স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশন

লক্ষ্য ২০% দরিদ্র মানুষের বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা

দেশে দারিদ্রসীমার নিচে বাস করা ২০ শতাংশ মানুষকে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে চিকিৎসা দেওয়ার প্রস্তাব করবে স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশন। এ জন্য তারা সরকারকে স্বাস্থ্য খাতে মোট জিডিপির ৫ শতাংশ পর্যন্ত বরাদ্দের পরামর্শ দেবে। চিকিৎসার ব্যয় নির্বাহে ‘ট্যাক্স বেইজড ফিন্যান্সিং’-এর কথা ভাবছে কমিশন। অর্থাৎ স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় নির্বাহ হবে ট্যাক্স থেকে। 

কমিশনের লক্ষ্য স্বাস্থ্যসেবাকে জনমুখী, সহজলভ্য ও সর্বজনীন করতে প্রয়োজনীয় সংস্কার। এ জন্য বর্তমান স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পরিবর্তে ‘হেলথ সার্ভিস অথরিটি’ গঠনের প্রস্তাব দেবে কমিশন। বর্তমান ‘স্বাস্থ্যসেবা’ ও ‘স্বাস্থ্য-শিক্ষা’র পাশাপাশি ‘পাবলিক হেলথ’ নামে নতুন বিভাগ যুক্ত করার প্রস্তাব দেবে।

‘হেলথ সার্ভিস অথরিটি’ থাকবে প্রধানমন্ত্রী অথবা মন্ত্রীর অধীনে। তবে ‘অথরিটি’ হবে স্বাধীন। স্বাস্থ্য ক্যাডার বলে কিছু থাকবে না। ‘অথরিটি’র একজন ‘প্রধান’ থাকবেন ও মাঠ পর্যায়ে কাজ করেছেন এমন চিকিৎসকরা থাকবেন ‘অথরিটি’র সদস্য। 

দেশের গোটা স্বাস্থ্য খাতকে ছয়টি ভাগে ভাগ করে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা দেবে কমিশন। সেগুলো হলো— হেলথ সার্ভিস, গভর্নেন্স, মেডিসিন, এডুকেশন, এমআইএস ও হেলথ ফিন্যান্সিং।

অবশ্য চিকিৎসকদের পেশাজীবী রাজনীতি, চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত চেম্বারে রোগী দেখা বা অস্ত্রোপচারের ফি নির্ধারণসহ চিকিৎসক সংশ্লিষ্ট কোনো কিছুর ব্যাপারে কোনো প্রস্তাবনার কথা ভাবছে না কমিশন। কমিশনের মত, এসব বিষয় সরকার বা চিকিৎসকরাই নির্ধারণ করবেন।

স্বাস্থ্যসেবাকে জনমুখী, সহজলভ্য ও সর্বজনীন করতে এমনতর বেশ কিছু প্রস্তাবনার খসড়া তৈরি করছে স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশন। কমিশন চেষ্টা করবে, এ মাসেই তাদের প্রস্তাবনা সরকারের কাছে জমা দিতে। কমিশনের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। 

এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের প্রধান ও বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ডা. এ কে আজাদ খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা চেষ্টা করব রিপোর্ট এই মাসের মধ্যেই জমা দিতে। আমরা জমা দেওয়ার আগে গণমাধ্যমের সঙ্গে বসব। আমাদের মূল লক্ষ্য স্বাস্থ্যসেবাকে জনমুখী, সহজলভ্য ও সর্বজনীন করা। 

স্বাস্থ্য খাতে প্রয়োজনীয় সংস্কার প্রস্তাবের লক্ষ্যে গত ১৭ অক্টোবর ১২ সদস্যের একটি স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশন গঠন করে অন্তর্বর্তী সরকার। পরের দিন এ ব্যাপারে গেজেট প্রকাশ করা হয়। গেজেটে কমিশনকে ৯০ দিনের মধ্যে তাদের প্রস্তুতকৃত প্রতিবেদন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার কাছে হস্তান্তরের সময় বেঁধে দেওয়া হয়।

কমিশনের সার্বিক ভাবনা তুলে ধরে কমিশন সদস্য ও সরকারের কমিউনিটি ক্লিনিক হেলথ সাপোর্ট ট্রাস্টের চেয়ারপারসন অধ্যাপক ডা. আবু মোহাম্মদ জাকির হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা চারটি বিষয়ে বেশি জোর দিচ্ছি। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা, জনস্বাস্থ্য অবকাঠামো আলাদা করা, স্বাধীন একটি হেলথ অথরিটি গঠন ও দক্ষ জনশক্তিকে কাজে লাগাতে প্রয়োজনে বেসরকারি খাত থেকেও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া। একটি স্বাধীন হেলথ অথরিটির মাধ্যমে স্বাস্থ্য কর্মসূচি হবে। 

