নেইমার ৬০ গোল না করলে নাম বদলানোর বাজি ধরেছিলেন গার্দিওলা

সময় তার জন্য থেমে ছিল না, কিন্তু হৃদয়ের টান তাকে ফিরিয়ে এনেছে সেই শৈশবের ঠিকানায়। বার্সেলোনা, পিএসজি, আল-হিলালের আলো ঝলমলে জীবন পেছনে ফেলে আবারও সান্তোসের জার্সিতে জয়ের গান গাইতে এসেছেন নেইমার জুনিয়র। কাঁধে একরাশ অভিজ্ঞতা, চোখে নতুন স্বপ্ন আর হৃদয়ে পুরোনো ভালোবাসা—সব মিলিয়ে যেন এক অসম্ভব সুন্দর গল্পের পুনর্জন্ম। সম্প্রতি ব্রাজিলের জনপ্রিয় পডকাস্ট ‘পডপাহ’-এ এসে অকপটে নিজের জীবন, ক্যারিয়ার ও স্বপ্নের কথা শেয়ার করেছেন নেইমার। মেসির সঙ্গে বন্ধুত্ব, ইনজুরির যন্ত্রণা, ব্যালন ডি’অর না জেতার আক্ষেপ আর এক বিশেষ রাতে পেপ গার্দিওলার তাকে বায়ার্ন মিউনিখে নেওয়ার আকস্মিক চেষ্টা—সবকিছু নিয়েই ছিল এই আলাপ।

নেইমার জানিয়ে দিলেন, তিনি এখনো হার মানেননি। ফুটবলের প্রতি তার ভালোবাসা অটুট, আর সান্তোসের হয়ে তিনি আবারও ইতিহাস গড়তে চান। পডকাস্টের সম্পূর্ণ ইন্টারভিউটি প্রশ্নোত্তর আকারে উপস্থাপন করা হলো।

প্রশ্ন: এত বছর পর সান্তোসে ফিরে কেমন লাগছে? 

নেইমার: এটা আমার জীবনের সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্তগুলোর একটি। আমি যখন ভিলা বেলমিরোতে ফিরে এলাম, সেই উষ্ণ অভ্যর্থনা দেখে আমার চোখে পানি চলে এসেছিল। এত বছর পরও আমার প্রতি ভালোবাসা এতটা অটুট থাকবে, ভাবিনি! 

প্রশ্ন: ইউরোপে থাকতে অনেক ক্লাবের প্রস্তাব পেয়েছিলেন। কেন সান্তোসকে বেছে নিলেন? 

নেইমার: এটা কখনোই টাকার ব্যাপার ছিল না। আমার হৃদয় শুরু থেকেই এখানে ছিল। আমি যেখানে সবচেয়ে সুখী ছিলাম, সেখানে ফিরতে চেয়েছি। পিএসজিতে অনেক ভালো সময় কেটেছে, কিন্তু আমি অনুভব করলাম, নিজের ফুটবলকে নতুন করে ভালোবাসতে হলে আমাকে ফিরে আসতে হবে শিকড়ে।

প্রশ্ন: ইনজুরির কারণে দীর্ঘদিন মাঠের বাইরে ছিলেন। কেমন ছিল সেই সময়টা?

নেইমার: ভয়ংকর! এটা শুধু শারীরিক কষ্ট ছিল না, মানসিকভাবেও ভীষণ কঠিন সময় ছিল। আমি খেলতে পারছিলাম না, যা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় আনন্দ। প্রতিদিন নিজেকে বোঝাতে হতো যে আমি আবার ফিরব। আমি অনেক কষ্ট করেছি, অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছি। এখন আমি ফিরে এসেছি, কারণ আমি জিততে এসেছি!

প্রশ্ন: মাঠে আপনি অন্যদের চেয়ে বেশি ফাউলের শিকার হন। কেন মনে হয় আপনার সঙ্গে এমন হয়?

নেইমার: আমি সবসময় বল দখলে রাখতে চাই, ড্রিবল করতে চাই, আক্রমণ গড়ে তুলতে চাই। এটা স্বাভাবিকভাবেই প্রতিপক্ষকে বিরক্ত করে। আমি জানি, ফুটবলে এটা থাকবে, কিন্তু মাঝে মাঝে মনে হয় কিছু ফাউলের জন্য আরও কঠোর শাস্তি হওয়া উচিত। কেউ যদি আমাকে ইনজুরড করে মাঠের বাইরে পাঠায়, তাহলে তাকেও সমান সময় মাঠের বাইরে থাকতে হবে!

