ছাতিম ফুল এবং এক কাপ চা

‘চলো যাই’ বাতাসে দোল খাওয়া রোগা কলাগাছের পানসে সবুজ পাতার ফিনফিনে তরঙ্গ উপচে কথাটি এসে তার কর্ণবিবর দিয়ে ঢুকে সরাসরি করোটিতে আস্তানা করে নিল।

কলাগাছের দক্ষিণ পাশে মজা পুকুরের তলানিতে সামান্য জল;যেন বা ঝুনা নারকেলের দূষিত পানিতে মেঘে ঢাকা ঘোলা চাঁদ; ক্ষয়ে যাওয়া পদ্ম যারা কি না চাঁদের অপেক্ষায় ফিঙের লেজের পুচ্ছের মতো খাড়া করে রেখেছে কয়েকটি চিকন কলি, তাদের প্রস্ফুটিত হওয়ার বাসনা ক্ষীণতর হয়ে এসেছে, হয়তো কোনো দিন আর ফোটাও হবে না!

এদিকে উত্তর পাশে, ছাতিম গাছ কয়েকটি; শুধু ছাতিম নয়, সেগুন, মেহগনি, তেঁতুল এবং শিউলিও। শিউলি গাছটি একেবারে তার জানালা লাগোয়া।  

যদিও প্রতিটি গাছ তার নিজের হাতে লাগানো তবু মনে হয়, ছাতিমের প্রতি তার দুর্বলতা অপেক্ষাকৃত প্রবল। ছাতিম বাদে অন্য গাছগুলো তাদের গুণের কারণে নিজেদের অবস্থান পোক্ত করে নিয়েছে পরিবেশের কাছে। দিন দিন তাদের কদরও বেড়ে চলেছে বেশ। তবে তার কাছে এখন ছাতিমই প্রিয়। কেননা শিউলির কোমল সুগন্ধ মনের ভাব জাগানো তো দূরে থাক, হাল্কা নাড়া দিতেও অক্ষম; কিন্তু কড়া লিকারে ছাতিমের ঝাঁজাল গন্ধ মিশে যখন অভিনব একটি স্বাদের জ¦লন্ত ধাবমান ধারা পান-চুন-দোক্তার দহনে আস্তরণ পড়া ও মিথ্যা-সত্যের বয়সী জিহ্বা চুইয়ে পেটের তলানিতে ঢোকে তখন তার মধ্যে এমন এক শিহহরণ বয়ে যায়, পারলে ছাতিম গাছের নগ্ন দেহটাকে জড়িয়ে ধরে সে।

প্রতিদিনের মতো আজও সে চা খাচ্ছিল ছাতিম ফুলের কড়া ঝাঁজাল সুগন্ধ মিশিয়ে। কিন্তু মজা পুকুরের পাড় ডিঙিয়ে, কলাপাতা কাঁপিয়ে এলো কথাটি ‘চলো যাই!’ তাই অশীতিপর বৃদ্ধের চোখে এই ছিলছিলে সন্ধ্যাটি হয়ে উঠল ভয়াবহ নিকষ-কালো-অন্ধকার। চায়ের কাপ তার হাতে ধরা এখন, ঠোঁট পর্যন্ত উঠছে না; কলাগাছের ঝোপ কিংবা মজা পুকুর ঘাটে কোনো ছায়ামূর্তি দেখার জন্য তার চোখ দুটো সজাগ; ঝাপসা চোখ আঁতিপাঁতি করতে লাগল কলাগাছের ঝোপ পেরিয়ে ময়লা-চাঁদের ভাঙা-চোরা পাহাড়-পর্বত পর্যন্ত; তেঁতুল গাছের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পাতা পর্যন্ত ‘কে?’

