১৯৯২ সালে বসনিয়ার গৃহযুদ্ধের আগুন যখন সর্বগ্রাসী হয়ে উঠছে, তখন মাত্র নয় বছরের এক শিশু রাতারাতি নিজের দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়। পরিবারের সঙ্গে আশ্রয় নেয় অস্ট্রিয়ায়, যেখানে ভাষা জানতো না, চেনা-পরিচিত কেউ ছিল না। সেই শিশু মিরন মুসলিক আজ প্লাইমাউথ আর্গাইলের প্রধান কোচ, যিনি এফএ কাপে লিভারপুলকে হারিয়ে বিশ্ব ফুটবলে আলোড়ন তুলেছেন।
রায়ান হার্ডির একমাত্র পেনাল্টি গোলে প্লাইমাউথ আর্গাইল ১-০ ব্যবধানে হারিয়েছে ছয়বারের ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন লিভারপুলকে। ম্যাচ শেষে মুসলিক বলছিলেন, 'এটা আমাদের জন্য এক জাদুকরী দিন। ছেলেদের বলেছিলাম, উপভোগ করো, কারণ আমরা এখন আর্গাইলের ইতিহাসের অংশ হয়ে গেলাম। এটি আমাদের জন্য বিশাল এক দিন। মনে হচ্ছে, আমরা এই মুহূর্তের দাবিদার ছিলাম। আমি বাকরুদ্ধ। সাধারণত মানুষ বলে আমি খুব সাবলীলভাবে কথা বলি, কিন্তু আজ সত্যিই গর্বিত অনুভব করছি।'
যুদ্ধের ছায়া থেকে নতুন জীবনের সন্ধানে
মুসলিকের জন্ম বসনিয়ার বিহাচে। কিন্তু ১৯৯২ সালে শুরু হওয়া গৃহযুদ্ধে যখন বসনিয়া জ্বলছে, তখন তাঁর পরিবার বাধ্য হয় দেশ ছাড়তে। মাত্র এক মাসের ব্যবধানে তাঁদের শহর সার্ব বাহিনীর তিন বছরের অবরোধের শিকার হয়।
মুসলিক বলেন, 'আমাদের বসনিয়া ও বিহাচ ছেড়ে যেতে হয়েছিল হঠাৎ করেই, হাতে যা ধরতে পেরেছি, সেটুকু নিয়েই বেরিয়ে পড়তে হয়েছিল।'
পরিবারের সঙ্গে ৬৫০ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে অস্ট্রিয়ার ইনসব্রুকে পৌঁছান তিনি। কিন্তু নতুন দেশে শুরুটা মোটেও সহজ ছিল না। ভাষা জানতেন না, সংস্কৃতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
এ বিষয়ে তিনি বলেন, 'আমরা সারা জীবন সংগ্রাম করেছি, আর এই সংগ্রামই আমার জীবনের অংশ হয়ে গেছে। এ কারণেই আমি সবসময় ইতিবাচক থাকি।'
ফুটবলে নতুন পথের সন্ধান
ফুটবলই ছিল সেই মাধ্যম, যা তাকে নতুন পরিবেশে মানিয়ে নিতে সাহায্য করে। অস্ট্রিয়ায় স্থানীয় ক্লাব ওয়াকার ইনসব্রুকে যোগ দিয়ে শুরু করেন ফুটবল ক্যারিয়ার। এরপর খেলেছেন অস্ট্রিয়ার শীর্ষ পাঁচ লিগে এবং ক্রোয়েশিয়ার একটি সংক্ষিপ্ত মেয়াদে।
তবে খেলোয়াড় হিসেবে বড় কিছু করার চেয়ে মুসলিকের আগ্রহ ছিল কোচিংয়ে। ক্যারিয়ার শেষ করার আগেই কোচিং লাইসেন্স অর্জনে মন দেন। ২০১৮ সালে মাত্র ৩৫ বছর বয়সে তিনি কোচিং ক্যারিয়ার শুরু করেন, প্রথমে কাজ করেন অস্ট্রিয়ার দল ফ্লোরিডসডর্ফারের সহকারী কোচ হিসেবে। এরপর মূলধারায় পা রাখেন বেলজিয়ান ক্লাব সার্কেল ব্রুজের কোচ হয়ে।
২০২৩ সালে সার্কেল ব্রুজকে প্রথমবারের মতো উয়েফা ইউরোপা কনফারেন্স লিগে তুলেছিলেন তিনি।
