ইশারাবৃক্ষের নিচে নিদ্রাহীন কবি

অমিতাভ গুপ্ত সম্পাদিত উত্তরাধুনিক কবিতার সংকলনটি যখন আশির দশকের শেষের দিকে হাতে এলো তখন কৌতূহলের সঙ্গে লক্ষ করলাম প্রথমেই যার কবিতা দিয়ে সংকলনটি শুরু হয়েছে তিনি রাহুল পুরকায়স্থ। সেই দিন থেকে রাহুলের কবিতার আশ্চর্য জগতে আমার প্রবেশ। পরে নানা সময়ে তার কবিতা কলকাতার পত্রিকায় পড়েছি। কিন্তু একসঙ্গে একটি পূর্ণাঙ্গ জগতের আভাস পাওয়ার আগেই আমি নিজ দেশ থেকে ছিটকে পড়লাম অন্য এক দূর দেশে, যেখানে বাংলা ভাষার কোনো কিছুরই চিহ্ন ছিল না। আবার যখন এক দশক পর ফিরে এলাম, তখন রাহুলের সন্ধানে বেরিয়ে খুঁজে পেলাম দেজ থেকে প্রকাশিত তার শ্রেষ্ঠ কবিতা, বাংলাদেশে প্রকাশিত নির্বাচিত কবিতা এবং কবিতা আশ্রম থেকে এ বছরই প্রকাশিত নির্বাচিত কবিতার সর্বসাম্প্রতিক সংস্করণটিও দেখার সুযোগ হলো। রাহুলের কবিতার মধ্যে এমন এক মাদকতা আছ, যা আমি তার সমসাময়িক আর কারও কবিতায় খুব একটু পাইনি। রাহুলের কবিতা পড়লে মনে হবে দান্তের ইনফার্নোয় এক পরিভ্রমণের অভিজ্ঞতা, যেখানে রক্ত ক্লেদ আর গোঙানির কোমল স্বর ঊর্মিময় : মা-রক্ত, দেখেছ, দেখো শিশুরক্তে আহার জোগায়,  দু-ঠোঁটে অন্নের আভা, ভালোবাসা এমনই রক্তিম, আমাকে চেনো না তুমি, গুপ্তঘাতকের দেশে ফেরি করি যাদুবিদ্যা, খলের ভূষণ, আর গৃহযুদ্ধে ব্যবহৃত কঙ্কালের জামা, রাহুলের কাব্য এ সময়ে এক ‘রক্তাক্ত দক্ষিণা’ হয়ে ফুটে উঠেছে সাদা পৃষ্ঠার নিরীহ অক্ষরে। দুঃস্বপ্ন ও সময়ের প্রেতের সঙ্গে নিরন্তর দ্বৈরথকে তিনি গীতল ভাষায় স্পন্দিত করে তুলেছেন তার অসংখ্য কবিতায়। রাহুলের কাব্যভাষা কল্পনার আগুন আর চিত্রধর্মীতায় সমর্পিত বলে তা পাঠকের ঘুমন্ত স্নায়ুকে আলোড়িত করে। অভাবনীয়, কখনো কখনো পরস্পর-বিপ্রতীপ চিত্রকল্পের সহাবস্থানের ফলে তার কবিতা অনুভূতির গোপনতম স্তরের বিরোধাত্মক দৈবকে শিল্পিত স্বভাবে সূক্ষ্ম ইশারায় তুলে ধরে :

নিজরক্তে লিখি হত্যা

     হত্যা কারুক্ষোভ

আমার মৃতের দেহ জন্মাল গোপনে

 

গোপন, তোমার বিষ আমার প্রণয়

যত মৃত্যু লিখে চলি, তত হত্যা জয়

 

রাহুল তার ‘প্রিয় কবিতার বই’ শীর্ষক কবিতায়

বলেছেন :

প্রতিটি অক্ষর তার অপদেবতার

ভাষা তার স্নায়ুমরীচিকা

 

সমাধিসৌধের মতো শান্ত, পরিণামে

খাদ্যপিরামিড

 

আমাকে পাহাড়িপথে একা ফেলে

পালিয়েছে জিপ

 

