আশাবাদী টেইট, তার বিশ্বাস আন্তর্জাতিক ক্রিকেট না খেললেও কাউন্টিতে খেলা এই ব্যাটসম্যান গড়ে দিতে পারেন ব্যবধান।

প্রথম কোয়ালিফায়ারে এই চিটাগং কিংসকেই ৯ উইকেটে হারিয়ে ফাইনালে পা রেখেছিল ফরচুন বরিশাল। পাকিস্তানি পেসার মোহাম্মদ আলির বোলিং আর ‘রাইটার্স ব্লক’ থেকে মুক্তি পাওয়া তাওহীদ হৃদয়ের ব্যাটিং বরিশালকে এনে দিয়েছিল ৯ উইকেটের বিশাল জয়।

সেই একই প্রতিপক্ষকে ফাইনালে পেয়ে যাওয়াটা ফরচুন বরিশালের জন্য একটা মানসিক প্রশান্তিরও কারণ হতে পারে। তবে পচা শামুকে পা কাটার ভয়ও কম নেই। খাজা নাফে আর হুসাইন তালাত খুলনার বিপক্ষে ভালো ব্যাটিং করে ছন্দে আছেন। ফাইনালে তাদের কারও ব্যাটে ভালো একটা ইনিংস তাদের দলীয় সংগ্রহটাকে বাড়িয়ে দিতে পারে। সঙ্গে শামীমের ক্যামিও যোগ হলে বরিশালের জন্য লক্ষ্যটা হয়ে যেতে পারে বড়। মিরপুরের উইকেটে আগে ব্যাট করলে কত রান নিরাপদ এমন প্রশ্নে সরাসরি কোনো উত্তর দিলেন না শন টেইট, ‘আমি আসলে পার স্কোরে বিশ্বাসী না। আমরা পরিস্থিতি অনুযায়ী খেলব।’

রাতের খেলায় টসটা হয়ে উঠতে পারে গুরুত্বপূর্ণ। পরে বোলিং করা মানেই শিশিরের প্রভাব। বোলারদের বল হাতে রাখাটা হবে কঠিন, উইকেট হয়ে যাবে সহজ, এমন অনেক সমীকরণ। কোয়ালিফায়ারেও পরে বোলিং করে বড় ব্যবধানে হারতে হয়েছিল চিটাগং কিংসকে। কোনো প্রভাবই রাখতে পারেননি খালেদ-শরিফুলরা। ফাইনালে তামিম যদি টসে জিতে পরে ব্যাটিং নেন, তাহলে কি একই ভাগ্য নাচছে চিটাগং কিংসের ভাগ্যে! হয়তো, তবে ফাইনালের চাপ বদলে দিতে পারে যেকোনো কিছুই।

বর্তমান চ্যাম্পিয়ন হিসেবে শিরোপা ধরে রাখার ক্ষুধাটা কি আগের মতোই আছে? এমন প্রশ্নে তামিমের উত্তর, ‘ট্রফি এমন একটা জিনিস, আমি নিশ্চিত, যাকেই জিজ্ঞেস করেন না কেন, যারা পাঁচবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছে, তারাও চাইবে ছয়বার হতে। আমরাও অবশ্যই চাইব হতে।’ দুদলের বিদেশিদের মানের পার্থক্যকেও বড় করে দেখছেন না, ‘আপনার দলে দুনিয়ার সেরা খেলোয়াড় থাকতে পারে; কিন্তু নির্দিষ্ট দিনে কে সামর্থ্যটা ভালোভাবে কাজে লাগিয়েছে, সেটাই আসল।’

গোটা আসর জুড়েই সংবাদ সম্মেলনে আসা কোচ-ক্রিকেটাররা একটা কথা বারবার বলেছেন, ‘মোমেন্টাম’। টি-টোয়েন্টি ম্যাচে মোমেন্টামের খেলায় কী হয়, সেটা দেখিয়েছে রংপুর রাইডার্স। টানা ৮ ম্যাচ জয়ের পর ৫ ম্যাচে হার, কাজ হয়নি ভাড়াটে যোদ্ধা এনেও। তাই ফাইনাল শেষ পর্যন্ত কারও অতিমানবীয় পারফরম্যান্স বা মানবিক ভুলই নির্ধারণ করে দেয়, বড় হয়ে ওঠে ছোট ছোট সব পার্থক্য। খুলনার বিপক্ষে শেষ বলে জিতে আপাতত সেই মোমেন্টাম চিটাগংয়ের পক্ষে। আর বরিশালের পক্ষে আছে ইতিহাস। বাকিটা নিষ্পত্তি হবে ২২ গজে।