প্লাইমাউথে আসার গল্প
২০২৪ সালের জানুয়ারিতে প্লাইমাউথ আর্গাইল যখন চ্যাম্পিয়নশিপের তলানির দিকে ছুটছিল, তখন ক্লাব নতুন কোচ খুঁজছিল। মাত্র এক মাস আগে ইংল্যান্ডের কিংবদন্তি স্ট্রাইকার ওয়েন রুনি দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছিলেন। সংকটের মুখে ক্লাব আস্থা রাখে মুসলিকের ওপর, যিনি মূলত একজন তরুণ ও স্বল্পপরিচিত কোচ।
কিন্তু দল পাওয়ার পরপরই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েন তিনি। দল ছেড়ে যান সেরা ডিফেন্ডার লুইস গিবসন এবং তারকা ফরোয়ার্ড মরগান হুইটেকার। লিগে ১৫ ম্যাচ ধরে জয়শূন্য ছিল প্লাইমাউথ।
তবে মুসলিক ধীরে ধীরে দলকে গুছিয়ে আনেন। ক্লাব রেকর্ড ট্রান্সফার ফিতে ইউক্রেনের ডিফেন্ডার মাক্সিম তালোভিয়েরভকে দলে টানে। এরপর ওয়েস্ট ব্রমের বিপক্ষে ২-১ ব্যবধানে জয় পেয়ে ১৫ ম্যাচের জয়খরা কাটায় দল।
লিভারপুলকে হারিয়ে নতুন ইতিহাস
এফএ কাপে লিভারপুলের মুখোমুখি হওয়ার আগে কেউ ভাবেনি, প্লাইমাউথ পেরে উঠবে। লিভারপুল তখন প্রিমিয়ার লিগের শীর্ষে, চ্যাম্পিয়নস লিগের গ্রুপেও সেরা দল হিসেবে নকআউট পর্বে উঠেছে। কিন্তু মুসলিকের দল ফুটবলে অসম্ভব বলে কিছু নেই, তা দেখিয়ে দিয়েছে।
মুসলিক বলেন, 'আমি জীবনে এমন অনেক কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেছি, যেখানে ড্র কিংবা হার ছিল বড় চ্যালেঞ্জ নয়।'
তিনি যোগ করেন, 'এটাই আমি সবসময় খেলোয়াড়দের বলি—জীবন একটা সংগ্রাম, কিন্তু এই সংগ্রামের মধ্যেই সুন্দর সব চমক লুকিয়ে থাকে, আর সবসময় কিছু না কিছু পাওয়ার জন্য লড়াই করা দরকার।'
ফুটবল যেভাবে বদলে দিয়েছে মুসলিককে
শরণার্থী থেকে ইউরোপের অন্যতম প্রতিভাবান কোচ হয়ে ওঠার এই যাত্রায় ফুটবলই ছিল মুসলিকের সবচেয়ে বড় অবলম্বন। তিনি বলেন, 'ফুটবল একটা সর্বজনীন ভাষা। যখন আপনি মাঠে নামবেন, তখন কেউ আপনার নাম, ধর্ম, পেশা, বা শরণার্থী কি না—এসব নিয়ে ভাববে না। শুধু খেলা নিয়েই ভাববে। এ কারণেই আমরা এই খেলাকে ভালোবাসি, আর এ কারণেই আমি একে আমাদের ভালোবাসার খেলা বলে থাকি।'
খেলোয়াড়দের কাছেও সবসময় ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির বার্তা পৌঁছে দেন মুসলিক, 'আমি যখন আর্গাইলের ড্রেসিংরুমের দিকে তাকাই, দেখি—বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ছেলেরা একসঙ্গে খেলছে এবং দারুণভাবে কাজ করছে।'
তিনি যোগ করেন, 'তাহলে কল্পনা করুন, যদি পুরো বিশ্ব একটা ড্রেসিংরুমের মতো হতো, তবে সেটা কত সুন্দর জায়গা হয়ে উঠত!'
এই কথাগুলোই বোঝায়, কেন মুসলিক শুধু একজন ফুটবল কোচ নন—তিনি একজন স্বপ্নদ্রষ্টা, যিনি জীবনসংগ্রামের মধ্যেও আশার আলো দেখতে জানেন।