তার মুখে উচ্চারিত কম্পমান ‘কে’ ধ্বনির তোঁতলা আলোড়নে ফিনফিনে বাতাসের পরিবর্তে তেজস্বী দমকা হাওয়ায় কলাপাতা পতপত করে উঠল, ঝুরঝুর করে ঝরে পড়ল একঝাঁক ধূসর তেঁতুলপাতা; ঢেকে দিল কাপের চা তেঁতুল পাতাকে সিঁথান বানিয়ে কাপের চা মজা পুকুরের এক চিলতে ঘোলা জলের মতো শান্ত-শিষ্ট তন্দ্রায় ঢলে পড়ল কিন্তু সে সবে তার খেয়াল নাই।

সে ভাবল, কথাটি পুনরায় শোনা যাবে তাই অর্ধ-অকেজো কান জোড়া ভয় পাওয়া হরিণী কিংবা সিঁদেল চোরের মতো খাড়া করে রাখল কিছুক্ষণ। কান খাড়া করে রাখায় থলথলে ও ঢিলে-ঢালা কানের লতিটি শক্ত চোয়ালের শেষ প্রান্ত রেখায় ছোঁয়া লাগলে সে হাল্কা সুড়সুড়ি অনুভব করল বটে, কিন্তু ওই পর্যন্তই, চুলকানো আর হয়ে উঠল না।

তেঁতুল গাছের মগডালে ছায়ান্ধকারের ঘূর্ণি দেখা যাচ্ছে। দমকা হাওয়ায় একটি ডালের সঙ্গে অন্য ডালের টক্কর লাগলে ছায়া-মূর্তির আদল ভেঙে যায়; তবে ডালগুলো আবার একত্রিত হলে ছায়ামূর্তি জোড়া লাগে।                       

‘চলো যাই’ কথাটি কেমন ছিল? মনে মনে সে নিজেই নিজের কাছে প্রশ্ন করল।    

প্রথমে মনে হলো ইশকুলে যাওয়ার জন্য তার বাবা তাকে তাড়া দিচ্ছে। বাবা যাবে পাট কিনতে, পোদ্দার হাটে। যাওয়ার পথে ফুলচান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দিয়ে যাবে শিশুপুত্রকে। বাবা ঠিক এভাবেই বলত, ‘চলো যাই!’ বাবার সঙ্গে ইশকুলে যেতে ভালো লাগত তার। ভালো লাগার অন্যতম প্রধান কারণ ছিল ছাতার নিচে বাবার হাত ধরে যেতে যেতে কোনো কোনো দিন অকস্মাৎ সে তার বাবার ঘিয়ে রঙের খাটো পাঞ্জাবির পকেট হাতড়ে ২/১ আনা পয়সা নিমেষে চালান করে দিত নিজের পকেটে। বাবা কিচ্ছুটি টের পেত না অথবা টের পেলেও কিছু বলত না।

বাবার মুখটি দেখার জন্য সে তেঁতুল গাছের ঝুপড়ি ডালের দিকে তাকাল। কিন্তু নিকষ-কালো অন্ধকার কেটে বাবার মুখটি বের করে আনা কষ্টকর। তা ছাড়া কীভাবে আনবে, সে তো মারা গেছে সেই ১৯৪০ সালে; মেলা দিন আগের কথা, হয়তো সে কারণে তার চেহারাটা পুরোপুরি এসেও আসছে না, ধরা দিয়েও দিচ্ছে না।

নাহ! বাবার মুখটি দেখা গেল না। তাহলে কে? মা? না, তাও না। এমনকি দাদা-দাদি, নানা-নানি, চাচা-চাচি? না, তারা কেউ নয়। তাদের কারও কণ্ঠস্বরই এ রকম ছিল না।

সে আর কী করবে, উপায়ান্তহীন হয়ে ধীরে ধীরে তেঁতুল গাছের তলে বসে পড়ল।

বাতাসের সঙ্গে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছে এখন।

তাকে দেখে কিংবা মজা পুকুরের ঘোলা জলে অতিষ্ট হয়ে, কলাগাছের ঝোপ ডিঙিয়ে উঠে এলো একঝাঁক ব্যাঙ। ব্যাঙগুলো তেঁতুল গাছের নিচে জড়ো হলো এসে। কোনো শব্দ নাই, নড়াচড়া নাই যেনবা তাদের ভেতর থেকে কোনো একজন নেতা কথা বলবে কিংবা তারা এতকাল ওই মজা পুকুরে থেকে খুব পাপ করেছে, তাই প্রায়শ্চিত্ত করবে এখন। কিংবা অন্যকিছু।

তার ঝাপসা চোখ সপ্রতিভ করতে গেলে আরও ঝাপসা হয়ে গেল। ব্যাঙগুলোর অবস্থা এমন যেন বা তাকে দেখতে পায়নি আর দেখতে পেলেও তাদের কিছু যায়-আসে না।

