বাংলাদেশের কীর্তিগাথা আসর

টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের উন্মাদনায় ক্রিকেটবিশ্ব বুঁদ হওয়া শুরু করেছে। আইসিসিও অর্থ-বিত্তে বেশ সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছে। কর্তা-ব্যক্তিদের তখন চিন্তা কী করে ক্রিকেটের কুলীন সংস্করণ টেস্টকে টিকিয়ে রাখা যায়। ওয়ানডের পাশাপাশি দুবছর অন্তর অন্তর নিয়মিত মাঠে গড়াচ্ছে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। বড় দেশগুলো হাঁটা শুরু করেছে ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্টের দিকে। এসব মিলিয়ে ওয়ানডে ফরম্যাটের আরও একটি মেগা ইভেন্ট পরিচালনা করা অহেতুক হয়ে ওঠে আইসিসির কাছে। দুবার বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েও শেষ পর্যন্ত গড়ায় সপ্তম ও অষ্টম আসর। ২০১৭ আসরটিতে সেমিফাইনাল খেলে ক্রিকেট দুনিয়ায় তাক লাগিয়ে দেয় বাংলাদেশ। মাশরাফী বিন মোর্ত্তজার নেতৃত্বে বদলে যাওয়া বাংলাদেশের ওয়ানডে দল এ আসরেই জানান দিয়েছিল নিজেদের আগমনী সুর।

২০১৩ আসর

টি-টোয়েন্টি এসে ততদিনে ছাপিয়ে যেতে শুরু করেছে ওয়ানডে ক্রিকেটকে। এর সঙ্গে আইসিসির নজর পড়ে টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে কুলীন সংস্করণটির উন্নতি ঘটানোর দিকে। ২০০৯ সালের পর থেকেই দুই বছরের জায়গায় চার বছর পরপর চ্যাম্পিয়নস ট্রফি আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তারপরও ২০১৩ আসরের প্রায় এক বছর আগেই আইসিসির মনে হয়েছিল দর্শকের কাছে জনপ্রিয়তা হারিয়ে ফেলেছে এই প্রতিযোগিতা। তবুও শেষবারের মতো ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে বসে চ্যাম্পিয়নস ট্রফির আসর। ততদিনে নির্দিষ্ট হয়ে গেছে র‌্যাংকিংয়ের সেরা আট দলই অংশ নেবে এ প্রতিযোগিতায়। লন্ডন, বার্মিংহাম ও কার্ডিফের তিন ভেন্যু মিলিয়ে জুনের ৬ থেকে শুরু হয়ে ২৩ তারিখ পর্যন্ত গড়ায় এ আসর। আইসিসির ভাবনার বিপরীতে দাঁড়িয়ে ১৫ ম্যাচের ১২টির টিকিট ‘সোল্ড আউট’ হয়ে যায় আনুষ্ঠানিকভাবে। ২১ আগস্ট ২০১২ পর্যন্ত র‌্যাংকিংয়ের সেরা আটে না থাকায় এবারও অংশ নেওয়া হয়নি বাংলাদেশের। ইংল্যান্ডে দুঃস্বপ্নের মতো আসর কাটে গত দুবারের চ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়ার। গ্রুপপর্বে কোনো ম্যাচ জিততে না পেরে সবার শেষে থেকে আসর শেষ হয় তাদের। ইংল্যান্ড ও শ্রীলঙ্কার সঙ্গে অন্য গ্রুপ থেকে ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকা ওঠে সেমিফাইনালে। সেমির লড়াইয়ে একক দাপট দেখিয়ে শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারিয়ে ইংল্যান্ড ওঠে ফাইনালে। এ আসরটিকে এতটাই অগুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয়েছিল যে ইংল্যান্ডের বৃষ্টিশঙ্কুল আবহাওয়ার কথা বেমালুম ভুলে গিয়ে ফাইনাল ম্যাচের জন্য রাখা হয়নি কোনো রিজার্ভ ডে। তাতে সম্ভাবনা জাগে ২০০২ আসরের মতো পরিণতির। শেষমেশ শঙ্কা কাটিয়ে ২০ ওভারের ম্যাচ গড়ায় মাঠে। নাটকীয় সেই ফাইনালে প্রায় জিতে যাওয়া ম্যাচটি ইংল্যান্ডের মুঠো থেকে ছিনিয়ে নিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয় ভারত। ঘরের মাঠে অধরাই থেকে যায় ইংল্যান্ডের আইসিসি টুর্নামেন্টে শিরোপার স্বপ্ন। সর্বোচ্চ ১২ উইকেট নেন রবীন্দ্র জাদেজা। আর সর্বোচ্চ ৩৬৩ রানে শিখর ধাওয়ান হন টুর্নামেন্টসেরা।

