তারুণ্যের উৎসব, অন্যরকম বিপিএল... খেলা মাঠে গড়ানোর আগে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের একাদশ আসর নিয়ে অনেক আশার কথাই শুনিয়েছিলেন আয়োজকরা। বলেছিলেন দর্শকদের জন্য স্বস্তিদায়ক অভিজ্ঞতার কথাও। প্রতিশ্রুতির অনেকটুকু তারা রাখতে পেরেছেন, অনেকাংশই থেকে গেছে ফাঁকা বুলি। প্রায় ৭ সপ্তাহের বিপিএলের শেষটা হয়েছে ওয়াইড বলে ফরচুন বরিশালের পাওয়া ৩ উইকেটের জয়ে। এবারের আসরে সবচেয়ে বেশি সন্দেহ তৈরি হয়েছে ওয়াইড বল ঘিরেই, তাই বলা যায় উপযুক্ত সমাপ্তিই দেখল একাদশ বিপিএল।
ডানা ৩৬ মাস্কট, মুগ্ধ পানি কর্নার, ওয়েস্ট ফ্রি জোন, জুলাই আন্দোলনের আহতদের খেলা দেখতে আসার সুযোগ করে দেওয়া, ব্যাংকের মাধ্যমে টিকিট বিক্রি... ইতিবাচক অনেক কিছুই সংযোজিত হয়েছে এবারের বিপিএলে। মাঠের খেলাও জমেছে ভালো, দর্শক চার-ছক্কা দেখেছেন বেশ। কিন্তু খেলার মান ক্রমশ নিম্নগামী। বিপিএলে একটা সময় আসতেন বিশ্বের সেরা ক্রিকেটাররা। এখন যারা আসছেন তাদের নাম দিয়ে গুগল সার্চ করলেও পর্যাপ্ত তথ্য মেলে না। অবসরে চলে যাওয়া কিছু সাবেক ক্রিকেটার এবং অনামি অখ্যাত ক্রিকেটাররাই ঝাঁক বেঁধে এসেছেন। ফরমানউল্লাহ শাফি, লাহিরু সামারকুন, মিগুয়েল কামিন্স... এ রকম অখ্যাত সব ক্রিকেটাররাই মাঠে নেমেছেন বিভিন্ন ফ্র্যাঞ্চাইজির জার্সি গায়ে। ফলে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঝাঁঝ কমেছে। সংবাদ সম্মেলনে এসে তামিম ইকবাল বলেছেন বিপিএলের ফ্র্যাঞ্চাইজি সংখ্যা কমিয়ে আনার কথা। উদাহরণ হিসেবে বলেছেন পাকিস্তান সুপার লিগ শুরু করেছিল ৫ ফ্র্যাঞ্চাইজি দিয়ে, এখন তাদের ফ্র্যাঞ্চাইজি সংখ্যা ৬। পাকিস্তানের ক্রিকেটারদের মান বাংলাদেশের চেয়ে ভালো, তবুও তারা ফ্র্যাঞ্চাইজি সংখ্যা বাড়ায়নি, আসরটাকে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক করেছে। বাংলাদেশেও তামিম মনে করেন ফ্র্যাঞ্চাইজির সংখ্যাটা ৫ এর বেশি হওয়া উচিত না, সর্বোচ্চ ৬ দলের আসর হতে পারে। তামিমের কথার প্রতিফলন দেখা যায় পয়েন্ট টেবিলেই। ১২ ম্যাচে মাত্র ২ জয় পাওয়া সিলেট আর ৩ জয় পাওয়া ঢাকা অনেক আগেই চলে যায় প্লে-অফের সমীকরণের বাইরে। শেষ পর্যন্ত লড়াইটা সীমাবদ্ধ ছিল ৫ দলের ভেতরেই।
ক্রিকেট ম্যাচের ফল নিয়ে গড়াপেটার দিন ফুরিয়েছে, এসেছে স্পট ফিক্সিং। কোন বলটা নো হবে আর কোনটা ওয়াইড হবে, এই নিয়েই জুয়া চলে অনলাইনে, বেটিং সাইটে। লেনদেন হয় মোটা টাকা। মোহাম্মদ আসিফ, মোহাম্মদ আমিররা এই ফাঁদেই পা দিয়েছিলেন, ওভারে একটা বাড়তি বল করলে যদি পকেট ভরে যায় তাহলে ক্ষতি কী! তারপর থেকেই সন্দেহজনক ওয়াইড বা নো-বল হলেই নাকে আসে স্পট ফিক্সিং-এর পচা গন্ধ। বোলাররা এমন সব ওয়াইড বল করছেন যে বল পাশের উইকেটে গিয়ে পড়েছে। অস্ট্রেলিয়ান সাংবাদিক জ্যারড কিম্বার একটি প্রতিবেদনে জানিয়েছেন, ঢাকা-রংপুর ম্যাচে আলাউদ্দিন বাবুর করা ওভারের সময় বেটফেয়ার-সহ বিভিন্ন ওয়েবসাইটে বিপুল অঙ্কের সন্দেহজনক লেনদেন হয়েছে। একটি নির্দিষ্ট ওভারে নির্দিষ্ট রানের অঙ্ক মেলাবার জন্য বোলাররা ওয়াইডে বাই চার রান দিয়েছেন বলেই মনে করেন অনেকে। টানা ওয়াইড, বিশাল ওভার স্টেপে নো-বল এ রকম সন্দেহজনক অনেক মুহূর্তেরই জন্ম দিয়েছে এবারের বিপিএল, যে কারণে তদন্ত করার জন্য বিসিবিকে আপিল বিভাগের সাবেক বিচারক মির্জা হায়দার আলীকে প্রধান করে তিন সদস্যের স্বাধীন এবং স্বতন্ত্র তদন্ত কমিটি বানাতে হয়েছে।
