চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে কার কেমন সম্ভাবনা

আইসিসি চ্যাম্পিয়নস ট্রফি মাঠে গড়াতে বাকি আছে আর মাত্র ২ দিন। অংশগ্রহণকারী ৮ দলই নিজেদের ঝালিয়ে নিচ্ছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে। দলগুলোর আদ্যোপান্ত শক্তি আর দুর্বলতা নিয়ে সামীউর রহমান মাহিদের দুই পর্বের বিশেষ আয়োজনে আজ থাকছে ‘এ’ গ্রুপের ৪ দলের বিশ্লেষণ।

নিউজিল্যান্ড-নাইরোবি কি ফিরবে

২০০০ সালে কেনিয়ার নাইরোবিতে আসরের ফাইনালে ভারতকে হারিয়ে শিরোপা জিতেছিল নিউজিল্যান্ড। সাদা বলের ক্রিকেটে নিউজিল্যান্ডের সবচেয়ে বড় সাফল্য। দুইবার ওয়ানডে বিশ্বকাপের ফাইনাল আর একবার টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের রানার্সআপ ব্ল্যাকক্যাপরা, আইসিসি চ্যাম্পিয়নস ট্রফির ফাইনালেও ২০০৯ সালে তারা হেরেছিল চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী অস্ট্রেলিয়ার কাছে। ক্রিকেটকে কেন ভদ্রলোকের খেলা বলা হয়, সেটা বোঝা যায় নিউজিল্যান্ডের ক্রিকেটারদের দেখলে। তারকা সংস্কৃতি নেই, বিতর্ক নেই, বাড়তি কোনো আবদারও নেই। চমৎকার, সুশৃঙ্খল ক্রিকেট খেলা দলটা কেন যেন শেষ ধাপটা অতিক্রম করতে পারে না। এইবারের চ্যাম্পিয়নস ট্রফির আগে নিউজিল্যান্ড ত্রিদেশীয় সিরিজ জিতেছে পাকিস্তানের মাটিতে।

নিউজিল্যান্ড দলের বড় শক্তি, তাদের বেশিরভাগ ব্যাটসম্যানই স্পিন খেলায় দারুণ পারদর্শী। ভারতের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজ জিতে অসাধ্য সাধন করার মতো কাজ কিউইরা করেছে ২০২৪ সালে। এবার পাকিস্তানের মাটিতে ওয়ানডের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আসর জেতাটাও হতে পারে সেই সাফল্যেরই ক্রমধারা। ক্যারিয়ারের প্রান্তসীমায় পৌঁছে যাওয়া কেন উইলিয়ামসনের জন্য যা হতে পারে অসাধারণ এক উপহার। ডেভন কনওয়ে, কেন উইলিয়ামসন, রাচিন রবিন্দ্র, ড্যারিল মিচেল, গ্লেন ফিলিপসদের নিয়ে চমৎকার ব্যাটিং লাইন-আপ, সঙ্গে ম্যাট হেনরি, লকি ফার্গুসন, উইল ও রুর্কদের নিয়ে গড়া কার্যকর পেস বোলিং। স্পিনে মিচেল স্যান্টনার, মাইকেল ব্রেসওয়েলদের পাশাপাশি ফিলিপস, রাচিনরাও হাত ঘোরাবেন। চমৎকার ভারসাম্যপূর্ণ দল, আত্মবিশ্বাসও তুঙ্গে। এই দলটার সামর্থ্য আছে শিরোপা জেতার, দরকার একটু ভাগ্যের সহায়তা।