২০১৭ আসর

২০১৩ সালেই শেষ হয়ে যাওয়ার কথা ছিল চ্যাম্পিয়নস ট্রফির। চার বছর বাদে ২০১৭ সালে মাঠে গড়ানোর কথা ছিল আইসিসি বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের প্রথম আসর। কিন্তু ২০১৪ সালে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় আরও একটি চ্যাম্পিয়নস ট্রফি আয়োজনের। ২০১৬ সালে সিদ্ধান্ত হয় এটিই হবে চ্যাম্পিয়নস ট্রফির শেষ আসর। প্রতিটি ফরম্যাটে একটি করে বড় টুর্নামেন্ট আয়োজনের চিন্তা থেকেই নেওয়া হয় এমন সিদ্ধান্তের। প্রাইজমানিতেও আসে বড় উন্নতি। আইসিসি ওডিআই চ্যাম্পিয়নশিপের পয়েন্ট অনুযায়ী ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৫ পর্যন্ত কাটআউট টাইমের মধ্যে র‌্যাংকিংয়ের সাতে থেকে এই আসরে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে বাংলাদেশ। চ্যাম্পিয়নস ট্রফির এ আসরটি বাংলাদেশের জন্য ইতিহাসের পাতায় চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। ২০১৫ বিশ্বকাপের পর থেকে বদলে যাওয়া বাংলাদেশ ওয়ানডে দলের যেকোনো আইসিসি ইভেন্ট বিবেচনায় সেরা সাফল্য আসে এই টুর্নামেন্টটি থেকেই। মাঠে দাপুটে নৈপুণ্য এবং সেই সঙ্গে বৈরী আবহাওয়ার আনুকূল্য পেয়ে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডকে পেছনে ফেলে গ্রুপ পর্ব থেকে সেমিফাইনালে ওঠে বাংলাদেশ। প্রথম ম্যাচে তামিম ইকবালের সেঞ্চুরিতে তিনশোর্ধ্ব রান করেও ইংল্যান্ডের কাছে হারতে হয়। অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে ম্যাচটি ভেস্তে যায় বৃষ্টিতে। আর শেষ ম্যাচে সাকিব আল হাসানের সেঞ্চুরিতে নিউজিল্যান্ডকে হারায় পাঁচ উইকেটে। সেমিফাইনালে বাংলাদেশ মুখোমুখি হয় ভারতের। তামিমের ৭০ রানের সুবাদে ২৬৪ করার পরও সেমির লড়াইয়ে হার মানতে হয় ৯ উইকেটে। ফাইনালে ক্রিকেটবিশ্বকে উত্তেজনায় মাতিয়ে মুখোমুখি হয় ভারত-পাকিস্তান। ফখর জামানের সেঞ্চুরি আর মোহাম্মদ আমিরের আগুনে বোলিংয়ে কোনো আইসিসি টুর্নামেন্টে প্রথমবারের মতো ভারতকে ১৮০ রানের রেকর্ড ব্যবধানে হারায় পাকিস্তান। পাকিস্তানের হাসান আলি হন টুর্নামেন্ট সেরা খেলোয়াড়।