আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক দায়

সময়টা পাঁচই আগস্ট, ২০২৪। রাজধানীসহ সারাদেশে আনন্দের সঞ্চারণ প্রাণ থেকে প্রাণে, ব্যক্তি থেকে সমষ্টিতে। কেউ বলল দ্বিতীয় স্বাধীনতা, কেউ বলল বিপ্লব, কেউ বলল জনঅভ্যুত্থান। যে যাই বলুক না কেন, সব ছাপিয়ে দীর্ঘ পনেরো বছরের দমবন্ধ করা দুঃশাসন আর বঞ্চনা থেকে মুক্ত হতে পারা গেছে এই যেন এক বিশাল প্রাপ্তি। কতক ছাত্র-তরুণের আহ্বানে গোটা দেশের আপামর সাধারণ মানুষের বহু বছরের ক্ষোভ, সংক্ষোভের তোড়ে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয় আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন প্রধানমন্ত্রী, তার অতি কাছের মানুষ ও অনেক স্বজন। পারিষদবর্গের অনেককেই (এই সংখ্যা ছয়শর আশপাশে) আশ্রয় দেয় দেশের সশ্রস্ত্র বাহিনী।

তবে যে তারুণ্যের নেতৃত্বে মিলেছে এই মহামুক্তি, সেই তারুণ্যের এবং একই সঙ্গে জনমুক্তির চিন্তনের খোরাক জুগিয়েছে যারা সেসব মানুষের মনের কোথায় যেন খচখচ করছে। আসলেই কী সঠিক পথে এগোচ্ছে সবকিছু? এমনি এক সময়ে আমরা যারা গেল পাঁচ দশকের বাংলাদেশকে দেখেছি, দেখেছি মুক্তিযুদ্ধ, নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান এবং সাক্ষী হলাম সবশেষ ছত্রিশে জুলাইয়ের তেমনি কিছু মানুষের এক রাষ্ট্রনৈতিক আড্ডায় বলেছিলাম এবার যদি রাষ্ট্রের চাবি নেওয়া না যায়, তাহলে দেশের তরুণদের একটি বড় অংশ হবে বিদেশমুখী। আর যারা যেতে পারবে না তাদের অনেকেই বেছে নেবে আত্মহননের পথ! সম্প্রতি একই সুর ধ্বনিত হলো জুলাই জনঅভ্যুত্থানে সক্রিয় অংশগ্রহণকারী এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর কণ্ঠে। তার কথায়, যারা এই আন্দোলনে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মাঠে থেকেছে, তাদের মধ্যে স্বল্প সংখ্যার একটি অংশ হয়েছেন রাষ্ট্রক্ষমতার অংশীজন। কিন্তু বাকি বিশাল একটি অংশ রাষ্ট্রের বর্তমান পরিস্থিতিতে যারপরনাই হতাশ। যারা কিনা চেয়েছিল আর যাই হোক, এবারে নিশ্চিত প্রিয় মাতৃভূমি দখলমুক্ত হবে দুর্বৃত্ত ধনিক শ্রেণির সহায়ক রাষ্ট্র কাঠামো থেকে। নিবন্ধের শিরোনাম ‘আত্মহত্যার আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক দায়’ হওয়াতেই ওপরের ভূমিকাকে প্রাসঙ্গিক বলেই ধরে নেওয়ার অনুরোধ করছি।

এবার আসা যাক, সংশ্লিষ্ট বিষয়ের অবতারণায়। আর সেটি হচ্ছে, সংবাদপত্রে প্রকাশিত আত্মহত্যা সম্পর্কিত একটি প্রতিবেদনে। সেখানে বলা হয়েছে, দেশে প্রতিদিন গড়ে ৫৬ জন মানুষ আত্মহত্যা করেন। এই সংখ্যা দিনকে দিন বাড়ছে। প্রতিবেদনে দেশীয় একটি সংস্থার জরিপের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালে বাংলাদেশে ২০ হাজার ৫০৫ জন আত্মহত্যা করেছেন। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ৫৬ জন মানুষ দেশের কোথাও না কোথাও আত্মহত্যা করেছেন। এই সংখ্যা প্রতি লাখে ১২ দশমিক ৪ জন। তবে ২০১৬ সালে আত্মহত্যা করেছিলেন ২৩ হাজার ৮৬৮ জন। যা সংখ্যায় প্রতি লাখে ১৪ দশমিক ৭ জন। নারীদের মধ্যে ১৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী এবং ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সী পুরুষের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি। প্রসঙ্গত, দেশে সড়ক দুর্ঘটনার পর সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা যান আত্মহত্যায়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির আর্থিক সহায়তায় পরিচালিত জাতীয় জরিপ (২০২২-২৩) করেছে সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ, বাংলাদেশ (সিআইপিআরবি)।