গ্রুপ পর্বে ম্যাচ :  ১৯ ফেব্রুয়ারি-পাকিস্তান

২৪ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ, ২ মার্চ-ভারত

সম্ভাব্য ফল : অন্তত সেমিফাইনাল

পাকিস্তান-নিজ ঘরে পরবাসী

যে কোনো আইসিসি আসরে দর্শকদের সবচেয়ে বেশি চাহিদা থাকে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচকে ঘিরে। পাকিস্তান স্বাগতিক কিন্তু ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ খেলতে তাদের যেতে হবে দুবাই। পাকিস্তান যদি ফাইনালেও ওঠে আর প্রতিপক্ষ যদি ভারত হয়, তাহলে সেই ফাইনালটাও হবে দুবাইতে। পাকিস্তান স্বাগতিক অথচ নিজের দেশের মানুষ সবচেয়ে রোমাঞ্চকর দ্বৈরথটাই দেখতে পাবে না মাঠে বসে! এমন অদ্ভুত মারপ্যাঁচে আটকে আছে পাকিস্তানের চ্যাম্পিয়নস ট্রফির সূচি। শুধু তাই নয়, যে নিউজিল্যান্ডের কাছে তারা হেরেছে দেশের মাটিতে হয়ে যাওয়া ত্রিদেশীয় সিরিজে, তাদের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়েই শুরু হচ্ছে চ্যাম্পিয়নস ট্রফি অভিযান। ব্যাটিংটা কমজোরি। বাবর আজমের ব্যাটে রান নেই। সাউদ শাকিল, আগা সালমান, তৌয়ব তাহিররা এখনো আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পায়ের নিচে শক্ত জমিন খুঁজে পাননি। তাদের পারফরম্যান্সও শেয়ার বাজারের মতোই ওঠানামা করে। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ৩৫২ রান তাড়া করে জেতার পরের ম্যাচেই তাই পাকিস্তান ২৪২ রানে অলআউট হয়ে যেতে পারে। বোলিংয়ে তাও ব্যাটসম্যানদের মনে ভয় ধরানোর মতো কিছু নাম আছে। শাহিন শাহ আফ্রিদি, নাসিম শাহ, হারিস রউফদের পেস আক্রমণকে সমীহ করতেই হয়। তবে হালফিলে তাদের বলে শুধু পেসই আছে, লাইন-লেন্থ উবে গেছে। প্রচুর শর্ট অব লেন্থ বল করার প্রবণতা পাকিস্তানের বোলারদের, যা নির্বিষ উইকেটে কেবলই রানই বিলিয়ে দিচ্ছে। স্পিন বিভাগ সবচেয়ে দুর্বল। কোনো বিশেষজ্ঞ স্পিনার নেই; আবরার আহমেদ, সালমান আলি আগা আর খুশদিল শাহদের নিয়ে গড়া জোড়াতালির স্পিন আক্রমণে ধার নেই। তাই তো কিউই আর প্রোটিয়ারা দেদার রান করেছে পাকিস্তানে এসে।

গ্রুপ পর্বে ম্যাচ : ১৯ ফেব্রুয়ারি-নিউজিল্যান্ড

২৩ ফেব্রুয়ারি-ভারত, ২৭ ফেব্রুয়ারি-বাংলাদেশ

সম্ভাবনা : সেমিফাইনালে উত্তরণই কঠিন

ভারত-সব বিভাগেই এ প্লাস

সীমিত ওভারের ক্রিকেটে এশিয়ার ভেতরে ভারত বরাবরই শিরোপার শক্ত দাবিদার। তাদের ব্যাটিং গভীরতা, বোলিং বৈচিত্র্য আর তুখোড় ফিল্ডিং যে কোনো সময়েই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। এবারের আইসিসি চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে ভারত তাদের সবগুলো ম্যাচই খেলবে দুবাইতে। মরু শহরের উইকেট ও কন্ডিশন মাথায় রেখেই ভারতের নির্বাচকরা ১৫ সদস্যের দলে নিয়েছেন ৫ জন স্পিনার। লেগস্পিনার বরুণ চক্রবর্তী, বামহাতি চায়নাম্যান কুলদীপ যাদব আর সঙ্গে ৩ বোলিং অলরাউন্ডার অক্ষর প্যাটেল, রবীন্দ্র জাদেজা এবং ওয়াশিংটন সুন্দর। পেস বিভাগে জসপ্রিত বুমরা না থাকায় ধারটা কমে গেছে ঠিকই, তবে আর্শদীপ সিং, হারশিত রানা ও মোহাম্মদ সামির সঙ্গে পেস বোলিং অলরাউন্ডার হার্দিক পান্ডের মিডিয়াম পেসও হতে পারে কার্যকর।

