‘জলজ লকার’ নামটি বইয়ের প্রচ্ছদের মতোই ডুয়াল টোনের বা দুই রঙা হিসেবে দুই ভিন্ন অর্থের। চাইলে পুরো বইটার অসরলরৈখিক গল্পের সঙ্গে মিলিয়ে নিয়ে, একটা পূর্বানুমান নিয়েও গল্পটাকে পাঠ করা যায়। ঠিক তার বিপরীতক্রমে, পুরো গল্পের পাঠ শেষেও পাঠকমাত্রই বিভ্রান্ত হতে পারেন এই ভেবে কারা, কেন আর কিই-বা এই জলজ লকারে জমা করা ছিল? আস্ত একটা সমান্তরাল পৃথিবী, যা কি না আবার ত্রিকালদর্শী! এই মুহূর্তের বর্তমান যা হয়ে যায় অতীত, অথবা ভবিষ্যতের যেসব সম্ভাবনার পটভূমি উঠে আসে তা তো পাঠকের বর্তমানকালের সঙ্গেও মিলে যায়!
জলজ লকার নিছকই রহস্য উপন্যাস নয়, কিংবা ম্যাজিক রিয়ালিজম নামের সাহিত্যকৌশলের বাইরে বেরিয়ে আসা এক নতুনতর পাঠ-অভিজ্ঞতার মতো কিছু, বলা যেতে পারে ইউনিক একটা দুর্দান্ত ভাষিক কথনযাত্রা! বহুবিভাজনের, বহুতলের, বহু আধারের বিচিত্র মানুষদের নিয়ে যে বিশদ পরিসরের আখ্যানের দিকে এগিয়েছেন সেই পথে মনোযোগী পাঠক তুমুল এলোমেলো রকমের গোছানো এক যাত্রা করবেন; আলো-আঁধারির হিসাব ছাপিয়ে এক নিখাদ কথনবিশে^র পৃথক দৃশ্যশব্দচিত্রের আলাদা আলাদা মহল্লায়, যেখানে একমাত্র বসত করে গল্পের চরিত্ররা, আমরা অথবা ওরাই এবং মূলত মানুষ!
উত্তরসত্য যুগের, সমকালীন সাহিত্যবাহানায় ‘জলজ লকার’-এ যে পথে আমরা ঘুরতে থাকি, সেখানে কথাকার কী বলতে চেয়েছেন গল্প বলার ছলে, ‘আমি যা দেখি, তুমি তা দেখো?’
সত্যি বলতে, জলজ লকার পাঠ অবধি এই প্রশ্নের সরল উত্তর দেওয়াটা রীতিমতো অসম্ভব, কারণ বোধকরি তারার হাসি, তালিসমানের ছাপ, ডাক্তার নভোর নভোযাত্রার স্থিরতা কিংবা আরও ‘যারা-তারা’ এই গল্পজগতের নামধারী তাদের অনেককেই হয়তো চেনা মানুষের ছাপে খুঁজে পাবেন।
অন্যদিকে যেসব চরিত্র আর কাহিনিকে মনে হবে অচেনা এক জগতের, তাদের সন্ধানে পাঠক এমন আখ্যান থেকে বেরিয়ে আসতে পারেন কই? এই পাঠ এক গোপন গল্পের সুলুকসন্ধান তো দেয়ই, একই সঙ্গে বুঝিয়ে দেয় এমন এক রহস্য-সরল দ্বিধার গল্পের বয়ানের মতোই আমাদেরও বসতবাড়ির আলসে-আলাপ।
পাঠককে স্বাগত জানাতেই হয় এমন এক পাঠ-অভিজ্ঞতায় যেখানে অন্তত খুব বেশি স্বস্তির শ্বাস না এলেও, উপন্যাসের জগতের ভ্রান্তিপাশে নিজের জায়গাটা খুঁজে নিতেই পারেন। ম্যাজিক্যাল, নাকি সত্যানুসন্ধান এই উত্তরের দিকে জলজ লকারে আপনি আটকেও যেতে পারেন স্বেচ্ছায়।