প্রশ্ন: মেসির সঙ্গে বন্ধুত্ব নিয়ে কিছু বলবেন?

নেইমার: ওহ, লিও একজন অসাধারণ বন্ধু এবং মানুষ। বার্সায় থাকার সময় আমরা একে অপরকে অনেক সাহায্য করেছিলাম। এমনকি সে একদিন আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘তুমি কীভাবে পেনাল্টি নাও?’ আমি তো অবাক! বললাম, ‘তুমি মেসি! তুমি যদি চাও, তাহলে পারবে!’

প্রশ্ন: বার্সেলোনায় যাওয়ার আগে আপনি নাকি বায়ার্ন মিউনিখেও যেতে পারতেন?

নেইমার: হ্যা! আমি বায়ার্ন মিউনিখে যাওয়ার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিয়েই ফেলেছিলাম। সেটা শুধুমাত্র পেপ গার্দিওলার কারণে। যখন আমি পুসকাস অ্যাওয়ার্ড জিতলাম, তখন রাত ২টায় আমার বাবা আমাকে বারবার ফোন করছিলেন। আমি ফোন ধরতেই তিনি বললেন দরজা খুলতে। আমি তখন শুধুমাত্র বক্সার পরা অবস্থায় ছিলাম। দরজা খুলে দেখি—আমার বাবা, পেপ গার্দিওলা এবং একজন দোভাষী দাঁড়িয়ে আছেন!

নেইমার ও গার্দিওলা একসঙ্গে।

পেপ আমাকে বললেন, আমি নতুন একটি ক্লাবে যোগ দিতে যাচ্ছি। যেখানে যাব সেখানে তোমাকেও চাই। আমি তোমাকে বিশ্বের সেরা খেলোয়াড় বানাবো। তিনি কাগজ বের করলেন, ল্যাপটপ খুললেন এবং আমাকে দেখালেন, কোথায় খেলাবেন। এরপর বললেন যদি তুমি প্রতি মৌসুমে ৬০ গোল না করো, তাহলে আমি আমার নাম বদলে ফেলব!

আমি তখন একটু ভেবে বললাম ঠিক আছে, কিন্তু কোন দলে যাব? পেপ বললেন এটা এখনো প্রকাশ করা হয়নি, তাই আমি বলতে পারছি না। আমি তাকে বোঝাতে থাকলাম, শেষ পর্যন্ত তিনি বললেন আমি বায়ার্ন মিউনিখে যোগ দিচ্ছি। আমি জানি, এটা শীতের শহর, কিন্তু আমি তোমার যত্ন নেব। তারপর আমি বার্সেলোনায় যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেই।

প্রশ্ন: ক্যারিয়ারের সেরা সময় কোনটাকে বলবেন?

নেইমার: আমার মনে হয়, পিএসজিতে থাকার সময়ই আমি পরিপূর্ণ খেলোয়াড়ে পরিণত হয়েছি। সান্তোসে আমি বাঁপাশে খেলতাম, কিন্তু পিএসজিতে মাঝখানে খেলেছি, যেখানে আমার দক্ষতা আরও ভালোভাবে প্রকাশ পেয়েছে।

প্রশ্ন: ব্যালন ডি’অর না জেতার আক্ষেপ আছে?

নেইমার: আক্ষেপ তো একটু থাকে। আমি সবসময়ই চেয়েছি বিশ্বের সেরা হতে, কিন্তু ফুটবলে অনেক কিছুই ভাগ্যের ওপর নির্ভর করে। তবুও আমি গর্বিত, কারণ আমি বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়দের সঙ্গে খেলেছি, এবং তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পেরেছি।

প্রশ্ন: সান্তোসের হয়ে এবার কী লক্ষ্য?

নেইমার: লক্ষ্য একটাই—চ্যাম্পিয়ন হওয়া! আমি এসেছি জিততে। আমি জানি, এটা সহজ হবে না, কিন্তু আমাদের দলে অনেক প্রতিভাবান খেলোয়াড় আছে। আমি বিশ্বাস করি, আমরা পারব!