সদাচরণ ছাড়া রোজা সওয়াবহীন

সদাচারী মানুষকে সবাই ভালোবাসে। সবাই তাদের সান্নিধ্য কামনা করে। কেননা তাদের সঙ্গে চলাফেরা, ওঠাবসা ও লেনদেন করলে কখনো খারাপ অবস্থার মধ্যে নিপতিত হতে হয় না। তারা নিজে কষ্ট করে হলেও অপরের সুবিধার কথা চিন্তা করেন। তাই সদাচারী মানুষের প্রতি মহান আল্লাহ সর্বদা সন্তুষ্ট থাকেন। তাদের যেকোনো ইবাদত-বন্দেগি তিনি দ্রুত কবুল করেন এবং তাদের এমন বিশেষ কিছু দান করেন, যা অন্য কারও জন্য দান করেন না। তিনি চান তার সব বান্দা সদাচারী হয়ে উঠুক। তাই তিনি রমজানের মতো বরকত ও ফজিলতময় মাস আমাদের দান করেছেন। প্রতি বছর রমজান মাসের আগমন ঘটে মূলত মানুষকে তাকওয়া, সংযম ও সদাচরণের শিক্ষায় শিক্ষিত করতে। আর রোজা রেখে সবার সঙ্গে সদাচরণ করতে না পারলে রোজা হবে সওয়াবহীন। কেননা সদাচরণ ছাড়া রোজার সওয়াব পূর্ণ হয় না।

রোজা রেখে সবার সঙ্গে নম্র ও ভদ্র আচরণ করা অপরিহার্য। অন্যথায় রোজার হক আদায় হবে না। রোজা রেখে নৈতিকতার চর্চা করতে হবে। নৈতিক অবক্ষয় রোধ করার জন্যই রোজার বিধান দেওয়া হয়েছে। রোজা রেখে সবার সঙ্গে ভালোভাবে কথা বলা, বড়দের শ্রদ্ধা করা, ছোটদের স্নেহ করা, হাসিমুখে কুশলাদি বিনিময় করা, কর্কশ ভাষায় কথা না বলা, ঝগড়া-ফ্যাসাদে লিপ্ত না হওয়া, ধমক বা রাগের সুরে কথা না বলা, পরনিন্দা না করা, অপমান-অপদস্ত না করা আবশ্যক। যারা সদাচারী ও নম্র-ভদ্র তাদের জন্য জাহান্নামের আগুনকে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আমি কি তোমাদের সেই লোকের কথা বলে দেব না? যার ওপর জাহান্নামের আগুন হারাম হবে, যাকে জাহান্নামের আগুন পরিত্যাগ করবে। সে ওই লোক, যার মেজাজ নরম, স্বভাব কোমল এবং আচরণ নম্র।’ (মিশকাত) হজরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘হজরত রাসুল (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করা হলো, কোনো আমলের কারণে মানুষ বেশি জান্নাতে যাবে? তিনি বললেন, আল্লাহভীতি ও সুন্দর আচরণ।’ (তিরমিজি)

গৃহকর্মীদের নির্যাতন করা শিষ্টাচারবহির্ভূত কাজ। এটি খুবই জঘন্য একটি স্বভাব। সংবাদমাধ্যমে প্রায়শ গৃহকর্মীদের নির্যাতনের খবর সম্পর্কে জানা যায়। কেউ যদি রোজা রেখে রাগান্বিত হয়ে গৃহকর্মীর সঙ্গে খারাপ আচরণ করে, গৃহকর্মীকে নির্যাতন করে, মন্দ কথা বলে, গালি দেয় তাহলে তার রোজা অযথা হয়ে যাবে। রোজার কোনো সওয়াবই হবে না। কেননা হাদিসে এমন কাজকে জাহান্নামে যাওয়ার কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তাই অধীন কর্মচারী ও গৃহকর্মীদের সঙ্গে মার্জিত ও কোমল আচরণ করা বাঞ্ছনীয়। গৃহকর্তা যেমন আচরণ আশা করে গৃহকর্মী থেকে ঠিক তেমন আচরণ গৃহকর্মীর সঙ্গেও গৃহকর্তার করা চাই। এটাই নবীর শিক্ষা। রমজান মাসে অধীনস্তদের সঙ্গে এমন আচরণ করতে পারলেই রোজা হবে যথাযথ সওয়াব সম্মত। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘এরা (অধীনস্ত কর্মচারীরা) তোমাদের ভাই, এদের আল্লাহতায়ালা তোমাদের অধীনস্ত করেছেন। সুতরাং যে ব্যক্তির এরূপ ভাই (কাজের লোক) তার অধীনে আছে, সে যেন তার খাদ্য হতে তাকে খেতে দেয় এবং তার পোশাক-পরিচ্ছদ হতে তাকে পরতে দেয়। সে এরূপ কাজের বোঝা যেন তার ওপর না চাপায় যা করতে সে সামর্থ্য রাখে না। তার ওপর সাধ্যাতীত কোনো কাজের বোঝা চাপিয়ে দিলে মালিক যেন তাকে সহযোগিতা করে।’ (তিরমিজি)