দূরে শহরের আলো

যেন পাখি গায় গান যৌনকলহের

রাহুলের কাব্যভাষা ওর একান্ত নিজস্ব ধাঁচে তৈরি। সাংকেতিকতার সূত্রে উৎপল আর মিহি কোমলতা হয়তো মনে করিয়ে দেবে দূরাত্মীয় বিনয়ের কথা। কিন্তু রাহুল এই দুই অগ্রজকে এতটাই তার স্বভাবে রূপান্তরিক করে নিয়েছেন যে, এই কাব্যভাষা রাহুলেরই নিজস্ব অবয়ব হয়ে উঠেছে। বাংলা কবিতার স্বভাবের শৈথিল্য থেকেও অনেক দূরে রাহুলের কবিতার নির্মাণ আর সৃষ্টির ঘনীভূত রূপ। তার কবিতায় ঘটনার সূত্রে একের পর এক চিত্রকল্পের সমাবেশ ঘটে, কিন্তু প্রায়ই তাদের অভিমুখ বৈপরীত্যের বন্ধনে প্রচলিত অর্থের সংযোগ ছিন্ন করে প্রবেশ করে উপলব্ধির গহিন স্তরে, যেখানে অর্থান্তরের অপরূপ লীলা লাস্য উৎসবের মতো উদযাপিত হচ্ছে। তার কণ্ঠ কখনোই উচ্চকিত নয়, কিন্তু আলংকারিক বৈভবে ঋদ্ধ ও প্রগাঢ়। রাহুলের বয়ানশৈলীর একটা প্রধান গুণ সাংকেতিকতা, কখনো বক্তোক্তি;  শ্লেষ ও  তির্যকতায় তিনি প্রায়শই মনে করিয়ে দেন উৎপল কুমার বসুকে, কিন্তু বয়ানের মুনশিয়ানায় তা শেষ পর্যন্ত রূপান্তরিত হয় এক উত্তরাধিকারে। রাহুল নিজস্ব রসায়নে শৈলীর এমনই  নিজস্বীকরণ ঘটিয়েছেন কবিতার সমস্ত বেলায়।

রাহুলের প্রথম দিককার একটি কবিতা ‘রাত্রি’। সংক্ষিপ্ততায় ও সাংকেতিকতায় একটি নিটোল কবিতা। বাচালতা নেই, নেই বাহুল্য বচন, নেই স্যাঁতসেঁতে আবেগের কুয়াশা, কিন্তু হৃদয়স্পর্শী। তার চেয়ে বড় কথা, শেষ বাক্যে এসে পুরো ঘটনাটিকে কবিতা হিসেবে উপমান করে তোলা।

 

দু’চোখে প্রহর

দু’ঠোঁটে পারদ

 

থার্মোমিটার

তুলো, কাঁচি, আর

 

ওষুধের ঘ্রাণে

দিবস-রজনী

 

কাঁপা কাঁপা হাতে

খুঁজছিলে কাকে-

 

অ্যাই শোনো শোনো

তাকাও এদিকে

 

মনে পড়ে আজও

আমাদের সেই

প্রথম কবিতা!

সংযম ও শিল্পকৌশলে যথাযথতা রাহুলের এক ঈর্ষণীয় শক্তি। রাহুলে কখনো বাহুল্য নেই। তার মধ্যে বাড়তি যেমন কিছু নেই, তেমনি নেই কথার অনটন এতটাই যথাযথ তার নির্মাণ। কিন্তু শৈল্পিক অভিব্যক্তিকে তা উপেক্ষা করেনি কখনো। এক অর্থে রাহুল বাংলা কবিতার সেসব কবিদের উত্তরাধিকার, যারা কবিতায় অলংকারের মহাজন, যেমন রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ দাশ। তাদের কবিতায় রয়েছে অলংকারের জৌলুস। কিন্তু রাহুলে এই অলংকার নিছক প্রত্যক্ষ উপমা থেকে সরে এসে চিত্রনির্মাণের পরোক্ষ তুলনায় রূপান্তরিত হয়েছে।

যেমন- তার ‘ইশারা’ নামক কবিতাটির কথাই ধরা যাক :

তোমাকে বেসেছি ভালো, এই অন্তিমে

 

জেনেছি পথের মোহ আজও নৃত্যরত

আমি তার বধির বাদক

 

চাতুরীর স্পৃহা আজ ছন্দে ভেবেছি

 

সহস্র বুননে জড়িয়ে পড়েছি দেখ

তোমারই বিষাদে, ব্যর্থ কারুবাসনায়

হাহাকার জেগে ওঠে উপত্যকায়

বোবা ও বধির রমণীরা আমাকেই চায়

 

সতর্ক আমার গতি, পায়ে পায়ে ক্ষিপ্র কুকুরেরা

আমাকে সন্দেহ করে, যেন এই সফল শিক্ষারা

 

