পাউলিস্তায় ইন্তারনাসিওনাল দ্য লিমেইরার বিপক্ষে সান্তোসের ৩-০ গোলের জয়ে নেইমার করেছেন অবিশ্বাস্য ‘অলিম্পিক গোল’। পাঠকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে অলিম্পিক গোল কি? কোনো খেলোয়াড়ের করা কর্নার থেকে সরাসরি গোল হলে তাকে বলা হয় অলিম্পিক গোল। কর্নার থেকে সরাসরি গোল হলে সেই গোলকেই কেন অলিম্পিক গোল বলা হয়, এবার জেনে নেওয়া যাক সেই ইতিহাস। এর উত্তরের জন্য আমাদের ফিরে যেতে হবে প্রায় ১০১ বছর আগে। ১৯২৪ সালে আর্জেন্টিনার স্ট্রাইকার সিজারো ওনজারি প্রীতি ম্যাচে তখনকার অলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন উরুগুয়ের বিপক্ষে কর্নার থেকে সরাসরি গোল করেছিলেন। অলিম্পিক চ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে এমন গোল বলেই এর নাম হয় অলিম্পিক গোল।
ওনজারির সেই গোলের পর এটা নিয়ে তখন নানা প্রশ্ন উঠেছিল যে, এমনভাবে গোল দেওয়া উচিত কি না। তবে ফুটবলের নিয়ম তৈরিকারী সংস্থা আইএফএবি একে গোল হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। তবে ফুটবল খেলায় অলিম্পিক গোল খুব বেশি দেখা যায় না। কোনো দল অলিম্পিক গোল হজম করলে সাধারণত গোলকিপারকে দোষ দেওয়া হয়। অনেকের মতে অলিম্পিক গোল হুট করে হয়ে যায়, তো এমনও দেখা গেছে খেলোয়াড়রা অলিম্পিক গোল করার চেষ্টা করেন।
পেশাদার ফুটবলে পরিসংখ্যান দিয়ে লিওনেল মেসি ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর তুলনা করেন এমন ভক্তের সংখ্যা কম নয়। তবে একটি জায়গায় এ দুই মহাতারকাই পিছিয়ে আছেন। মেসি বা রোনালদো দুজনের ক্যারিয়ারে নেই অলিম্পিক গোল। মেসির না থাকলেও আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি ডিয়েগো ম্যারাডোনার অলিম্পিক গোল আছে। ১৯৮৫ সালে নাপোলির হয়ে অলিম্পিক গোল করেছিলেন লাৎসিওর বিপক্ষে।
অলিম্পিক গোল নারী ফুটবলেও হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কিংবদন্তি ফুটবলার মেগান রাপিনো তার ক্যারিয়ারে দুবার অলিম্পিক গোল করেছেন। আগস্ট ২১ (অলিম্পিক ২০২০), ব্রোঞ্জ মেডেল ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে অলিম্পিক গোল করেন রাপিনো। তার আগে ২০১২ অলিম্পিকেও এমন গোল করেন তিনি। সেটি ছিল সেমিফাইনাল ম্যাচে কানাডার বিপক্ষে। তাতে অলিম্পিক ইভেন্টে অলিম্পিক গোল করা প্রথম খেলোয়াড় হন রাপিনো।
পুরুষ ফুটবলে অলিম্পিক গোল নেইমারের আগে অনেকেই করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবলার ক্রিশ্চিয়ান পুলিসিক চ্যাম্পিয়নস লিগে ২০২৩-এ ক্লাব ব্রুজের বিপক্ষে এসি মিলানের হয়ে অলিম্পিক গোল করেছিলেন। গোলটির পর পুলিসিক বলেছিলেন, ‘হুট করেই হয়ে গেছে। আসলে এমনভাবে গোল করার চেষ্টা আমি করিনি।’
