ভোজ্য তেলের দর স্থিতিশীল রাখতে ভ্যাট ছাড়ের পাশাপাশি সরবরাহ সংকট কাটাতে দাম বাড়ানোর পথে হেঁটেছে সরকার। গত ডিসেম্বরে পণ্যটির বাড়ানোর পরও মেলেনি কোনো সুখবর। উল্টো রমজানের আগে আরেক দফা দাম বাড়তে সরকারের কাছে প্রস্তাব দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। বিপণন কৌশল বদলে খুচরা পর্যায়ে কমিশন কমিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি বাকিতে তেল দেওয়া বন্ধ করা হয়েছে মিলার ও ডিলার পর্যায়ে। এর প্রভাবে পাড়া-মহল্লার দোকানগুলোতে কমেছে বোতলজাত তেলের সরবরাহ। তাই আশঙ্কা করা হচ্ছে, এবার রোজায় তেলের বাজার আরও পিচ্ছিল হয়ে উঠতে পারে।
জানা যায়, দেশে বছরে ভোজ্য তেলের চাহিদা রয়েছে প্রায় ২২ লাখ টন। এর বড় অংশ আমদানি করে মেটানো হয়। পাশাপাশি সরিষা, তিল, বাদাম বা সূর্যমুখীর মতো কিছু বীজ থেকেও তেল উৎপাদন করে থাকে। আমদানি ও উৎপাদন দুই-ই নিয়ন্ত্রণ করে থাকে সাত-আটটি কোম্পানি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই মুহূর্তে দেশে ভোজ্য তেলের ঘাটতি নেই। চাহিদার চেয়ে বেশি তেলের মজুদ রয়েছে। কিন্তু আসন্ন রোজা সামনে রেখে ভোজ্য তেলের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বাজার অস্থির করে তোলার চেষ্টা করছেন ব্যবসায়ীরা।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্যে দেখা যাচ্ছে, গত নভেম্বর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত তিন মাসে রেকর্ড অপরিশোধিত সয়াবিন তেল ও বীজ আমদানি হয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে অপরিশোধিত সয়াবিন তেল খালাস হয়েছে ২ লাখ ৩২ হাজার টন এবং সয়াবিন বীজ আমদানি হয়েছে ৩ লাখ টন।
এদিকে রাজধানীর খুচরা বাজারগুলোতে ঘুরে ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বাজারে ভোজ্য তেলের সরবরাহ একেবারেই নেই। দুয়েকটি কোম্পানি তেলের সরবরাহ করলেও তা চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত নয়। তাছাড়া কোম্পানিগুলোর প্রতিনিধিরা দোকানিদের বোতলের গায়ের দামে তেল কিনতে বাধ্য করছেন। তাতে খুচরা ব্যবসায়ীরাও বাধ্য হয়ে লিটারপ্রতি অতিরিক্ত দামে ভোজ্য তেল বিক্রি করছেন।
কারওয়ান বাজার ও মহাখালী কাঁচাবাজারে বোতলজাত প্রতি লিটার সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে ১৭৫ থেকে ১৮০, দুই লিটার ৩৫০ থেকে ৩৫৫ ও পাঁচ লিটার ৮৫০ টাকার কিছুটা বেশি দামে।
অন্যদিকে প্রতি ব্যারেলে ২০০ টাকা বেড়ে প্রতি কেজি খোলা সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে ১৮৫ এবং প্রতি লিটার খোলা পাম তেল ও সুপার প্রতি কেজি ১৭৫ টাকায়।
মহাখালী বাজারের জিয়া জেনারেল স্টোরের বিক্রয়কর্মী জাবেদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, কোনো কারণ ছাড়াই বাজারে ভোজ্য তেলের সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে। হাতেগোনা দুই-তিনটি কোম্পানি তেলের সরবরাহ রাখলেও মোড়কের দামেই তারা দোকানিদের কাছে বিক্রি করছে। এসব তেল বিক্রি করতেও লিটারপ্রতি ৫ থেকে ১০ টাকা বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।
এদিকে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম দুই মাসেই দেশের মানুষকে ভোগ্যপণ্যের দাম নিয়ে সব থেকে বেশি ভুগতে হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে নানা পদক্ষেপেও এর সুষ্ঠু সমাধান আসেনি। উল্টো সরকার নানা পণ্যের সংকট কাটাতে সয়াবিন তেল আমদানি পর্যায়ে শুল্কছাড় দেয়। তাতেও বাজারে সংকট না কাটলে গত ৯ ডিসেম্বর সয়াবিন তেলের দাম প্রতি লিটারে ৮ টাকা বাড়ানোর ঘোষণা দেয় সরকার। তাতেও সংকট কাটেনি।
এ বিষয়ে কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন দেশ রূপান্তরকে বলেন, দেশের প্রতিযোগিতামূলক বাজার এখনো গড়ে ওঠেনি। তা না হলে একই পন্থায় বারবার কেন ভোগ্যপণ্যের বাজার অস্থিতিশীল হবে? এ ক্ষেত্রে সরকারের সংস্থাগুলোর দায়িত্বশীলতার অভাব রয়েছে।
তিনি বলেন, বাজারে একাধিক সংস্থা তদারকি করে। কিন্তু ভোক্তা এ থেকে কোনো সুফল পাচ্ছে না। পণ্যের দাম বাড়লেই কর্মকর্তারা অভিযান পরিচালনা করেন। কিন্তু যে স্তরে কারসাজি হয়েছে সেই স্তরে মনিটরিং হয় না। ফলে অসাধুরা এই সুযোগে ভোক্তাকে বেশি করে নাজেহাল করে তোলে। এখন পুরনো কায়দায় রোজার বাজার অস্থিতিশীল করতেই বাজারে তেলের সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে।
অবশ্য গত সোমবার বাণিজ্য এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দিন খুলনার এক অনুষ্ঠানে দাবি করেছেন, ভোজ্য তেলের অস্থিরতা নিরসনে কাজ করছে সরকার। বন্দর থেকে শুরু করে খাতুনগঞ্জ সবখানেই তেলের মজুদ যাচাই-বাছাই ও মনিটরিং চলছে। এক সপ্তাহের মধ্যে ভোজ্য তেলের অস্থিরতা কেটে যাবে বলে আশা করছি।