গুচ্ছ জোটে বিব্রত রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ীরা

চার থেকে পাঁচজনের একটি গ্রুপ। এই গ্রুপটি চট্টগ্রাম শহরের বিভিন্ন এলাকায় জায়গা কিনতে ৩০ থেকে ৪০ জনের একটি জোট গঠন করে। চাহিদা অনুযায়ী জায়গা পাওয়া গেলে জোটের প্রত্যেকের নামে জায়গা রেজিস্ট্রি হয়ে যায়। পরে ভবন নির্মিত হয়ে গেলে চুক্তি অনুযায়ী কেউ একটি আবার কেউবা একাধিক ফ্ল্যাটের মালিক হন। তবে ভবন নির্মাণের কাজটি কিন্তু করে থাকে প্রথম গ্রুপটি (চার থেকে পাঁচজনের)। আবার কখনো কখনো চার থেকে পাঁচজনের সঙ্গে যাদের নামে রেজিস্ট্রি হয়, তাদের মধ্য থেকে এক বা একাধিক সদস্য নিয়েও একটি কমিটি গঠন হয়। সেই কমিটি ভবন নির্মাণের কাজটি সম্পন্ন করে। এভাবে সমবায় পদ্ধতিতে নির্মিত হতে যাওয়া ফ্ল্যাটের মালিক হতে কি আইনগত কোনো সমস্যা আছে?

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের ইমারত নির্মাণ বিধিমালা অনুযায়ী

প্রকৃতপক্ষে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু তারপরও এভাবে ভবন নির্মাণের বিরুদ্ধে রিয়েল এস্টেট হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব) সিডিএ, কর অফিস, ভ্যাট অফিসসহ সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দিয়ে আসছে। এ বিষয়ে খোঁজ নিতে গিয়ে দেখা যায়, সমবায় পদ্ধতিতে নির্মিত গ্রুপের প্রত্যেকের নামে জায়গাটি রেজিস্ট্রি করে। রেজিস্ট্রিকৃত জায়গায় একটি বহুতল ভবন নির্মিত হয় এবং প্রত্যেক অংশীদার একটি করে ফ্ল্যাটের মালিক হচ্ছেন। এতে ফ্ল্যাটের দাম অনেক কম পড়ছে। বর্তমানে এই পদ্ধতি জনপ্রিয় হয়ে যাওয়ায় নগরীর অনেক এলাকায় এভাবেই গড়ে উঠছে ফ্ল্যাট সংস্কৃতি। নগরীর আসকারদীঘির পাড়ে পাহাড়ের মধ্যে গড়ে ওঠা বহুতল ভবনটির জায়গা ৯২ জনের নামে, এ ছাড়া হেমসেন লেনে সম্প্রতি চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) একটি ভবনের অনুমোদন বাতিল করেছে। রিমা কনভেনশনের জায়গাটিও স্বপ্নীল আবাসন নামে একটি গ্রুপের নামে। এ ছাড়া নগরীর চট্টেশ^রী রোডে ম্যাকিন্স হিল নামের জায়গায় কিনে প্রকল্প নিয়েছে এমন একটি গ্রুপ, বহদ্দারহাট, কাতালগঞ্জ, বাকলিয়া এক্সেস রোডসহ বিভিন্ন এলাকায় এমন জোটবদ্ধ ভবন গড়ে উঠছে।

এতে সমস্যা প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে রিহ্যাব ভাইস প্রেসিডেন্ট ও চট্টগ্রাম রিজিওনের চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এই জোটের কারণে রিয়েল এস্টেট খাত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। জোটবদ্ধভাবে ভবন করে নিজেরা দুই বা তিনটি করে ফ্ল্যাট পায়। একটি রেখে বাকিগুলো সাধারণের কাছে বিক্রি করছে। এটা এক ধরনের ব্যবসা। এই ব্যবসা করতে গিয়ে তারা সরকারকে কোনো ধরনের ভ্যাট, ট্যাক্স দেয় না। বিপরীতে আমরা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে সরকারের নানা লাইসেন্স, পরিবেশ সনদ, ফায়ার সার্ভিস সনদ, উৎসে কর, ক্রয় করসহ নানা উৎস থেকে অর্জিত সব অর্থের ভ্যাট ট্যাক্স সরকারকে দিচ্ছি। সিডিএর আইনগুলো মেনে চলছি।’