এ ব্যাপারে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাবেক আঞ্চলিক উপদেষ্টা (দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চল) অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমাদের চেষ্টা হবে দেশে যেন একটা জনমুখী স্বাস্থ্য ব্যবস্থা কায়েম হয়। জনগণ যেন কোয়ালিটি হেলথ কেয়ার সার্ভিস পায়। আমরা অগ্রাধিকার দিচ্ছি সাধারণ মানুষকে, বিশেষ করে গ্রাম পর্যায়ের মানুষ। তাদের নিয়ে আমাদের বেশি চিন্তা।

লক্ষ্য ২০% দরিদ্র মানুষকে বিনামূল্যে চিকিৎসা

এ ব্যাপারে অধ্যাপক ডা. আবু মোহাম্মদ জাকির হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক কমিটির সঙ্গেও কথা বলেছি। তারা সবাই বলেছে জিডিপির পাঁচ শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দিতে। একবারে না দিলেও ধীরে ধীরে পাঁচ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। এখন বরাদ্দ হচ্ছে মোট জিডিপির শূন্য দশমিক ৭৪ শতাংশ ও বার্ষিক কর্মসূচির পাঁচ শতাংশ অর্থ। সেটি যদি ৫ শতাংশ হয়, তা হলে বর্তমান বরাদ্দের চেয়ে পাঁচ থেকে ছয় গুণ বেশি হবে। এটা হলে মোটামুটি সব মানুষকেই কিছু না কিছু ক্ষেত্রে বিনা পয়সায় স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া যাবে। 

এই সদস্য বলেন, এখন দেশে স্বাস্থ্য খাতে যে ব্যয় করা হয়, তার আড়াই গুণ মানুষ নিজের পকেট থেকে দেয়। অর্থাৎ মোট ব্যয়ের এক-তৃতীয়াংশ সরকার দেয় ও দুই-তৃতীয়াংশ অর্থ মানুষ দেয়। ভুটান ও মালদ্বীপ তাদের দেশের জিডিপির ৯ শতাংশ অর্থ স্বাস্থ্যে বরাদ্দ দেয়। ইউরোপের দেশগুলো দেয় ১০-১২ শতাংশ, আমেরিকার ১৭ শতাংশ। সে হিসাবে  আফগানিস্তান ও মিয়ানমার ছাড়া পৃথিবীর অন্যান্য দেশে ৩ শতাংশের ওপরে অর্থ সরকার দেয়। আমরা তিন শতাংশ থেকে শুরু করার প্রস্তাব  দেব, যেটি এক সময় পাঁচ শতাংশে পৌঁছাবে।

এই সদস্য আরও বলেন, আমরা চাচ্ছি দারিদ্রসীমার নিচে বাস করা ২০ শতাংশ মানুষকে বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা দিতে। এর মধ্যে ১৫ শতাংশ পাবে সরকারি হাসপাতাল থেকে ও ৫ শতাংশ মানুষ বেসরকারি হাসপাতাল থেকে। বেসরকারি হাসপাতালকে যখন লাইসেন্স দেওয়া হয়, তখন ১০ শতাংশ রোগীকে বিনা পয়সায় সেবা দিতে শর্ত বেঁধে দেওয়া হয়। কিন্তু ওরা এক শতাংশও দেয় না। এখন আমরা বলছি পাঁচ শতাংশ মানুষকে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দিতে হবে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলে কিছু থাকবে না

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলে কিছু থাকবে না। সেটা পরিবর্তন হয়ে ‘হেলথ সার্ভিস অথরিটি’ হবে। ক্যাডার প্রথাও থাকছে না। এই অথরিটির আলাদা একটি কাঠামো থাকবে, তারা নিজেরা পরিকল্পনা করবে, বাস্তবায়ন করবে। এখানে মাঠ থেকে কাজ করে এসেছেন, তাদের দায়িত্ব দেওয়া হবে। এই অথরিটির অধীনে তিনটি বিভাগ থাকবে— পাবলিক হেলথ, হসপিটাল অ্যান্ড ডায়াগনোসিস সার্ভিসেস এবং মেডিকেল অ্যান্ড অ্যালাইড এডুকেশন। এই অথরিটির একজন চিফ থাকবেন। তাকে সহযোগিতার জন্য থাকবেন মেম্বার।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সদস্য বলেন, স্বাস্থ্য খাতের গভর্নেন্স এবং মনিটর— এই দুটোর ওপর খুব জোর দেওয়া হবে। আমরা স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ক্যাডার থেকে আলাদা হয়ে যাব— এমনটা চাচ্ছি। হেলথ সেক্টরে স্বাস্থ্য খাতের মানুষ সেবা দিক। এটা অন্যদের পক্ষে বোঝা সম্ভব না। আলাদা একটা হেলথ সার্ভিস অথরিটি থাকবে। এটা প্রধানমন্ত্রী অথবা স্বাস্থ্যমন্ত্রীর অধীনে থাকবে।

