‘মব’ তৈরির মাধ্যমে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। যখন যাকে খুশি ডাকাত, ছিনতাইকারী, চোর আখ্যা দিয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলা হচ্ছে। এমন নির্মম গণপিটুনির ঘটনায় দোষীরা আইনের আওতায় আসছে কম।
মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) তথ্যমতে, ২০১৫ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে ১ হাজার ৯টি গণপিটুনির ঘটনায় ৭৯২ জন নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে অন্তত ৭৬৫ জন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ২০১টি গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে ২০২৪ সালে। এসব ঘটনায় গণপিটুনিতে মারা গেছে ১৭৯ জন। এ ছাড়া অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর গত বছর আগস্ট থেকে চলতি বছর ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সাত মাসে গণপিটুনির অন্তত ১১৪টি ঘটনায় কমপক্ষে ১১৯ জন নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে ৭৪ জন।
বুধবার বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে সংস্থাটি। এতে গত ১০ বছরের মধ্যে ২০২৪ সালকে গণপিটুনির ঘটনার জন্য সবচেয়ে ভীতিকর উল্লেখ করেছে এইচআরএসএস।
প্রতিবেদনে বলা হয়, সম্প্রতি মানুষকে হত্যা ও নির্যাতনের ঘটনা বেড়েছে। দেশের কিছু মানুষ আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল না হয়ে নিজেরাই আইন হাতে তুলে নিচ্ছে।
এইচআরএসএসের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ২০১৫ সালে গণপিটুনির ৮৯টি ঘটনায় ১২৮ জন নিহত হয়। আহত হয় ৯৫ জন। ২০১৬ সালে ১১১টি ঘটনায় ১০৪ জন নিহত ও ৪১ জন আহত হয়। ২০১৭ সালে ৮৫টি ঘটনায় ৬৫ জন নিহত ও ৮৫ জন আহত; ২০১৮ সালে ৭৪টি ঘটনায় ৪৪ জন নিহত ও ৬৪ জন আহত; ২০১৯ সালে ১১২টি ঘটনায় ৭৩ জন নিহত ও ১০৩ জন আহত; ২০২০ সালে ৬১ ঘটনায় ৪০ জন নিহত ও ৩০ জন আহত; ২০২১ সালে ৮৩ ঘটনায় ৪৮ জন নিহত ও আহত ৮৫; ২০২২ সালে ৭৯ ঘটনায় ৩৮ জন নিহত ও ৮৩ জন আহত; ২০২৩ সালে ১১৪ ঘটনায় ৭৩ জন নিহত ও ৯১ জন আহত এবং ২০২৪ সালে ২০১টি গণপিটুনির ঘটনায় ১৭৯ জন নিহত ও ৮৮ জন আহত হয়।
এইচআরএসএসের প্রতিবেদনে সাম্প্রতিককালে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনা তুলে ধরে বলা হয়, ঢাকা মহানগর, চট্টগ্রাম, বগুড়া, মাদারীপুর, টাঙ্গাইল, খুলনা, গাজীপুর, রাজশাহী, বরিশালে গণপিটুনিতে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় থানায় হত্যা মামলা বা এফআইআর হলেও সুষ্ঠু তদন্ত বা গণপিটুনিতে জড়িত অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিতের ঘটনা খুবই কম। এসব ঘটনায় দোষীরা আইনের আওতায় না আসায় দীর্ঘদিন ধরে এক ধরনের বিচারহীনতার রেওয়াজ তৈরি হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী অপরাধী-নিরপরাধ নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিকের আইনের আওতায় বিচারলাভ এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ রয়েছে। সংবিধানের ২৭, ৩১, ৩৩, ৩৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রের সব নাগরিক আইনের সমান আশ্রয়লাভের অধিকারী এবং আইনের দৃষ্টিতে অপরাধী প্রমাণ না হওয়া পর্যন্ত কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা যাবে না। এতে আরও বলা হয়, ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৯ ধারা অনুযায়ী, অপরাধী ধরা পড়লে তাকে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করতেই হবে। এর ব্যতিক্রম হলে দণ্ডবিধির ১৮৭, ৩১৯, ৩২৩, ৩৩৫ ও ৩০৪ ধারা অনুযায়ী যাবজ্জীবন কারাদণ্ডসহ বিভিন্ন ধরনের শাস্তির বিধান রয়েছে। এ ছাড়া গণপিটুনিতে কোনো ব্যক্তি নিহত হলে দণ্ডবিধির ৩৪ ধারা অনুযায়ী গণপিটুনিতে অংশ নেওয়া সব ব্যক্তি সমানভাবে দায়ী হবে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, গণপিটুনি মানবাধিকারের স্পষ্ট লঙ্ঘন। মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণা ১৯৪৮ এর ৩ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, প্রত্যেকের জীবন, স্বাধীনতা ও ব্যক্তি নিরাপত্তার অধিকার রয়েছে। অনুচ্ছেদ ৫ অনুযায়ী, কারও প্রতি নির্যাতন, অত্যাচার, নিষ্ঠুরতা, অমানবিক বা অবমাননাকর আচরণ করা যাবে না। এইচআরএসএস গণপিটুনির মতো ঘটনা এড়াতে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কার্যকর ভূমিকা রাখার আহ্বান জানায়। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সংস্থা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে দেশের সব নাগরিকের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, গণপিটুনির ঘটনায় দায়ীদের আইনের আওতায় এনে বিচার নিশ্চিত করা, এলাকাভিত্তিক সচেতনতা বাড়াতে নানা পরিকল্পনা গ্রহণের দাবি জানায়।
এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মানুষের মধ্যে এক ধরনের অসহিষ্ণুতা ও নৃশংসতা লক্ষ করা যাচ্ছে। তুচ্ছ কারণে এক ধরনের মব তৈরি করে গণপিটুনির মতো ঘটনা ঘটছে। বিশেষ করে গত কয়েক মাসে এ প্রবণতা দেখা যাচ্ছে বেশি।’ তিনি বলেন, ‘কোনো ব্যক্তি যদি অপরাধ করে তাহলে আইন, আদালত রয়েছে। অপরাধীকে গ্রেপ্তারে পুলিশ রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারকে অবশ্যই যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। না হলে এ ধরনের নৃশংসতা বাড়তে থাকবে।’