‘ড্রিম হোম ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুরস লিমিটেড’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে রাশিয়ায় মাসে দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা বেতনে চকলেট ফ্যাক্টরি, ক্লিনার অথবা বাবুর্চির কাজের প্রলোভন দেখিয়ে ১০ জনকে রাশিয়ায় পাচার করেছে একটি মানব পাচার চক্র। চক্রটি প্রথমে ওই ১০ জনকে সৌদি আরব ওমরাহ ভিসায় পাঠায়। সেখানে তাদের ওমরাহ হজ করানোর পর রাশিয়ায় নিয়ে এক ‘সুলতানের’ কাছে বিক্রি করে দেয় চক্রটি। সুলতান তাদের রুশ সেনাবাহিনীতে হস্তান্তর করে। সেখানে তাদের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কাজ না দিয়ে, সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়ে পাঠানো হয় ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে। কেউ যুদ্ধে যেতে না চাইলে তার সঙ্গে করা হয় ক্রীতদাসের মতো আচরণ।
ড্রিম হোম ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুরস লিমিটেডের গ্রেপ্তার হওয়া অংশীদার ফাবিহা জেরিন তামান্নার বরাতে গতকাল বৃহস্পতিবার পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) জানিয়েছে এসব তথ্য। গত বুধবার রাতে নেপালে পালিয়ে যাওয়ার সময় বিমানবন্দর এলাকা থেকে ফাবিহা জেরিন তামান্না নামের ওই নারীকে গ্রেপ্তার করা হয়।
সিআইডির ভাষ্য, রাশিয়ায় পাচার হওয়া ১০ জনের মধ্যে যুদ্ধে নাটোর সিংড়া থানার হুমায়ুন কবির নামের এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। ঢাকা কেরানীগঞ্জের আমিনুল নামের একজন গুরুতর আহত হয়েছেন। এ ছাড়া পাচার হওয়া ১০ জনের মধ্যে নরসিংদীর পলাশ থানার বাসিন্দা মো. আকরাম হোসেন প্রশিক্ষণ ক্যাম্প থেকে পালিয়ে যান। পরে তিনি নিজ ব্যবস্থাপনায় ২৬ জানুয়ারি দেশে ফিরে আসেন। ফিরে এসে তিনি অন্যান্য ভিকটিমের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তার কাছ থেকে তথ্য পেয়ে যুদ্ধাহত আমিনুলের স্ত্রী ঝুমু আক্তার ডিএমপির বনানী থানায় মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে মামলা করেন। অভিযোগের ভিত্তিতে সিআইডি তদন্ত শুরু করে।
তদন্তের একপর্যায়ে সিআইডি জানতে পারে মানব পাচার চক্রের অন্যতম সদস্য ফাবিহা জেরিন তামান্না বিদেশে পালিয়ে যাচ্ছেন। পরে গত বুধবার রাতে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) জসীম উদ্দিন খান বলেন, ‘বুধবার রাতে নেপালে পালিয়ে যাওয়ার আগ মুহূর্তে আমরা জানতে পেড়েছি তামান্না “ড্রিম হোম ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুরস লিমিটেড” নামের একটি কোম্পানির অংশীদার। তিনি একটি মানব পাচার চক্রেরও সদস্য। চক্রটি রাশিয়ায় মাসে দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা বেতনে কাজের প্রলোভনে ১০ জনকে পাচার করেছে। চক্রটি প্রথমে ওই ১০ জনকে সৌদি আরব ওমরাহ ভিসায় পাঠায়। সেখানে তাদের ওমরাহ করানোর পর রাশিয়ায় নিয়ে গিয়ে এক সুলতানের কাছে বিক্রি করে দেয়। সুলতান তাদের দাস হিসেবে রাশিয়ার সৈনিকদের কাছে হস্তান্তর করে। সেখানে তাদের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কাজ না দিয়ে সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়ে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য বাধ্য করে।’
সিআইডির এই কর্মকর্তা বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ফাবিহা জেরিন তামান্না মানব পাচারের ঘটনায় নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছেন। সিআইডি জানতে পেরেছে, একইভাবে ১০ জনের আরেকটি দল সৌদি আরবে অবস্থান করছে। রাশিয়া নিয়ে গিয়ে জোরপূর্বক যুদ্ধে অংশগ্রহণ করানোর বিষয়ে জানাজানি হওয়ায় তারা রাশিয়ায় যেতে অস্বীকার করেছেন। তবে তাদের পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া হয়েছে। তাই তারা সৌদি আরবে কোনো কাজ করতে পারছেন না এবং দেশেও ফিরতে পারছেন না। জেরিনের ভাই তুহিন বর্তমানে রাশিয়ায় অবস্থান করছেন। তার মাধ্যমেই এসব যোগাযোগ হয়।
তিনি আরও বলেন, সিআইডি ভুক্তভোগীদের দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সংশ্লিষ্ট সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করছে। একই সঙ্গে মানব পাচারের এই নেটওয়ার্ক পুরোপুরি ভেঙে দেওয়ার পাশাপাশি জোর তদন্ত এবং গ্রেপ্তার প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখা হয়েছে।