সাড়া দেহে হাহাকারে, ভাবি দ্রুত, ব্যর্থ হাতঘড়ি

অস্থির এ-গিরিখাত, আমি তার অন্ধ প্রহরী

এই কবিতায় কোথায়ও কোনো উপমা বা প্রতীকের শিখা জ¦ালিয়ে দেননি তিনি, কিন্তু এমন সব ইশারা তিনি ঠেসে দিয়েছেন, যার ফলে কবিতায় উল্লিখিত প্রতিটি বস্তু এক আলংকারিক ইশারায় অর্ধোস্ফুট হয়ে আছে। মনে পড়বে রাহুলের এক কবিতায় ইশারার গুরুত্ব :

নির্জনতা, আজও হায় ইশারামর্মর

 

ইশারাবৃক্ষের নিচে নিদ্রাহীন

                 আমার মুখোশ

রাহুল ইশারাকে- যেমনটা কমলকুমারও বলেছিলেন (‘কথা ইশারা বটে’) এবং চেয়েছিলেন- কথিত বচনে রূপান্তরিত করেন কাব্যিক শর্তগুলো পূরণের মাধ্যমে। রাহুল প্রায়শ বাস্তবতাকে চূর্ণবিচূর্ণ করে কল্পনার রাসায়নিক বিক্রিয়ায় এক পরাবাস্তব জগতে রূপান্তরিত করেন। যুক্তির শাসন ও শৃঙ্খলাকে আগ্রাহ্য করে ভাষা ডানা মেলে উড়ে যেতে থাকে অবচেতনের সেই জগতে, যেখানে বস্তু নিহিতার্থের ঐশ্বর্য্যে তার স্বাধিকার খুঁজে পায়, আর আমাদের দৃশ্যমান জগৎ উল্টো পথে হাঁটতে শুরু করে :

এই যে মস্তিষ্ক রাশি উড়ে চলে দিকচিহ্নহীন

আমি তারই সমর্থনে অক্ষর ভাসাই

 

যে বন্ধুবান্ধবহীন আমি তারে চাই

 

চাই আলো, চাই তেজ, চাই অন্ধকার

বেদনার বহ্নিপুঞ্জ অঙ্গার অঙ্গার

(২০ নম্বর কবিতা, নেশা এক প্রিয় ফল)

এই একই গ্রন্থের ২৮ নম্বর কবিতায়ও আছে এই পরাবাস্তব ঝড়ো হাওয়া :

আনন্দ মৃতের করতল

আঁধার রচিত এই

কুহকের মাঝখানে ডুবে যাই আমি

রাত্রি নামে উন্মাদ করোটি ভেসে চলে ঝরোকার প্রতি

দোলে শিখা, হিমশিখা, ওই ঝরোকা

আকাশরোমাঞ্চ দোলে, অববাহিকায়

আমাদের ক্ষীণস্বর ক্ষীণতর বাতাসে মিলায়

কেন লিখি, বলো তুমি, কেন চাই

(২৮নং কবিতা, নেশা এক প্রিয় ফল)

রাহুল কেন লেখেন, আর কেনই-বা এমনটি চাইছেন তার উত্তর তার কবিতাতেই আছে। ভাষাকে তিনি দুমড়ে মুচড়ে চৈতন্যের সেই ক্ষেত্র  করে তুলতে চান যেখানে তার আগ্রাসী ও আক্রমণাত্মক আঁচড়গুলো স্পষ্ট। তার ভালোবাসা হিংস্রতার মুখোশ পরে, কান্না হয়ে ওঠে আনত বজ্র। রাহুল যখন বলেন :

আমিও তো বহ্নিমান ভাষাকরোটির দাস

আমার সন্ত্রাস চায় ভালোবাসি তাকে

(১৯নং কবিতা, নেশা এক প্রিয় ফল)

পীড়ন ও বঞ্চনা যেন মুক্তি ও অর্জনেরই দিগন্ত হয়ে ওঠে তার কাব্যিক উন্মোচনে। রাহুল আমাদের কবিতায় একেবারেই নতুন এক রূপ ও বয়ানের কারুকৃতি নিয়ে হাজির হয়েছেন, যেখানে সবকিছু বিপরীত দিক থেকে এসে মিলিত হয়। গীতকণ্ঠ কিন্নর তিনি যার স্বরগুচ্ছ পাল্টাস্বরে এই জীবনের অর্থকে উন্মোচনে সবচেয়ে বেশি সাফল্য দেখিয়েছে। 