রোজা সংযমের মাস। রোজার চাহিদা হলো পার্থিব সবকিছুতে সংযমী হওয়া। বিশেষ করে কথাবার্তায় সংযমী ও পরিমিতশীল হওয়া। শিষ্টাচারপূর্ণ আচরণ করা। দাম্ভিকতা প্রকাশ না করা। বেশি কথা বলা, বাচালতা, প্রগলভতা ও দাম্ভিকতা রোজার আদবকে নষ্ট করে। রোজাকে করে সওয়াবহীন। কেননা অধিক কথায় অনিষ্টের সম্ভাবনা বেশি থাকে। আর দাম্ভিকতা রোজার শক্তিকে করে স্তিমিত। রাসুল (সা.)-এর কাছে এসব লোক ঘৃণিত হিসেবে সাব্যস্ত এবং কেয়ামতের দিন তারা রাসুল (সা.) থেকে সবচেয়ে বেশি দূরে থাকবে। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে আমার সবচেয়ে প্রিয় এবং কেয়ামতের দিন আমার সবচেয়ে কাছে থাকবে সেই ব্যক্তি, যে তোমাদের মধ্যে অধিকতর সুন্দর চরিত্রের অধিকারী। আর আমার কাছে সবচেয়ে ঘৃণিত এবং কেয়ামতের দিন আমার কাছ থেকে সবচেয়ে দূরে থাকবে বাচাল ও অহংকারী।’ (তিরমিজি)

অনেক সময় দেখা যায়, সারা দিন রোজা রাখার পর শেষ বিকেলে মেজাজে একটু কঠিনত্ব চলে আসে। ফলে অনেকেই অফিসের সহকর্মীদের সঙ্গে কঠিন মেজাজে কথা বলে, পথচারীদের সঙ্গে রূঢ় আচরণ করে এবং রিকশাওয়ালাদের সঙ্গে রুক্ষ ভাষায় কথা বলে। সারা দিনের মধ্যে রোজাদারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হলো শেষ বিকেলের সময়টুকু। রমজানের এ সময়ে মেজাজ খারাপ হওয়ার মতো বিষয় সামনে আসতেই পারে। রোজাকে পূর্ণতায় নিয়ে যেতে চাইলে কঠোরতা প্রকাশ করা যাবে না। নিজেকে সংযত করতে হবে। এটাই রোজার শিক্ষা। রোজা যেমন ইবাদত তেমনি মানুষের সঙ্গে সদাচরণ করাও ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত। এক ইবাদত করা অবস্থায় আরেক ইবাদতে ত্রুটি হলে উভয় ইবাদতই ত্রুটি বলে গণ্য হবে। পবিত্র কোরআনে মানুষ আদিষ্ট হয়েছে সদাচরণ করতে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমরা তোমাদের পিতা-মাতা, নিকটাত্মীয়, এতিম, দরিদ্র, প্রতিবেশী, সঙ্গী-সাথি, পথিক এবং যারা তোমাদের অধিকারে এসেছে, সবার সঙ্গে সুন্দর আচরণ করো।’ (সুরা নিসা ৩৬)

সৎ ও মার্জিত আচরণ মানুষকে মুগ্ধ করে। আর মানুষের এমন মুগ্ধতায় মহান আল্লাহ খুশি হোন। মহান আল্লাহ খুশি হোন বলেই রোজাদারের সৎ ও মার্জিত আচরণ রোজার সওয়াবকে পূর্ণ করে। আর রোজাদার পায় রোজার পরিপূর্ণ প্রতিদান। তাই রোজার পরিপূর্ণ সওয়াব পেতে এবং পরকালে রোজা দ্বারা উপকৃত হতে চাইলে সবার সঙ্গে সদাচরণের বিকল্প নেই।

লেখক : ইসলামবিষয়ক গবেষক

atikr2047@gmail.com