তিনি আরও বলেন, কিন্তু এই গুচ্ছভাবে নির্মিত ফ্ল্যাটের মালিকদের কোনো ধরনের ভ্যাট ট্যাক্স দিতে হচ্ছে না। এতে রাষ্ট্র আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

এ বিষয়ে সবচেয়ে জোরালো যুক্তি উপস্থাপন করে এপিক প্রপার্টিজের পরিচালক প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমরা একটি ফ্ল্যাট নির্মাণ করতে গিয়ে অনেক ধাপে সরকারকে ভ্যাট ট্যাক্স দিয়ে থাকি। কিন্তু এই পদ্ধতিতে জমি রেজিস্ট্রি হলে পরে আর ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রি করতে হয় না। এতে সরকার বিপুল রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘শুধু ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রি নয়, ফ্ল্যাট নির্মাণে বিভিন্ন উপকরণ কেনার সময়ও সরকারকে ট্যাক্স দেওয়া নিশ্চিত করা হয়। আমরা কোম্পানিকে বিল দেওয়ার সময় ভ্যাট ট্যাক্স কেটে বিল দিয়ে থাকি, যা সরকারি কোষাগারে জমা হয়।’

চট্টগ্রামে রিয়েল এস্টেট শিল্পে অন্যতম ব্যক্তিত্ব ইকুইটি প্রপার্টি ম্যানেজমেন্ট লিমিটেডের চেয়ারম্যান আইনুল হক বলেন, এসব গুচ্ছের কারণে নগরীতে অপরিকল্পিতভাবে ভবন গড়ে উঠছে। আমরা যেখানে শতভাগ সিডিএর আইন মেনে ভবন নির্মাণ করি, সেখানে এসব গুচ্ছ বিনিয়োগকারীরা ভবন নির্মাণ করেই দায়িত্ব শেষ করে। তাদের কোনো দায়বদ্ধতা নেই।

তিনি আরও বলেন, ‘পরিকল্পিত আবাসন নিশ্চিত করতে সবাইকে একই প্ল্যাটফর্মের আওতায় আসতে হবে। আর রিয়েল এস্টেট আইন অনুযায়ী কিন্তু রিয়েল এস্টেটের সদস্যের বাইরে কেউ প্লট বা ফ্ল্যাট বিক্রি করতে পারে না।’

গুচ্ছ প্রক্রিয়ায় কারা ভবন নির্মাণ করছে?

নগরীতে গুচ্ছ প্রক্রিয়ায় ভবন নির্মাণ সাশ্রয়ী মূল্যে ফ্ল্যাটের মালিক হওয়ার একটি প্রক্রিয়া। শিক্ষক, ব্যাংকার, আইনজীবী, ব্যবসায়ী, পুলিশ প্রশাসনসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ একত্র হয়ে একটি জায়গা কিনে ভবন নির্মাণ করে। পরে তারা ওই ফ্ল্যাটগুলো নিজেদের মধ্যে আনুপাতিক হারে ভাগ করে নেয়। এই পদ্ধতিতে ফ্ল্যাটের রেজিস্ট্রেশন করতে হয় না। এ ছাড়া নিজেরা জায়গা কিনে ভবন নির্মাণ করে বলে সাশ্রয়ী দামে ফ্ল্যাট পাওয়া যায়।

এতে সমস্যা কোথায়? এ বিষয়ে সিডিএর ইমারত নির্মাণ কমিটির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী এ জি এম সেলিম বলেন, সিডিএর ইমারত নির্মাণ আইনে এসব বিষয়ে কোনো বিধিনিষেধ নেই। নিয়ম মেনে যে কেউ ভবনের নকশা অনুমোদন করিয়ে নিতে পারবে। জায়গা ও সামনের রাস্তা আনুপাতিক হারে বিধি অনুযায়ী চাহিদার চেয়ে কম ফ্ল্যাট পায়। কিন্তু তারা অনৈতিক আশ্রয় নিয়ে বেশি ফ্ল্যাটের অনুমোদন নেন এবং নগরীতে অপরিকল্পিত নগরায়ণ দুর্ভোগকে ত্বরান্বিত করছে।