কেন এই আত্মহননের পথ : পুঁজিবাদী রাষ্ট্র কাঠামোয় পরিবার ও সমাজে একজন ব্যক্তি যখন দীর্ঘ সময়ের জীবনবিরুদ্ধ জীবন পার করতে গিয়ে হাঁপিয়ে যান, নিজের জীবন কিংবা পরিবারের বোঝা টানতে গিয়ে যখন আর কোনো পথ পান না, এমন চরমতর পর্যায়ে অনেকেই বেছে নেন আত্মহননের পথ। এক্ষেত্রে সব থেকে বেশি কাজ করে বেকারত্বের গ্লানি, আর্থিক ও সামাজিকভাবে সচ্ছল ও গ্রাহ্য না হওয়ার শঙ্কা, পরিবার ও সমাজের তিরস্কারসহ প্রভৃতি কার্যকারণ। আবার অনেকেই নিজেকে পরিবার ও সমাজের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারেন না, সবাই তাকে ভুল বোঝে, তার মতামত ন্যূনতম গ্রহণযোগ্যতা পায় না, সবাই তাকে ভাবে অকর্মণ্য, অযোগ্য। এমনিতর অগ্রাহ্যতা, অস্পৃশ্যতা এবং নেগেশন থেকেই জীবনে নেমে আসে নিঃসঙ্গতা। চূড়ান্ত পর্যায়ে গুটিয়ে নেন নিজেকে। এমন এক সময় আসে যখন তার প্রতি থাকে না পরিবার, সমাজ এমন কি রাষ্ট্রের কোনো ধরনের ইতিবাচকতা। সর্বাত্মক প্রত্যাখ্যানে কেউ কেউ বেছে নেন এমনি এক কালোপথ। সাধারণত আত্মহত্যা বা আত্মহননের প্রবণতাকে মানসিক অসুস্থতার চরম পর্যায় হিসেবেই দেখা হয়। মানসিক অসুস্থতা দুই কারণে হতে পারে। এক. ক্লিনিক্যাল, দুই. পারিপার্শ্বিক। আমি যেহেতু কোনো মনোবিদ বা সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক নই, তাই ও ক্লিনিক্যাল প্রপঞ্চটি নিয়ে কিছু লেখার যোগ্যতা নেই। সঙ্গত কারণেই আত্মহননের পারিপার্শ্বিক কারণকেই এই লেখার মূল উপজীব্য হিসেবে ধরে নিয়েছি। একজন ব্যক্তির পারিপার্শ্বিকতার মধ্যে পড়ে তার পরিবার, সমাজ এবং সর্বপোরি রাষ্ট্র। মানুষ পারিবারিক বাতায়নে জন্ম নিলেও প্রত্যেক মানুষের রয়েছে আলাদা স্বাতন্ত্র্য ও বৈশিষ্ট্য। ইচ্ছা-অনিচ্ছা, ভালো লাগা, মন্দ লাগা, রুচি, অভিরুচি এবং সর্বোপরি নিজস্ব মননশৈলীতেও রয়েছে বিশিষ্টতা। রয়েছে দেখার জন্য আলাদা চোখ, আলাদা মন। আর একজন ব্যক্তির মানুষ হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে উপরোল্লিখিত প্রপঞ্চগুলো গড়ে দিতে প্রথমত রয়েছে পরিবারের ভূমিকা। তারপর সমাজ এবং চূড়ান্ত অর্থে রাষ্ট্রের। পারিবারিক আবহেই একটি শিশু হয়ে ওঠে বালক, সেই থেকে তরুণ। যা তার ভিত্তিভূমি। আর এই পরিবারেই সে খুঁজে পায়, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, ভালোবাসার প্রেরণা, সহানুভূতি, মমত্ববোধ, সর্বোপরি আশরাফ হয়ে ওঠার সব বৈশিষ্ট্য। কিন্তু সেই পরিবারেই যখন এসবের বালাই থাকে না, তখন সে নিজেকে নিয়ে যায় বঞ্চিতদের কাতারে। কেউ কেউ অবশ্য হয়ে ওঠে বেপরোয়া, হিংস্র। যাকে আমরা অমানুষও বলতে পারি।