এই সদস্য আরও বলেন, পাবলিক হেলথ নামে নতুন একটা কাঠামোর ব্যাপারে চিন্তা করছি। এখন আছে হেলথ সার্ভিস ও মেডিকেল এডুকেশন। এরপর থেকে আমাদের চিন্তা আছে তিনটা বিভাগ হবে। এই নতুন কাঠামোতে প্রিভেন্টিভ, প্রোমোটিভ ও ডিজিজ কন্ট্রোল বিভাগ থাকবে।

ব্যয় আসবে ট্যাক্স থেকে

অধ্যাপক ডা. আবু মোহাম্মদ জাকির হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা ছয়টি গ্রুপে ভাগ হয়ে ড্রাফট তৈরি করছি। হেলথ সার্ভিস, গভর্নেন্স, মেডিসিন, এডুকেশন, এমআইএস ও হেলথ ফিন্যান্সিং। বিএনপি যেমন বলেছে যে, তারা ইংল্যান্ডের যে হেলথ সার্ভিস পদ্ধতি আছে সেভাবে যেতে চায়, সেটাও আমরা আগে থেকেই ভেবেছি। বাংলাদেশের স্বাস্থ্যের সার্ভিসের জন্য ফিন্যান্স আসতে হবে ট্যাক্স বেইজ ফিন্যান্সিং থেকে। বীমা অনেক জটিল ব্যাপার।

এই সদস্য আরও বলেন, প্রাথমিক সেবায় কী ধরনের মেডিসিন থাকবে, কতগুলো প্রয়োজনীয় ওষুধ থাকবে— সেগুলোর মূল্য কীভাবে নিয়ম নির্ধারণ ও নিয়ন্ত্রণ করা যায়, সে ব্যাপারে নির্দেশনা থাকবে। 

থাকছে ওষুধ, চিকিৎসা শিক্ষা, প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত স্বাস্থ্যসেবার প্রস্তাবনা : নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কমিশনের একজন সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চিকিৎসকদের ফ্রি নির্ধারণ, চেম্বার করা— এসব চিকিৎসকের ব্যাপার, তারাই নির্ধারণ করবেন, বা সরকার করে দেবে। এসব ব্যাপারে আমাদের কোনো নির্দেশনা থাকছে না। তবে সরকার চাইলে জেলা ও উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত সরকারি হাসপাতালে ব্যক্তিগত চেম্বার করে সরকারি চিকিৎসকদের রোগী দেখার ফি নির্ধারণ করে দিতে পারে। আমরা সেদিকে কোনো নজর দিচ্ছি না। চিকিৎসকদের পেশাজীবী রাজনীতি নিয়েও আমাদের কোনো পরামর্শ থাকছে না। 

এই সদস্য আরও বলেন, রোগীদের চিকিৎসায় রেফারেল সিস্টেম থাকবে। উপজেলা, জেলা, বিভাগ ও জাতীয় পর্যায়ের হাসপাতালে চিকিৎসাসেবার নানা পরামর্শ থাকবে।

কমিশনের আরেক সদস্য বলেন, বাংলাদেশে আরও বেশি ওষুধ প্রস্তুত করা যায় কি না সেটা নিয়ে আমরা চিন্তা করছি। বিশেষ করে সরকারি পর্যায়ে কী ধরনের ওষুধ তৈরি করা যায় ও সেগুলো সরবরাহ ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রস্তাব থাকছে। আমরা মূলত স্বাস্থ্যসেবার ওপরই জোর দিয়েছি, যেন সব শ্রেণির মানুষ সেবা পায় ও সহজলভ্য হয়। 

এই সদস্য বলেন, আমরা মেডিকেল কলেজ ও সরকারি হাসপাতাল পরিদর্শন করেছি। মেডিকেল শিক্ষার মানোন্নয়নের চিন্তা মাথায় আছে। সে ব্যাপারে আমাদের কিছু প্রস্তাবনা থাকবে। 

রাজনৈতিক দল ও অংশীজনদের সঙ্গে বসেছে কমিশন

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন অংশীজন ও রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বসেছি। সামনে আরও বসব। তারা যে সব প্রস্তাবনা দিয়েছেন, সেগুলো আমলে নিয়েছি। বেসরকারি সংস্থাগুলো তাদের প্রস্তাবনা জমা দিচ্ছে। এরমধ্যে যেগুলো আসলেই সংস্কারের কাজে লাগবে আমরা সেগুলো রাখব। আশা করছি ভালো কিছু হবে।

এই সদস্য জানান, কমিশন এখন পর্যন্ত ২৫টির মতো বৈঠক করেছে। এর বাইরে বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে পৃথক বৈঠকও করেছে। কমিশন সদস্যরা প্রত্যেক বিভাগে গেছেন। মতবিনিময় সভা করেছেন। উপজেলায় গেছেন ও সেখানকার স্বাস্থ্যসেবা পরিস্থিতি দেখেছেন। সবার সঙ্গে কথা বলেছেন।