অলিম্পিক গোল করা খেলোয়াড়দের তালিকায় আরও আছে থিয়েরি অরি, ডেভিড বেকহ্যাম, রোনালদিনহো, রবার্তো কার্লোস, টনি ক্রুস, ডিয়েগো ফোরলান, অ্যাঞ্জেল ডি মারিয়ার মতো খেলোয়াড়ের নাম।
অরি মেজর লিগ সকারে ২০১২ সালে নিউ ইয়র্ক রেড বুলের হয়ে কলম্বাসের বিপক্ষে অলিম্পিক গোল করেছিলেন। ডেভিড বেকহ্যাম ২০১১ সালে এলএ গ্যালাক্সির হয়ে শিকাগো ফায়ারের বিপক্ষে অলিম্পিক গোল করেছিলেন। রবার্তো কার্লোস ২০১১ সালে পিউলিস্তা চ্যাম্পিয়নশিপে করেন্থিয়ান্সের হয়ে পর্তুগিজা দলের বিপক্ষে করেছিলেন অলিম্পিক গোল। নেইমারও করলেন একই প্রতিযোগিতায়। রোনালদিনহো ফ্লামেঙ্গোর হয়ে আভাইয়ের বিপক্ষে ২০১১ সালে অলিম্পিক গোল করেন। আরেক ব্রাজিলিয়ান ডগলাস লুইজ অ্যাস্টন ভিলার হয়ে ২০২২ সালের আগস্টে আর্সেনালের বিপক্ষে অলিম্পিক গোল করেন। তার আট দিন আগে বোল্টন ওয়ান্ডারার্সের বিপক্ষেও অলিম্পিক গোল করেন তিনি লিগ কাপের ম্যাচে।
আর্জেন্টিনার মিডফিল্ডার ডি মারিয়া একের অধিকবার (দুবার) অলিম্পিক গোল করেছেন তার ক্যারিয়ারে। পিএসজির হয়ে ২০১৮-১৯ মৌসুমে নিমসের বিপক্ষে এবং ২০২৩-এর ডিসেম্বরে বেনফিকার হয়ে সাল্জবুর্গের বিপক্ষে চ্যাম্পিয়নস লিগে করেছিলেন অলিম্পিক গোল। পিএসজির হয়ে যেটি করেছিলেন সেটি জালে ঢোকার সময় গোলকিপারের হাতে লেগেছিল। আর্জেন্টিনার আরেক সাবেক মিডফিল্ডার রিকুয়েলমে তার ক্যারিয়ারে একাধিকবার পেশাদার ফুটবলে অলিম্পিক গোল করেছেন। ভিয়ারিয়ালে খেলার সময় মায়োর্কা ও আলাভেসের বিপক্ষে গোল করেন। রিকুয়েলমে ২০০৩-০৭ পর্যন্ত খেলেন স্প্যানিশ এই ক্লাবটিতে। ২০০৭ সালে বোকা জুনিয়র্সে ফেরেন রিকুয়েলমে। সেই বছরই কোপা লিবার্তাদোরেসে অলিম্পিক গোল করেন ভেলেজ সার্সফিল্ডের বিপক্ষে।
জার্মান মিডফিল্ডার টনি ক্রুস রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে ভ্যালেন্সিয়ার বিপক্ষে অলিম্পিক গোল করেছিলেন ২০২০ সালের স্প্যানিশ সুপার কাপ ম্যাচে। ২০২৪-এর ডিসেম্বরে টটেনহ্যামের হয়ে ম্যানচেস্টার সিটির বিপক্ষে লিগ কাপের ম্যাচে অলিম্পিক গোল করেছিলেন সন হিয়ুং মিন। জুভেন্তাসের হয়ে ২০২১’র ডিসেম্বরে জেনোয়ার বিপক্ষে অলিম্পিক গোল করেছিলেন হুয়ান কোয়ার্দাদো। ম্যাচটি চলাকালে কভিড-১৯ মহামারীর কারণে মাঠে দর্শক সংখ্যা সীমিত ছিল।
মোহামেদ সালাহ জাতীয় দলের হয়ে করেছেন অলিম্পিক গোল। আফ্রিকা কাপ অব নেশনসের বাছাই পর্বের ম্যাচে ২০১৮ সালের অক্টোবরে ইসওয়াতিনির (সোয়াজিল্যান্ড) বিপক্ষে অলিম্পিক গোল করেন। যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবলার মাইকেল ব্রাডলি ফেব্রুয়ারি ২০১৫-তে গোল কাপে পানামার বিপক্ষে অলিম্পিক গোল করেছিলেন। সাবেক উরুগুয়ে খেলোয়াড় আলভারো রেকোবা তার ক্যারিয়ারে ছয়বার অলিম্পিক গোল করেছেন বলে তথ্য পাওয়া যায়।
এ ছাড়া পেশাদার ফুটবলে অলিম্পিক গোল করা আরও খেলোয়াড় আছেন।