স্বজন বিয়োজনে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের দায় : বিশ্ব পুঁজিবাদের চরমতম সংকটসময়ে আর্থ-রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের এই সময়টা জন্ম দিচ্ছে স্বার্থপরতা, ব্যক্তিকেন্দ্রিক এক সামাজিক কাঠামো। ভেঙে যাচ্ছে যৌথ পরিবার ও যুথবদ্ধ সমাজ। মানুষ হয়ে পড়ছে একা। আর এই প্রপঞ্চকে আরও সংহত করে তুলেছে বৈশ্বিক করোনা পরিস্থিতি। মনুষ্যসৃষ্ট এই অতিমারী থেকে মানুষকে বাঁচানোর বাণিজ্যিক পথ-পদ্ধতি মানুষকে করেছে প্রথমত পারিবারিক এবং চূড়ান্ত অর্থে সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন। তবে এক্ষেত্রে সব থেকে বেশি মাত্রার বিরুদ্ধ পরিস্থিতিতে পড়েছে তরুণরা। করোনাকাল তাদের এক প্রকার কারাবন্দি করে রেখেছিল। চোখের সামনে ডিজিটাল দুনিয়া ছাড়া আর কোনো বাস্তবতা ছিল না তাদের কাছে। দীর্ঘ সময়ের একাকিত্ব রূপ নেয় বিষন্নতায়। সে থেকে সৃষ্ট মানসিক নৈরাজ্যিক অবস্থা সামাল দিতে না পেরে বহু তরুণ বেছে নিয়েছে আত্মহননের পথ। গবেষণা তথ্য বলছে, ২০২১ সালে দেশের ১০১ জন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। যা আগের বছর অর্থাৎ ২০২০ সালে ছিল ৭৯ জন। আর পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাবে বাংলাদেশে প্রতি বছর গড়ে ১০ হাজার মানুষ শুধু ফাঁসিতে ঝুলে ও বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করেন। ব্যক্তির মধ্যে তিনটি কারণে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে থাকে। এক. আত্মকেন্দ্রিক আত্মহত্যা। দুই. পরার্থমূলক আত্মহত্যা। তিন. নিয়মনীতিহীন বা নৈরাজ্যমূলক আত্মহত্যা। এ ছাড়াও আধুনিক সমাজে সংহতির অভাব ও সঠিক মূল্যবোধের ঘাটতি সৃষ্টি হওয়ায় আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়ে।

প্রাসঙ্গিকভাবেই পারিবারিক আবহের পাশাপাশি শিশু থেকে তরুণ হয়ে ওঠা ব্যক্তিটি নিজের অবস্থান করে নিতে সচেষ্ট হয় সমাজে। সহজাত প্রবৃত্তিগত কারণেই পরিবার ও আশপাশের সবাইকে নিয়ে বেঁচে থাকার প্রয়াস খুঁজতে সচেষ্ট হয় সমাজের কাছে। অথচ ‘ৃআমরা এমন একটা সমাজ বানিয়েছি, যা মানুষের আবেগ বোঝে না। আমরা জানি না কেউ যখন তার প্রিয় মানুষকে হারান, তাকে কী বলতে হয়। আমরা চাই, যে মানুষটি আজকে যাকে হারিয়েছে, ঠিক তার পরদিনই সে স্বাভাবিক ব্যবহার করবে, প্রতিদিনকার মতো কাজে যাবে। আমরা জানিই না কীভাবে প্রতারণা, দুঃখবোধ, শোক, কষ্টের সঙ্গে মোলাকাত করতে হয়। কীভাবে এ ধরনের অস্বস্তিকর পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে হয়। আমরা জানি না ‘কেমন আছো’র বাইরে আর কীভাবে যতœ, মমতা, দরদের শ্রদ্ধাপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করতে হয়। আমরা কেবল ওপরটুকুই দেখছি আর বলছি, আজকাল মানুষ খুব উদ্বিগ্ন, ক্লান্ত, একাকী।  সমাজ থেকে এমন নেতিবাচকতা দূর করতেই নিজেদের অর্থ আর সমর্থনে ব্যক্তিরা সম্মিলিত প্রয়াসে তৈরি করেছে রাষ্ট্র। একটি যূথবদ্ধ, সুস্থ সমাজবদ্ধ যাপিতজীবন পদ্ধতি নিশ্চিত ও সংহত করার পাশাপাশি যে রাষ্ট্র নির্মাণ করবে ন্যায্যতা, সমতা, মর্যাদা এবং দায় ও দরদের একটি সামাজিক ও আইনি কাঠামো। যেখানে প্রতিটি ব্যক্তি সোচ্চারণে বলতে পারবে আমি মানুষ। আমারও আছে স্বাতন্ত্র্য, আমারও আছে নিজস্বতা। যাকে কেউ অগ্রাহ্য করবে না। বলবে না তুমি কিছুই নও। অথচ সেই পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের আইন ব্যবস্থাপনা, ক্ষমতাতন্ত্র সবকিছু এমনভাবে অন্যায্যতাকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিয়ে দিয়েছে যে, সেখানে দ্বিমত পোষণের কোনো জায়গা নেই। রুদ্ধ করা হয়েছে বাদ প্রতিবাদের সব স্বীকৃত পথ-পদ্ধতি। ব্যক্তিকে করে তোলা হয়েছে একা, নিঃসঙ্গ। এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ-আন্দোলন জারি রাখার পাশাপাশি আমাদের মনোযোগ দেওয়া উচিত, কীভাবে একে অপরের দেখভাল করতে পারি। আধুনিক সমাজে ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে ওঠার প্রক্রিয়ার মধ্যেও কীভাবে আমাদের মধ্যে সম্পর্কের নয়াসেতু রচিত হতে পারে যেখানে কেউ এমন কোনো অসহায় পরিস্থিতিতে যাবে না, যার জন্য আত্মহনন হয়ে ওঠে একমাত্র সমাধান?

লেখক: সাংবাদিক ও সদস্য, রাষ্ট্রচিন্তা

khoborjibi@gmail.com