দুঃস্বপ্নের ইতিহাস থেকে নতুন জয়ের সন্ধানে

২০১৫ সালের ২৪ মার্চ। ভেন্যু নিউজিল্যান্ডের ইডেন পার্ক। চারদিকে উত্তেজনার আগুন, গ্যালারি কানায় কানায় পূর্ণ, ৪১ হাজার দর্শক শ্বাসরুদ্ধকর মুহূর্তের অপেক্ষায়। দক্ষিণ আফ্রিকার অন্যতম সেরা পেসার ডেল স্টেইন তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ওভার করতে আসছেন। তার হাতেই দলের ভাগ্য।

দক্ষিণ আফ্রিকা বনাম নিউজিল্যান্ড বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল। এক দল উঠে যাবে ফাইনালে, অন্য দল হারিয়ে যাবে অতীতের মতোই এক দুঃখজনক বিদায়ের গল্পে। স্টেইন বল করলেন, বলটা একটু অফ স্টাম্পের বাইরে, কিন্তু গ্রান্ট এলিয়ট সজোরে ব্যাট চালালেন। পরবর্তী মুহূর্তেই ঘটে গেল অবিশ্বাস্য ঘটনা। বল উড়ে গ্যালারিতে গিয়ে পড়ল, পুরো স্টেডিয়ামে উল্লাসের ঝড় বয়ে গেল। নিউজিল্যান্ডের দর্শকরা যেন বিস্ফোরিত হলো আনন্দে, আর দক্ষিণ আফ্রিকার খেলোয়াড়দের চোখেমুখে নেমে এলো হতাশার ছায়া।

ডেল স্টেইন মাথায় হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে, এবি ডি ভিলিয়ার্স মাটিতে বসে পড়েছেন, মরনে মর্কেল ফাঁকা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। পুরো দলের চোখেমুখে শুধুই একটাই প্রশ্ন ‘আমরা কি আবারও ব্যর্থ হলাম?’

সেই দক্ষিণ আফ্রিকা দলটি ছিল নিঃসন্দেহে বিশ্বসেরা। ওপেনিংয়ে হাশিম আমলা, যিনি টেস্ট ও ওয়ানডেতে রান করার এক নিখুঁত মেশিন। মিডল অর্ডারে ছিলেন এবি ডি ভিলিয়ার্স, যিনি তার বিস্ময়কর ৩৬০ ডিগ্রি শটের জন্য পরিচিত। সেই দলের বোলিং লাইনআপেও ছিল ডেল স্টেইন, মরনে মর্কেল, ভার্নন ফিল্যান্ডার যারা একসঙ্গে যে কোনো ব্যাটিং লাইনআপকে ধ্বংস করে দিতে পারতেন।

তবুও, বিশ্বকাপের ট্রফি তাদের হাতের নাগালেই এসে ফিরে গেল। ১৯৯২ সালে প্রথমবার বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার পর থেকে দক্ষিণ আফ্রিকা বহুবার ফেভারিটের তালিকায় থেকেছে, কিন্তু ট্রফির স্বাদ পায়নি।

আরেকটু পিছিয়ে যাওয়া যাক। ১৯৯৯ সালের বিশ্বকাপ সেমিফাইনাল। প্রতিপক্ষ সেই অস্ট্রেলিয়া। দক্ষিণ আফ্রিকার অন্যতম সেরা অলরাউন্ডার ল্যান্স ক্লুজনার তখন জীবনের সেরা ফর্মে। শেষ ওভারে প্রয়োজন মাত্র ৯ রান। ড্যামিয়েন ফ্লেমিংয়ের প্রথম দুই বলে দুটি চার মেরে দক্ষিণ আফ্রিকা সমীকরণ নিয়ে এল ৪ বলে ১ রানে। ম্যাচের ভাগ্য তখন তাদের হাতের মুঠোয়।

কিন্তু তারপরই ঘটে গেল অবিশ্বাস্য ভুল। পরবর্তী বলটিতে কোনো রান না হলেও, চতুর্থ বলে ক্লুজনার দৌড় শুরু করলেন, কিন্তু অ্যালান ডোনাল্ড ক্রিজ ছাড়েননি। মুহূর্তেই ঘটে গেল ভয়ানক ভুল বোঝাবুঝি। দুই ব্যাটার এক প্রান্তে পৌঁছে গেলে সহজ রান আউটে ম্যাচ জিতে নেয় অস্ট্রেলিয়া। দক্ষিণ আফ্রিকার বিশ্বকাপ স্বপ্ন তখনই ভেঙে যায়, এবং ‘চোকার্স’ তকমার শুরু সেখান থেকেই। এই ট্র্যাজেডি যেন তাদের অভিশাপের মতো হয়ে গেল। এরপর ২০০৩, ২০০৭, ২০১১, ২০১৫ প্রতিবারই তারা শিরোপার দাবিদার হয়ে এসেছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ফিরেছে খালি হাতে।

এখন ২০২৫ সাল। দক্ষিণ আফ্রিকা আবারও আইসিসি চ্যাম্পিয়নস ট্রফির সেমিফাইনালে পৌঁছেছে। আগের ম্যাচে তারা ইংল্যান্ডকে উড়িয়ে দিয়েছে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে। কিন্তু এবারও কি ভাগ্য তাদের সঙ্গে থাকবে, নাকি আরও একবার ব্যর্থতার ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটবে?

দক্ষিণ আফ্রিকার খেলোয়াড়রা এখন অতীতের ইতিহাস ভুলে সামনে তাকাতে চায়। কেশব মহারাজ বলেন, ‘আগের প্রজন্মের ব্যর্থতা আমাদের চিন্তার বিষয় নয়। আমরা নতুন প্রজন্ম এবং আমরা একসঙ্গে খেলতে চাই। আমাদের লক্ষ্য ট্রফি জেতা।’ এই বছর কি দক্ষিণ আফ্রিকা ইতিহাস বদলাতে পারবে? নাকি আরও একবার তারা হৃদয় ভাঙার গল্প লিখবে? শুধু সময়ই এই প্রশ্নের উত্তর দেবে।

কিন্তু যদি এবারও তারা ব্যর্থ হয়, তাহলে হয়তো আরও একবার তাদের নাম লেখা হবে ক্রিকেটের সবচেয়ে মর্মান্তিক দলগুলোর তালিকায় যারা অসংখ্য সুপারস্টার থাকা সত্ত্বেও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চে এসে বারবার হোঁচট খেয়েছে।