বিপিএলের বিষফোড়ার নাম ছিল দুর্বার রাজশাহী। শুরু থেকেই খেলোয়াড়দের পাওনা পরিশোধে টালবাহানা করে আসছিলেন ফ্র্যাঞ্চাইজির মালিক শফিক রহমান। তার দেওয়া চেক বারবার বাউন্স করেছে ব্যাংকে, এতগুলো ‘বাউন্সার’ বোধহয় গোটা আসরে তাসকিন আহমেদও করেননি! হোটেলের পাওনা পরিশোধ না করায় তার রুমের সামনে পাহারা বসিয়েছিল চট্টগ্রামের র্যাডিসন হোটেল কর্র্তৃপক্ষ। পাওনা না পাওয়ায় রংপুর রাইডার্সের বিপক্ষে রাজশাহীর হয়ে খেলতে মাঠে আসেননি কোনো বিদেশি ক্রিকেটার। নজিরবিহীন একের পর এক ঘটনায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও নষ্ট হয় বিপিএলের ভাবমূর্তি, বিশ্ব ক্রিকেটার সংস্থা’র প্রধান নির্বাহী মোফাট বিপিএলের এই পারিশ্রমিক জটিলতা নিয়ে কর্র্তৃপক্ষ সম্পর্কে বলেছেন ‘তারা পুনরাবৃত্তি অপরাধী’। ইএসপিএন ক্রিকইনফোকে মোফাট জানিয়েছেন, ‘বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে পারিশ্রমিক না দেওয়া নিয়ে আবারও কিছু শুনতে পাওয়াটা হতাশাজনক, অনেক বছর ধরেই তারা এই অপরাধের পুনরাবৃত্তি করে আসছেন। এই ব্যাপারটা মেনে নেওয়া যায় না। পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হচ্ছে না আর এতে করে খেলোয়াড়রা যারা এই আয়োজনটাকে সফল করেন তারাই ভুক্তভোগী হচ্ছেন। যে কোনো স্বীকৃত লিগেই খেলোয়াড়দের একটা ন্যূনতম বিশ্বাস থাকতে হবে যে এখানে মৌলিক বিষয়গুলো ঠিকঠাক থাকবে।’ দুর্ভাগ্যজনকভাবে, শুরুর ১১টা আসর পরেও বিপিএলকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ লিগ হিসেবেই শ্রেণিবদ্ধ করেছে ওয়ার্ল্ড ক্রিকেটার্স অ্যাসোসিয়েশন। ডাভিড মালান বলেছেন, ‘টাকা না থাকলে দল থাকবে না, এতটাই সহজ ব্যাপারটা’, উইল বোসিস্টো বলেছেন, ‘ফ্র্যাঞ্চাইজির উচিত চুক্তিপত্রকে সম্মান করা’; কিন্তু আখেরে রাজশাহীর মালিককে কিছুই নড়াতে পারেনি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে এবং সবশেষ জানা গেছে ৫০ শতাংশ পারিশ্রমিক পেয়েছেন রাজশাহীর দেশীয় খেলোয়াড়রা। বিদেশিদের খেলতে না আসা, বাসভাড়ার টাকার জন্য কিটব্যাগ আটকে রাখা... এমন নজিরবিহীন সব ঘটনার জন্ম দেওয়া রাজশাহী ফ্র্যাঞ্চাইজি একাই ডুবিয়েছে বিপিএলের সব অর্জন।
অনামি বেনামি বিদেশি খেলোয়াড়দের নিয়ে গড়া দলগুলোর বিপক্ষেও সফল হতে পারেননি জাতীয় দলের অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত। একটা সময় ফরচুন বরিশাল দলের একাদশ থেকেও ছিটকে যান এই বামহাতি ব্যাটসম্যান। একটা সেঞ্চুরি আর হাফসেঞ্চুরি বাদে ভালো করেননি লিটন দাসও, তার দল ঢাকা ক্যাপিটালস ছিল তলানিতে। ভালো করেননি চ্যাম্পিয়নস ট্রফির দলে থাকা মোস্তাফিজুর রহমানও, বরং ভালো করেও দলে নেই হাসান মাহমুদ। যদিও একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচের হিসাবটাই আলাদা, সেখানে তারা ভালোও করতে পারেন। তবে গোঁজামিলের এই বিপিএলেও রান করতে বা উইকেট তুলতে না পারলে দুবাই আর রাওয়ালপিন্ডিতে পারবেন, সেই বিশ্বাসে জোর পাওয়া যাচ্ছে না।