বরাবরের মতোই ভারতের মূল শক্তি ব্যাটিং। চ্যাম্পিয়নস ট্রফি খেলতে আসার আগে দেশে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজ ৩-০ তে জিতেছে ভারত। ৩০০ রান তাড়া করা ভারতের ব্যাটসম্যানদের কাছে রীতিমতো ছেলেখেলা। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম ওয়ানডেতে তারা ২৪৮ রান তাড়া করে জিতেছে ৩৯ ওভারে, পরের ম্যাচে ৩০৪ রান তাড়া করে জিতেছে ৪৫ ওভারে। অধিনায়ক রোহিত শর্মা, শুবমান গিল, শ্রেয়াশ আইয়ার; প্রত্যেকেই আছেন দারুণ ছন্দে। তাদের পাশে বিরাট কোহলিকেই দেখাচ্ছে বেমানান, সবশেষ ওয়ানডে বিশ্বকাপে নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে সেঞ্চুরির পর ৭ ইনিংস ধরে যে বড় রান নেই তার ব্যাটে। তবে বড় ম্যাচের খেলোয়াড় কোহলি বড় মঞ্চে যে দেখিয়ে দেবেন নিজের সামর্থ্যটা, সেই ভরসা তার ওপর আছে টিম ম্যানেজমেন্টের। যার প্রমাণ দিয়েছেন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে।

গ্রুপ পর্বের ম্যাচ : ২০ ফেব্রুয়ারি-বাংলাদেশ

২৩ ফেব্রুয়ারি-পাকিস্তান, ২৫ ফেব্রুয়ারি-নিউজিল্যান্ড

সম্ভাব্য ফল : ফাইনালিস্ট

বাংলাদেশ-নিধিরাম সর্দার

অর্থনীতির ভাষায়, কোনো ক্রেতা যদি কোনো পণ্য বা সেবার জন্য মূল্য পরিশোধ করতে প্রস্তুত থাকে, তবে তাকে চাহিদা বলে। যে কারণে ভিখারির ব্যক্তিগত উড়োজাহাজ কেনার ইচ্ছা চাহিদা নয়। বাংলাদেশের কোচ ফিল সিমন্স এবং অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত চ্যাম্পিয়নস ট্রফির শিরোপা জয়ের জন্যই খেলতে যাচ্ছেন, এমনটাই বলেছেন সংবাদ সম্মেলনে। তবে তাদেরটা ইচ্ছে হয়েই থাকছে, চাহিদা আর হয়নি কারণ তাদের ইচ্ছের পক্ষে কোনো সামর্থ্যরে প্রমাণ এখনো পর্যন্ত নেই।

সবশেষ আইসিসি আয়োজিত ওয়ানডে আসর ছিল ২০২৩ সালের বিশ্বকাপ। সেখানে বাংলাদেশ ৯ ম্যাচের ভেতর হেরেছে ৭ ম্যাচে। হারের ব্যবধানও বিশাল। পাকিস্তানের কাছাকাছি কন্ডিশনের দুবাইতে আফগানিস্তানের কাছে ওয়ানডে সিরিজ হেরেছে ২-১ ব্যবধানে। দলে অভিজ্ঞতাকে অতিমূল্যায়িত করতে গিয়ে তারুণ্যকে উপেক্ষা করতে করতে দলে ভারসাম্য নেই। উদ্বোধনী জুটিতে তানজিদ তামিমের সঙ্গে সম্ভাব্য ক্রিকেটারটির নাম সৌম্য সরকার, যার প্রতিভার বহিঃপ্রকাশের চেয়ে অপচয়ের উদাহরণই বেশি। ব্যাকআপ পারভেজ হোসেন ইমন যার ওয়ানডে অভিষেকই হয়নি। অভিজ্ঞতার বুলি আউড়ে মুশফিক-মাহমুদউল্লাহরা এখনো খেলছেন, যে কোনো বিশ্বমঞ্চই যেন তাদের বিদায়ের মঞ্চ! বোলিং আক্রমণে মোস্তাফিজুর রহমানকে কেন রাখা হলো সে এক বিস্ময়। এর বাইরে তাসকিন আহমেদ, নাহিদ রানা ব্যাটসম্যানদের চমকে দিতে পারেন।  ঢাল-তলোয়ারবিহীন নিধিরাম সর্দার বা ছায়ার সঙ্গে তলোয়ার যুদ্ধ করা ডন কিহোতের মতোই। সব মিলিয়ে এবারের চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে বাংলাদেশকে নিয়ে আশাবাদী নন কেউই।

গ্রুপ পর্বে ম্যাচ : ২০ ফেব্রুয়ারি-ভারত

২৪ ফেব্রুয়ারি নিউজিল্যান্ড, ২৭ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান

সম্ভাবনা : একটা ম্যাচ জয়ই হবে বিরাট কৃতিত্বের