সে ঝাপসা চোখে অগণিত ব্যাঙের আর্তি দেখতে লাগল। 

ওদিকে কলাগাছের ঝোপের পশ্চিম দিকে আর এক কাণ্ড।

একদল ন্যাংটো নারী-পুরুষ পলো, জাল ইত্যাদি নিয়ে মাছ ধরতে যাচ্ছে। ন্যাংটো নারী-পুরুষ দেখে সে আঁতকে উঠল এবং সঙ্গে সঙ্গে কচলে নিল চোখ দুটো। কিন্তু তাদের দিকে তাকিয়ে থেকে সে কিছুই ঠাহর করতে না পেরে শেষে হাত ইশারায় একজনকে ডাকল; তবে যাকে ডাকল সে তাকে দেখেও দেখল না কিংবা পাত্তা দিল না কিংবা দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানোর তাড়া বোঝাল। কাঁধের ওপর পলো-জাল ইত্যাদি ঝুলিয়ে সারিবদ্ধ নারী-পুরুষের দল যতক্ষণ না অদৃশ্য হয়ে গেল ততক্ষণ সে এক দৃষ্টিতে তাদের দিকে তাকিয়ে রইল। 

ওই দৃশ্য দেখা শেষ হলে সে আবার তাকাল তেঁতুল গাছের দিকে। না, কোনো ছায়ামূর্তি নাই; কিন্তু সে আশাহত হলো না; তার মনে হতে লাগল, ব্যাঙগুলোও তার মতো কোনো ছায়া-মূর্তি দেখার জন্য উৎসুক হয়ে আছে।

ব্যাঙগুলো এবার লাফিয়ে লাফিয়ে তেঁতুল গাছে চড়ার চেষ্টা করতে লাগল। কিন্তু কতকটা ওপরে ওঠার পর ধপাশ ধপাশ পড়ে যেতে লাগল মাটিতে। কার আগে কে উঠতে পারে এই নিয়ে যেন প্রতিযোগিতা চলছে তাদের মধ্যে। এভাবে জড়াজড়ি করতে করতে একটি ব্যাঙ ছিটকে এসে তার গায়ে পড়লে সে ভয় পেয়ে ছাতিম গাছের আড়ালে দাঁড়াল। 

এরই মধ্যে সে দেখতে পেল, ব্যাঙগুলোর দিকে তেড়ে আসছে নানা প্রজাতির গোখরা, দুধরাজ, পঙ্খিরাজ, ঢোঁড়া, দাড়াস, পদ্মগোখরো, অজগর, সুতানলী এ রকম হাজার হাজার, লাখ লাখ, কোটি কোটি সাপ। ব্যাঙ দেখে তাদের হুঁশ নাই। কতকাল ধরে তারা ক্ষুধার্ত; কে কার আগে ব্যাঙ খেতে পারবে সে জন্য একেকটা সাপ একেকটার নিচ দিয়ে, ওপর দিয়ে গড়াগড়ি তথা পাল্লাপাল্লি করে ধেয়ে আসতে লাগল।

সাপের ফোঁস ফোঁস শব্দে দমকা হাওয়ায় শক্তি বাড়তে লাগল যেন বা।

সে একটু পিছিয়ে এলো কিংবা তাকে কেউ ঠেলে পেছনে পাঠাল।

তার চোখ ভুল দেখল কি না কে জানে, হঠাৎ সে দেখতে পেল ব্যাঙগুলো আস্ত একেকটা সাপ গিলে খাচ্ছে।

সাপগুলো তখন অসহায়-নিরুপায়, জান বাঁচানোর জন্য মরিয়া; পড়িমরি করে পালানোর পথ খুঁজতে লাগল।    

সে এক পা-দুপা করে সেদিকে এগিয়ে গেল।

কিন্তু অকস্মাৎ তাকে দেখতে পেয়ে তার দিকে তেড়ে আসতে লাগল সাপগুলো। সঙ্গে সঙ্গে সে আত্মরক্ষার জন্য একটি ভাঙা ডাল হাতে তুলে নিল। আর তখনই তার হাতের ঠাণ্ডা চায়ের কাপটি টুং করে পড়ে গেল মাটিতে।

সে দেখতে পেল, নিকষ-অন্ধকার ভেদ করে ছাতিম গাছের ঝুপড়ি ডাল থেকে একটি পেঁচা তার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে! 